চোখের সমস্যা ও মাথাব্যথার চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন বরিশালের বাবুগঞ্জের সালেহা বেগম। এক ব্যক্তির কাছে জানতে পেরেছিলেন, উপজেলার কলেজ গেট এলাকায় এমন একজন চিকিৎসক রয়েছেন, যিনি বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে সব ধরনের রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা দেন। সেই কথায় বিশ্বাস করে তাঁর কাছে যান সালেহা। সেখানে একটি ডিভাইসে হাত রেখে রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতিতে চিকিৎসা নেন তিনি। পরে জানতে পারেন, চিকিৎসক পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত কাগজপত্র নিয়ে গুরুতর জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে।
সালেহা বেগমের মতো সাধারণ মানুষকে চিকিৎসার নামে প্রতারিত করার অভিযোগ উঠেছে আলীমুল ইসলাম (৪৮) নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ল্যাপটপ ও বিশেষ ডিভাইসের সাহায্যে রোগ নির্ণয়ের দাবি করে প্রায় ১৫ বছর ধরে বরিশালের বিভিন্ন এলাকায় রোগী দেখে আসছিলেন তিনি। তবে চিকিৎসক হিসেবে নিজের যোগ্যতার পক্ষে বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় এবার প্রশাসনের অভিযানে ধরা পড়েছেন তিনি।
রবিবার (১৮ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার কলেজ গেট এলাকার এনএমএস ফার্মেসিতে রোগী দেখার সময় উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করেন। পরে তাঁকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ সময় চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম ও তাঁর দেখানো কাগজপত্র জব্দ করা হয়।
উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আলীমুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে বরিশাল সদর, উজিরপুর ও বাবুগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রোগী দেখে আসছিলেন। বাবুগঞ্জের মাধবপাশা বাজার ও বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ গেট এলাকায় নিয়মিত রোগী দেখতেন তিনি। ব্যবস্থাপত্রে নিজের নামের আগে ‘ডা.’ লিখে চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিতেন।
তাঁর ব্যবস্থাপত্রে এমবিইএইচ (ভারত), ডিএমএফ (ঢাকা) এবং কলকাতার এনআরএস মেডিকেল কলেজে প্রশিক্ষণ নেওয়ার তথ্য উল্লেখ ছিল। পাশাপাশি মেডিসিন, চর্ম, যৌন ও অ্যালার্জিজনিত রোগের চিকিৎসায় অভিজ্ঞ বলেও দাবি করতেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, ল্যাপটপ ও বিশেষ ডিভাইস ব্যবহার করে রোগ নির্ণয়ের কথা বলে রোগীদের চিকিৎসা দিতেন আলীমুল। তবে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে সেগুলো ভুয়া বলে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।
আলীমুল ইসলামের বিরুদ্ধে চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখার অভিযোগ পেয়ে রোববার রাতে অভিযান চালায় উপজেলা প্রশাসন। বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা উল হুসনার নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) তামিম মল্লিক ও মেডিকেল অফিসার তূর্য অধিকারী উপস্থিত ছিলেন।
মেডিকেল অফিসার তূর্য অধিকারী বলেন, খবর পেয়ে ইউএনওর সঙ্গে ঘটনাস্থলে গিয়ে আলীমুল ইসলামের কাগজপত্র যাচাই করা হয়। যাচাইয়ে তাঁর দেখানো কাগজপত্র ভুয়া বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। চিকিৎসার নামে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন তিনি। এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে স্বাস্থ্য বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
ইউএনও আসমা উল হুসনা বলেন, চিকিৎসক না হয়েও চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখার অভিযোগে অভিযান পরিচালনা করা হয়। আলীমুল ইসলাম ব্যবস্থাপত্রে নিজের নামের আগে ‘ডা.’ ব্যবহার করলেও বৈধ যোগ্যতার কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। প্রায় ১৫ বছর ধরে এভাবে প্রতারণা করে আসছেন বলে তিনি স্বীকার করেছেন।
ইউএনও আরও বলেন, তাঁকে প্রথমবারের মতো ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে চিকিৎসাসংক্রান্ত কোনো কার্যক্রমে জড়িত না হওয়ার শর্তে তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়নি। অভিযানে চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডিভাইস ও ভুয়া কাগজপত্র জব্দ করা হয়েছে।
জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, আলীমুল ইসলাম বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বাহেরঘাট এলাকার আব্দুল আলী হাওলাদারের ছেলে।
চিকিৎসাসেবা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলোর একটি। সেখানে ভুয়া যোগ্যতা দেখিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগ জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যোগ্যতা যাচাই না করে চিকিৎসা নেওয়া থেকে বিরত থাকা এবং সন্দেহজনক চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে প্রশাসনকে অবহিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









