বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে ‘ধোঁয়াশা’ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ঘটনার সময় তাহসিফের সঙ্গে থাকা ‘বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের কথাবার্তায় এই রহস্য বাড়ছে বলেই জানাচ্ছে তদন্তকারী সংস্থাটি।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ‘দীপ আসছে, ওর সঙ্গে কথা বলে আসি’- মাকে এ কথা বলে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। এরপর আর বাসায় ফেরেননি তিনি। পরদিন বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাজাবাড়ি ঘাট এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করেন। হাতঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে মরদেহটি তাহসিফের বলে শনাক্ত করা হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরদেহের ময়না তদন্ত সম্পন্ন হয়। বিকেলে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নামাজে জানাজা শেষে উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে কে এম তাহসিফ সাউরিকে দাফন করা হয়।
‘ধোঁয়াশায়’ পিবিআই
হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদে আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ একেক সময় একেক কথা বলছেন বলে গতকাল শুক্রবার জানায় পিবিআই। সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে দীপ পিবিআইকে জানিয়েছেন, ঘটনার দিন তারা ঘটনাস্থলে কথা বলছিলেন। এ সময় কিছু লোক ধাওয়া করেন। তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। আর তিনি সেখান থেকে পালিয়ে আসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সেখানে (ঘটনাস্থল) কথা বলছিলাম। এ সময় কিছু লোক ধাওয়া করে। তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন। আমি পালিয়ে আসি।’ এছাড়াও নানা ধরনের পরস্পরবিরোধী তথ্য দিচ্ছেন দীপ।
দীপের কাছ থেকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া এসব তথ্যসহ অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে জানায়ও পিবিআই। সংস্থাটির ঢাকা মেট্রো উত্তরের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, দীপ একেক সময় একেক রকম কথা বলেছেন। তার সর্বশেষ বক্তব্যের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে মোটরসাইকেলটি জব্দ করা হয়েছে। দীপ কেন একেক সময় একেক রকম কথা বলেছেন- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পিবিআইয়ের এ কর্মকর্তা বলেন, তাহসিফ ও দীপ একসঙ্গে এখানে আসার পর তাহসিফকে ফেলে কেন দীপ একা চলে গেলেন, সেটি আমাদের কাছে এখনো ধোঁয়াশা। আমরা তদন্ত করছি। তদন্ত শেষে বিষয়টি জানা যাবে।’
মোটরসাইকেল জব্দ-
তুরাগ নদের যে স্থান থেকে বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, তার সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে মাজার বস্তি এলাকা থেকে নম্বর প্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে বলে জানান পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ। তিনি জানান, দীপকে নিয়ে বৃহস্পতিবার রাতভর বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। সে সময় জব্দ হওয়া মোটরসাইকেলটি তাহসিফের কিনা, তা যাচাই-বাছাই চলছে। পিবিআই প্রধান মোস্তফা কামাল জানান, ‘দীপের দেখানো মতে নম্বর প্লেটবিহীন মোটরসাইকেলটি জব্দ করা হয়েছে। নম্বর প্লেট না থাকায় মালিকানা যাচাই করা হচ্ছে। তাহসিফ বাসা থেকে যে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন, সেটিও নম্বর প্লেটবিহীন বলে সিসিটিভি ভিডিওতে দেখা গেছে।’
ছেলের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত চান তাহসিফের বাবা-
তবে পিবিআইকে দ্বীপের দেওয়া তথ্যের বিষয়ে তাহসিফের বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম জানান, তিনি ‘ধাওয়ার মুখে নদে ঝাঁপ দেওয়ার’ তথ্য মানতে নারাজ। তাঁর দাবি, ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার এনায়েতুল করিম বলেন, ‘কেন তাহসিফকে ধাওয়া দিতে যাবে? এগুলো বাজে কথা, প্রশ্নই আসে না। আমার ছেলে সাঁতার জানতেন। তিনি তো পাইলট। তাঁদের সুইমিংয়ের কোর্স করা এবং তার ওপর সার্টিফিকেট আছে। সাঁতারের ওপর বড় ধরনের কোর্স করা আছে আমার ছেলের।’
তবে, তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি পরিবার। অবশ্য মামলা করা বা না করার বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে সরকারের নিজস্ব আইনে ছেলের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের দাবি জানান বাবা কে এম এনায়েতুল করিম।
তিনি বলেন, ‘আমরা পারিবারিকভাবে এখনো কোনো ধরনের মামলা করার সিদ্ধান্ত নেইনি। মামলা করব কি না, সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আমরা চাই, থানায় গিয়ে দুই কলম কী লিখলাম বা না লিখলাম, সেটির ওপর সরকার গুরুত্ব না দিয়ে নিজস্ব আইন অনুসারে ব্যবস্থা নিক।’ তাহসিফের বাবা বলেন, ‘আমার ছেলে এ দেশের একজন সুনাগরিক ছিলেন। সশস্ত্র বাহিনীর একজন সদস্যও ছিলেন। তার এ ধরনের মৃত্যুর যেন সুষ্ঠু তদন্ত হয় এবং প্রকৃত কারণ বের হয়ে আসে। আমরা মামলা করছি কি না, সেটির ওপর নজর না দিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব বাহিনী যেন বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে।’
রাজধানীর উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিব জানান, তাহসিফের বাবাকে ফোন করে থানায় এসে মামলা করতে বলা হয়েছিল। তবে তিনি এখনো থানায় আসেননি। তিনি এলে থানায় মামলা করা হবে। তবে পরিবার যদি মামলা না করে, তাহলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নৌপুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম।
শুক্রবার বিকালে তিনি জানান, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করে কিনা, তার জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। পরিবার মামলা না করলে আইনানুগ ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে। তিনি বলেন, ‘নৌ পুলিশের পাশাপাশি পিবিআই ঘটনার তদন্ত করছে। তারা একজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলো যাচাই বাছাই করা হচ্ছে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









