কখনো প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, কখনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন বা জখম, আবার কখনো বাড়িতে ঢুকে গুলিবর্ষণ। ছিনতাইয়ের মতো অপরাধেও ব্যবহৃত হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। রাজধানীসহ সারা দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে খুন-খারাবি। যার মূলে রয়েছে- আধিপত্য বিস্তার, জমি দখল, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মতো ঘটনা। এতে দিন দিন আতঙ্কিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, ছিনতাই, পূর্বশত্রুতা এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরোধ কাজ করছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, শিক্ষক, স্কুলছাত্রী, নারী ও পথচারীরাও আক্রান্ত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারের কথা বললেও খুনের ঘটনা থামছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতা এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শীর্ষ অপরাধীদের মুক্তি ও দেশে ফিরে আসা সহিংসতা বাড়ার মূল কারণ। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন রাজপথে এসে ঠেকেছে। ক্ষমতার লড়াইয়ে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে, যার ফলে দেশজুড়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, অপরাধের ঘটনায় কার্যকর তদন্তে ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া, অহরহ জামিনও মিলছে খুনের মামলায়। তাদের তাগিদ, দ্রুত বিচার করে বিচারহীনতার পুরনো সংস্কৃতি বদলানোয়। হত্যার কারণ ভিন্ন হলেও প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পরই প্রশ্ন ওঠে, কেন থামছে না সহিংসতা? অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, দ্রুত বিচার, সামাজিক বিরোধের মীমাংসা, অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর তদন্ত হত্যাকাণ্ড কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার রাখতে পারে।
দিনদুপুরে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা এখন বড় প্রশ্নের মুখে। ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা খায়রুল হাসান বলেন, ‘আমরা মোটেও নিরাপদ বোধ করছি না। খুন, গোলাগুলি আর ছিনতাই নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ নিরাপত্তা চায়, কিন্তু বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।’
চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ১ হাজার ১৩টি ঘটনায় ৭৩ জন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬ হাজার ৪৭৩ জন। একই সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৮৭ জন। কারাগারে মারা গেছেন ৯৫ জন বন্দী; আর নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৫১৮ জন সাংবাদিক। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক সহিংসতার ৯১ শতাংশই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষে ঘটেছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৩৪২টি ঘটনায় ৪০ জন নিহত ও ২ হাজার ৬৩২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ৩২১টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১১ জন, আহত ২ হাজার ১৯০ জন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকেন্দ্রিক ৪০২টি সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩ জন, আহত ২ হাজার ৬২৩ জন। নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ছয় শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭৩ জনের মধ্যে বিএনপির ৪৬, জামায়াতের ৮ ও আওয়ামী লীগের ৬ জন। এ ছাড়া ১২ জনের রাজনৈতিক পরিচয় অজানা বা তাঁরা অন্যান্য দলের সদস্য।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, গত ৯ মাসে ২ হাজার ৪০৪ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬৫৭ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন; ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৯ জনকে। একই সময়ে ১ হাজার ৮১০ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাদের মধ্যে অন্তত ৪৯৪ জন প্রাণ হারিয়েছে। শ্রমিক নির্যাতনের ৫৮২টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৪৫ জন, আহত ১ হাজার ২৬৩ জন। কর্মক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সুরক্ষাসামগ্রীর অভাবে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৩৯০ জন শ্রমিক। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলায় ৬২ জন আহত হয়েছেন; ২১টি মন্দির, ২০টি প্রতিমা ও ৪৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের হামলায় নিহত হয়েছেন ১৩ জন, আহত ৩৯ জন। এ ছাড়া নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে হত্যাকাণ্ডের ৪৬৫টি ঘটনায় ৪৯১টি লাশ উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে সংগঠনটি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ ও কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে অন্তত একটি গুম ও একজনকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন ও হয়রানির ২৮৮টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৯৭ জন, লাঞ্ছিত ৮৭ জন এবং হুমকির মুখে পড়েছেন ৭৭ জন। ২০ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া সভা-সমাবেশে বাধার ৫৮টি ঘটনায় ৪৩৯ জন আহত ও ৪৬ জন আটক হয়েছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২৭০টির বেশি মামলায় ৫ হাজার ৮০৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে; অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ৩২ হাজার ৪৩৩ জনকে।
তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রামসহ ২১ জেলায় ১৩৮টি গুলির ঘটনায় ৬৭ জনের প্রাণ গেছে। আর অন্তত ১৪৫ জন আহত হয়েছে। শুধু রাজধানীতেই গত ৯ মাসে ঘটেছে ১৭টি গুলির ঘটনা। ওসব ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়। একই সময় খুলনায় সর্বাধিক ৩৯টি গুলির ঘটনা ঘটে। তাতে ১৫ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়। আর চট্টগ্রামে ৩১টি গুলির ঘটনা ঘটে এবং নিহত হয় ১৩ জন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মানবাধিকার সংগঠন-সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে বিগত ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই বাড়তে থাকে অপরাধী ও দুর্বৃত্তদের হাতে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের মজুদ। ওই সময় সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যায় থানা ও ফাঁড়ি থেকে পুলিশের লুট হওয়া ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের বেশির ভাগ। লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে নানা অভিযানেও এখনো ১৩ শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। তা ছাড়া দেশের বিভিন্ন সীমান্তে চোরাই পথেও দেশে ঢুকছে প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র। আর ওসব অস্ত্রের কারণে দেশজুড়ে বাড়ছে খুনাখুনি। গত ২০২৫ সালে দেশে ২৫০ জনের বেশি গুলিবিদ্ধ হয় এবং অন্তত ৮০ জন মারা যায়।
সূত্রমতে, বর্তমানে দেশে শহর থেকে গ্রামে সর্বত্রই বাড়ছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। আর এসব অস্ত্রধারীর বেশির ভাগ কিশোর-তরুণ। তারা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সহযোগী হিসেবে অর্থের বিনিময়ে ভাড়া খাটছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে পাড়া-মহল্লায় অস্ত্রধারী চক্র গড়ে উঠেছে। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরাই নিয়ন্ত্রণ করছে দেশজুড়ে মাদকের স্পট। তা ছাড়া তারা প্রায়ই অস্ত্র ঠেকিয়ে পথচারীদের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই সাহস পাচ্ছে না থানায় অভিযোগ করতেও। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান আরো জোরদারে তথ্য প্রদানকারীদের জন্য বড় অঙ্কের আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না পরিস্থিতি। বরং দিন দিন তা আরো বাড়ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারের জন্য বিশেষ ইউনিট গঠন করার কথা বলা হয়েছে। তা ছাড়া সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক নিয়ন্ত্রণে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে অগ্রগতি দেখাতে ব্যর্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, দেশব্যাপী গত ১ মে থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৫৩ হাজার ৫১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই সময় ৪৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৪ হাজার ৭২২ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজ, ১৬৫টি ম্যাগাজিন, ৬৫টি ককটেল, সোয়া ২ কেজি গানপাউডার, ৮৯৩টি দেশীয় অস্ত্র, ৭১টি অস্ত্রের যন্ত্রাংশ, ২১টি অস্ত্র ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম এবং ১০ হাজার ৩০০টি চকোলেট বাজি উদ্ধার করেছে পুলিশ। উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ১৫৩টি পিস্তল, ৪৮টি শ্যুটারগান, ৪৫টি এলজি, ২৬টি রিভলবার, ১০৮টি বন্দুক, ২৬টি পাইপগান, ৭টি শটগান, ৭টি রাইফেল, ৩টি এসএমজি, ১২টি এয়ারগান ও একটি পেনগান।
এ প্রসঙ্গে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন জানান, সাম্প্রতিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে তা বলার সুযোগ কম। বরং অপরাধীরা প্রকাশ্যে একের পর এক ঘটনা ঘটাচ্ছে।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং হেফাজতে ও কারাগারে মৃত্যু প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









