দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং বিনিয়োগের বড় একটি অংশ এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। শ্রমিক অসন্তোষ, হামলা-ভাঙচুর এবং অবরোধের মতো ঘটনায় দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। মজুরি বাড়ানোর দাবিতে চলমান শ্রমিক আন্দোলন ও বিশৃঙ্খলায় দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে।
কারখানায় হামলা-ভাঙচুর ও সড়ক অবরোধের কারণে বহু কারখানায় উৎপাদন বন্ধ আছে। এতে সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পোশাক খাতের পাশাপাশি অন্য শিল্পের কারখানাও ক্ষতির মুখে পড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়- অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব এখন আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্রয়াদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোয় চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতেই গত বুধবার মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আগামী ডিসেম্বর থেকে পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি কার্যকরের বিষয়ে শ্রমিক প্রতিনিধিদের দাবির সঙ্গে একমত হয়েছে মালিক পক্ষ। অথচ একই দিনে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, সাভারের হেমায়েতপুর ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। ফলে মজুরি নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি হলেও মাঠের অস্থিরতা এখনো থামেনি।
চলমান গার্মেন্টস আন্দোলনের ফলে পোশাক মালিক এবং জাতীয় অর্থনীতির ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির চিত্র ফুটে উঠেছে। বিজিএমইএর পরিচালক মো. হাসিব উদ্দিনের তথ্যমতে, বছরে মাত্র ৩৪০ কর্মদিবসে এই খাত থেকে ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় হয়। যার ফলে মাত্র ১ দিনের সম্পূর্ণ অচলাবস্থায় জাতীয় অর্থনীতি ও পোশাক খাতের প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের (১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি) সমপরিমাণ বিশাল আর্থিক ক্ষতি হয়। এছাড়া বিকেএমইএর সভাপতি জানিয়েছেন, মাত্র এক দিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে তা মোট রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
পাশাপাশি কারখানা বন্ধ থাকায় ইমপ্রেস-নিউটেক্সের মতো তৈরি পোশাক মালিকরা সময়মতো পণ্য উৎপাদন করতে পারেন না। এতে ১ লাখ ৪০ হাজার পিসের মতো কম উৎপাদন হয়। ফলে তাদের বড় বড় আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ বাতিল হচ্ছে, যা তাদের চরম ব্যবসায়িক লোকসানের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার মতো প্রধান পোশাক হাবগুলোতে পর্যায়ক্রমে ৭০০টিরও বেশি কারখানা বন্ধ থাকায় মালিকদের দৈনিক কোটি কোটি টাকার উৎপাদন সক্ষমতা সম্পূর্ণ ভেস্তে গেছে। দীর্ঘায়িত এই অস্থিরতার কারণে চরম শিপমেন্ট-জট সৃষ্টি হচ্ছে। বসন্ত ও গ্রীষ্মকালীন বৈশ্বিক ফ্যাশন অর্ডারের পিক-সময়ে কারখানা বন্ধ থাকায় নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে, অনেক মালিক বাধ্য হয়ে বিপুল পরিমাণ লোকসান গুনে লাখ লাখ পিস তৈরি পোশাক সমুদ্রপথের পরিবর্তে আকাশপথে পাঠাতে যাচ্ছেন। যার ফলে পরিবহন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে মুনাফা শূন্যের কোঠায় নামছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্য অর্ডারগুলো বাঁচাতে মালিকরা বাধ্য হয়ে হাজার হাজার পিসের আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ বাতিল বা পুরোপুরি হাতছাড়া করছেন।
আর্থিক ক্ষতির চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে মালিকদের ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা। অব্যাহত নীতিগত অসঙ্গতি ও লাগাতার শ্রমিক আন্দোলনের ফলে ওয়ালমার্ট, এইচঅ্যান্ডএম এবং জারার মতো শীর্ষ আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে চরম 'অস্বস্তি' ও নির্ভরযোগ্যতার সংকট তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মতো বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্যে বাংলাদেশের বাজার প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হয়েছে। এই সুযোগে প্রতিযোগী দেশ, বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান যারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ)’র কারণে শুল্কমুক্ত সুবিধা উপভোগ করছে— তারা সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যাচ্ছে। ফলে পোশাক মালিকরা গভীর উদ্বেগে আছেন যে, এই আস্থার সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের কোটি কোটি ডলারের বৈশ্বিক অর্ডার স্থায়ীভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে স্থানান্তরিত হতে পারে।
ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, পণ্যের উৎপাদন ব্যাহত ও ক্রয়াদেশ নিয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. রেজওয়ান সেলিম বলেন, ‘আমাদের যে সাত দিন ফ্যাক্টরি বন্ধ রইল এর প্রভাবে প্রতিবছর যে পরিমাণ রপ্তানি হতো তা বিগত কয় দিনে কমে গিয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে কত টাকা- এ বিষয়ে সঠিক তথ্যের চার্ট আমাদের হাতে আসেনি, এলে বলতে পারব। তবে সবচেয়ে বেশি সংকটের ব্যাপার হলো এখন যে সময় যাচ্ছে সেটা আমাদের বায়ারদের অর্ডার প্লেসমেন্টের সময়; যেগুলো আমরা জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে উৎপাদন ও রপ্তানি করব। এই সময় যদি বায়াররা দেখে দেশের এই অবস্থা, তাহলে তারা অন্য দেশে অর্ডার দিয়ে দেবে।’
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল পর্যন্ত শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ৪৬৯টি কারখানা বন্ধ ছিল। বিজিএমইএর সহসভাপতি শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, হামলা-ভাঙচুরের কারণে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকা উদ্যোক্তারা কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। তাঁর হিসাবে, বিক্ষোভের ফলে পোশাক খাতের উৎপাদন ২৫ শতাংশের বেশি কমেছে। পোশাক খাতে প্রতি মাসে গড়ে ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি হয়। প্রাথমিক হিসাবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দৈনিক গড়ে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি রপ্তানি আয় হুমকির মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি এভাবে চললে ক্রেতারা আস্থা হারাতে পারেন এবং ক্রয়াদেশ অন্য প্রতিযোগী দেশে সরিয়ে নিতে পারেন বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, বৈশ্বিক নানা চাপে প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে বাংলাদেশ এমনিতেই সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। তার ওপর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করেছে। তাঁর প্রশ্ন, মজুরি বোর্ড কাজ করছে এবং মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে যখন কোনো সমস্যা নেই, তখন ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা কেন হচ্ছে, তা পরিষ্কার নয়। তাঁর মতে, এতে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন থাকতে পারে। অতীতেও রাজনৈতিক বিদ্বেষের শিকার হয়েছে শিল্প খাত, এবারও তা হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করেন।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক জানান, সম্প্রতি দুটি চামড়া কারখানাসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য তাঁরা পেয়েছেন। শ্রমিকদের অবরোধে পরিবহন ও মালপত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিদিন কোনো না কোনো কোম্পানির শিপমেন্ট থাকে, যা এখন ব্যাহত হচ্ছে। বিদেশি ক্রেতারা নিয়মিত কারখানা পরিদর্শনে আসেন, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁরাও আসতে চাইছেন না। তিনি দ্রুত বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনার তাগিদ দেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা আরো বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। নিরাপত্তা নিয়ে এখনই উদ্বেগ প্রকাশ না করলেও ব্যবসায়ীরা যে শঙ্কায় আছেন, তা তিনি স্বীকার করেন।
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক এক সভাপতি বলেন, শ্রমিক বিক্ষোভের ফলে পোশাক খাতে যা ঘটছে, তা কাম্য নয়। তাঁর ভাষ্য, এর প্রভাব শুধু কারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। উৎপাদন, সরবরাহ চেইন, রপ্তানি আয় ও ক্রেতাদের আস্থার ওপরও এর ছায়া পড়বে। এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হতে পারে। তাই দ্রুত এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদরাও একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এর ব্যাপ্তি বাড়বে, যা অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ওপরও প্রভাব ফেলবে। তাই সহিংসতার বদলে সংলাপের মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, শ্রমিক বিক্ষোভ দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন ব্যাহত বা বন্ধ হবে এবং রপ্তানি আদেশ সময়মতো পাঠানো কঠিন হয়ে পড়বে। এতে ক্রেতাদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শ্রমিকেরা কর্মদিবস ও আয় হারাবেন, আর প্রতিষ্ঠানগুলো পড়বে আর্থিক ক্ষতির মুখে। সহিংসতা হলে কারখানা, যানবাহন ও মানুষের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে এবং কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। তাঁর পরামর্শ, সরকার, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছাতে হবে।
একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সংযম, শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং উৎপাদন সচল রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত সংলাপ ও কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও গড়ে তোলা দরকার বলে মনে করেন তিনি। সব মিলিয়ে মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হলেও মাঠের অস্থিরতা না থামলে তার সুফল পাওয়া কঠিন হবে। বন্ধ কারখানা, ব্যাহত শিপমেন্ট ও ক্রেতাদের সম্ভাব্য আস্থাহীনতা মিলিয়ে ক্ষতির পরিধি আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, মজুরি কার্যকরের ঘোষণা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা কত দ্রুত শ্রমিকদের কাজে ফেরাতে এবং উৎপাদন স্বাভাবিক করতে পারে।
বিজিএমইএর তথ্যমতে, ১ থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত ৪ দিনে পোশাক খাতে রপ্তানি মূল্য বাবদ আনুমানিক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন ৪৬১টি কারখানা বন্ধ থাকার কারণে এ ক্ষতির হিসাব করা হয়েছে। আর বিকেএমইএ বলছে, গত ৪ দিনে আনুমানিক ৯০০ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে।
বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিক আন্দোলনের যৌক্তিকতা নেই। এখন শ্রমিক আন্দোলনের নামে শুধু নৈরাজ্য-তাণ্ডব চালানো হচ্ছে। দেশের সম্পদের ক্ষতি করা হচ্ছে। সাধারণ শ্রমিকরা এর সঙ্গে জড়িত নন। একটা কথা শ্রমিকদের মনে রাখতে হবে- শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প না বাঁচলে শ্রমিক বাঁচবে না। তিনি আরো বলেন, কিছুদিন পরপর এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্প বন্ধ হতে বাধ্য। মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে বিদেশি ক্রেতারা তাদের উদ্বেগ জানিয়েছেন। অর্ডার স্থানান্তরের আলোচনাও চলছে। মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গত ৪ দিনের আন্দোলনে নিট গার্মেন্টসের আনুমানিক ৯০০ কোটি টাকার মতো উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে। উৎপাদন ক্ষতি হয়তো পুষিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু দেশের ইমেজ সংকটের দায় কে নেবে?
পোশাক শিল্পের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বাংলাদেশে তাদের সরবরাহকারীদের কাছে পরিস্থিতির আপডেট জানতে চেয়েছে। এমনকি ইউরোপের একটি বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের একজন প্রতিনিধি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সাথে নিজে সাক্ষাৎ করেছেন। খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, কিছু আন্তর্জাতিক বায়ার তাদের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি থেকে ইতিমধ্যেই ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কার্যাদেশ বাতিল বা কাটছাঁট করা শুরু করেছে। অন্যরা দেশের পোশাক খাতের এই সার্বিক অচলাবস্থা কতদিন চলবে সেটিও নির্দিষ্টভাবে জানতে চাইছেন। বাংলাদেশে শীর্ষ পাঁচ বায়ারের একটি, যারা বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক পণ্য বাংলাদেশ থেকে সংগ্রহ করে, ওই ব্র্যান্ডের প্রতিনিধি গত সোমবার রপ্তানিকারককে একটি বার্তা পাঠিয়ে জানতে চেয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে কিনা এবং এ পরিস্থিতিতে সরকার কী করছে?
পোশাক খাতের উদ্যোক্তা সাইদুল ইসলাম জানান, বেশ কিছু আন্তর্জাতিক বায়ার তাদের পূর্বনির্ধারিত ক্রয়াদেশের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ কম পণ্যের চূড়ান্ত অর্ডার দিচ্ছে। "এই অর্ডার হয়তো অন্য দেশ নিয়ে যেতে পারে"- উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন তিনি। ঢাকায় ইউরোপীয় একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ডের আঞ্চলিক কার্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাদের কোম্পানি আগামী দুই মাস বাংলাদেশে যে পরিমাণ অর্ডার দেওয়ার কথা, সেখান থেকে কমিয়ে দেওয়া হবে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ৬.২ শতাংশের একটি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করেছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। আপাতদৃষ্টিতে এই পরিসংখ্যানকে দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতের জন্য একটি বড় স্বস্তি মনে হলেও, ভেতরের বাস্তব চিত্রটি চরম উদ্বেগজনক। মাঠপর্যায়ের রূঢ় বাস্তবতা বলছে, এই প্রবৃদ্ধি আসলে একটি অত্যন্ত 'ভঙ্গুর পুনরুদ্ধার' বা ফ্রাগিল রিকোভারি। গত কয়েক দিন রাজধানীর মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে টানা চার দিনের শ্রমিক অসন্তোষ এবং তার জেরে কয়েক শ কারখানা বন্ধ থাকার ঘটনা এই প্রবৃদ্ধির আনন্দকে সম্পূর্ণ ম্লান করে দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদ এবং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরবর্তী এই ক্রান্তিকালে যখন বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশের ওপর আস্থা ফিরে পেতে শুরু করেছিলেন, ঠিক তখনই এই দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন অচলাবস্থা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মাত্র চার দিনের এই অচলাবস্থায় তৈরি পোশাক খাতে শত কোটি টাকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিক প্রাক্কলনে দেখা গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় এসেছে প্রায় ১৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ৬.২% বেশি। মূলত ইউরোজোন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গ্রীষ্মকালীন পোশাকের ভালো চাহিদার কারণে এই ক্রয়াদেশ আসছিল এবং উদ্যোক্তারাও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিলেন। তবে এই প্রবৃদ্ধির খতিয়ান পুরোপুরি বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত করে না।
তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর অভ্যন্তরীণ ডেটা সেল অনুসারে, গত চার দিনে সাভার-আশুলিয়া বেল্টের প্রায় ২২০টি কারখানা এবং গাজীপুরের ৮৫টি কারখানা সম্পূর্ণ বা আংশিক বন্ধ রাখতে হয়েছে। শ্রমিকদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা, বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ, হাজিরা বোনাস বৃদ্ধি এবং কারখানার ভেতর বৈষম্য দূরীকরণ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









