আমাদের বিদ্যালয়টি অনেকটা ফাঁকা রাস্তার পাশে অবস্থিত। রাস্তার পাশে কোনো গাছ না থাকায় গরমের দিনে প্রখর রোদে, আর শীতের দিনে শীতের প্রকোপে স্কুলে আসা-যাওয়া খুব কষ্ট হয়। রাস্তাটি কাঁচা। এ বছর আবার নতুন করে মাটি কাটা হয়েছে। রাস্তার দুই ধারে গাছ থাকলে ভালো হতো।
মনে মনে ভাবতে থাকে সৈকত। সে ভাবে, রাস্তার দুই ধারে গাছ থাকলে রাস্তায় ছায়া পড়বে। স্কুলে আসতে কষ্ট কম হবে। গরমের দিনে পথচারীরা ছায়ায় একটু বিশ্রাম নিতে পারবে। আবার শীতের দিনে হিম-কুয়াশাও কিছুটা আটকে যাবে, শীতের প্রকোপও কম লাগবে।
সৈকত দশম শ্রেণির ছাত্র। একদিন টিফিনের সময় সে বন্ধুদের নিয়ে বসল। সৈকত সবাইকে রাস্তার দুই ধারে গাছ লাগানোর গুরুত্ব বোঝাল। বন্ধুরাও বিষয়টি বুঝল।
সৈকতের বন্ধু জিহাদ বলল, রাস্তার দুই পাশে গাছ থাকলে দেশের উপকার হবে, নিজেদেরও উপকার হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে, রাস্তার সৌন্দর্য বাড়বে এবং মানুষও উপকৃত হবে।
বন্ধু আছিয়া বলল, তাহলে কালই নেমে যাব বৃক্ষরোপণ অভিযানে।
সৈকত বলল, তাই হবে। তবে আজ ছুটির পর আমরা স্যারদের সঙ্গে বসব।
স্কুল ছুটি হলো। প্রধান শিক্ষকের কক্ষে দশম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রী ও সকল শিক্ষক বসলেন। সৈকত তার বক্তব্য শিক্ষকদের সামনে তুলে ধরল। সকল শিক্ষক বিষয়টি শুনে খুব খুশি হলেন। সিদ্ধান্ত হলো, আগামীকাল নোটিশ দেওয়া হবে—প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রী একটি করে গাছের চারা নিয়ে আসবে।
যথারীতি নোটিশ দেওয়া হলো। স্কুলে মোট সাতশ ঊনষাট জন ছাত্র-ছাত্রী। ফলে সাতশ ঊনষাটটি চারা সংগ্রহ হবে। শিক্ষকেরাও স্বেচ্ছায় আরও একশটি চারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
শুরু হলো বৃক্ষরোপণ অভিযান। চারা সংগ্রহের খবর এলাকায় এক ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করল। অনেক অভিভাবক নিজেরাই আরও কিছু চারা অনুদান দিলেন। স্থানীয় মেম্বার ও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান স্কুলে এসে এমন উদ্যোগ গ্রহণের জন্য শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের ধন্যবাদ জানালেন। চেয়ারম্যান বললেন, আমিও তোমাদের সঙ্গে আছি।
নির্দিষ্ট দিনে শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, গ্রামের যুবক-যুবতী, কৃষক, মেম্বার, চেয়ারম্যানসহ সকল শ্রেণির মানুষ বৃক্ষরোপণের কাজে নেমে পড়লেন। মনে হলো, যেন ঈদের দিনের আনন্দ। কারও হাতে কোদাল, কারও হাতে চারা, কেউ মাটি দিচ্ছে, কেউ আবার পানি ঢালছে। গ্রামের আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল আনন্দের আবহ। সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পুরো রাস্তার দুই পাশে সারি সারি গাছের চারা রোপণ করা হলো।
বৃক্ষরোপণ শেষে সবাই স্কুলের মাঠে মতবিনিময়ের জন্য বসলেন। প্রথমে চেয়ারম্যান ও প্রধান শিক্ষক সৈকতের এমন মহৎ উদ্যোগ নেওয়ার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানালেন।
চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, এই গাছগুলো শুধু আজকের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুখ, শান্তি ও আরাম-আয়েশের জন্য রোপণ করা হয়েছে। এসব গাছের দেখাশোনা ও পরিচর্যার দায়িত্বও আমাদের সবার।
সবাই হাত উঁচিয়ে একসঙ্গে সাড়া দিলেন, হ্যাঁ, এই গাছগুলো বড় হওয়া পর্যন্ত দেখভালের দায়িত্ব আমরা নিলাম। আমরা এর পরিচর্যা করব।
সেদিন আমাদের গ্রামে এক নতুন ভোরের আলো সূচীত হলো, আগামী দিনে স্বপ্ন বিকাশের প্রত্যাশায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









