এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ১৫ ভাগ বেড়ে যাওয়ায় এ বছর মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশে পৌঁছানোর শঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। তাঁরা বলছেন, জ্বালানি খরচের সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে। বাড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও। সব মিলিয়ে জনজীবনের সংকট আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে এমনিতেই চাপে রয়েছে সাধারণ মানুষ। এরই মধ্যে এক ধাক্কায় সব ধরনের জ্বালানির দাম বেশ খানিকটা বাড়িয়ে দিয়েছে সরকার। জ্বালানির দাম প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত একসাথে কার্যকর হওয়ায় অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সবচেয়ে দ্রুত প্রভাব পড়বে পরিবহন খাতে। আর পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়লে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও যাবে বেড়ে। চাল, ডাল, সবজি, মাছ-মাংসসহ সবকিছুর দামই বাড়বে। সামগ্রিকভাবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা হয়ে উঠবে আরো ব্যয়বহুল। সাধারণ মানুষ বলছেন, আসলে বাজারের সবকিছুই একটির সঙ্গে আরেকটি সম্পৃক্ত। এখন তেলের দাম বৃদ্ধিতে বাজারের অন্য যেসব দ্রব্য রয়েছে সেগুলোর দামও বাড়বে। এ ছাড়া দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধির সঙ্গে তো মানুষের আয় সেভাবে বাড়ছে না। এতে জীবনযাত্রার মান কমে যাচ্ছে।
জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সময় তেলের দাম বাড়ানো কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, তেলের দাম যখন বিশ্ববাজারে ১২০ ডলার থেকে নেমে ৯০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে, এখন তেলের দাম বৃদ্ধির কী দরকার ছিল? এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ১৫ ভাগ বেড়ে যাওয়ায় এ বছর মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশে পৌঁছানোর শঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাত সংস্কারের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে তাঁরা পরামর্শ দিচ্ছেন, জ্বালানি অপচয় কমানো এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের আঁচ এবার সরাসরি পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশের জনজীবনে। গাজা থেকে লেবানন—মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের উত্তাপে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা অস্থির। যে সংকটকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে দেশে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের সমন্বয় আনা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা‘দশা। কারণ অতীত নজির বলছে, যখনই জ্বালানির দাম বাড়ে, তার সরাসরি আঘাত লাগে পরিবহন, ফসলের ক্ষেত থেকে শুরু করে সাধারণের বাজারের থলেও। সর্বশেষ ঘোষণায় চার ধরনের তেলের নতুন দর লিটারপ্রতি বাড়ানো হয়েছে আগের চেয়ে সর্বনিম্ন ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত। যার সরাসরি প্রভাব পড়বে পরিবহন, কৃষি, ও নিত্যপণ্যের বাজারে। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বেড়ে যাবে সবকিছুর দাম; বাড়বে সব খাতের উৎপাদন ব্যয়। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে কৃষি, শিল্পসহ সব খাতে।
কিছুদিন আগেও দেশে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল প্রায় ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা। কিন্তু নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিজেলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৫ এবং কেরোসিন প্রতি লিটার ১৩০ টাকা। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে ডিজেলে প্রতি লিটারে বেড়েছে প্রায় ১৫ এবং কেরোসিনে ১৮ টাকা।
দেশের কৃষি, সেচব্যবস্থা এবং পণ্য পরিবহন- সবকিছুই মূলত ডিজেলনির্ভর। ফলে তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন খরচ বাড়াবে, যা শেষ পর্যন্ত গিয়ে চাপ সৃষ্টি করবে সাধারণ মানুষের খাদ্য ব্যয়ের ওপর। সরকারের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয়, ডলার সংকট এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথমত, দেশের অধিকাংশ সেচ পাম্প ডিজেলচালিত হওয়ায় তেলের দাম বাড়লে সরাসরি সেচ খরচ বৃদ্ধি পায়। লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বৃদ্ধি মানেই কৃষকের একরপ্রতি উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়া। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা এই বাড়তি ব্যয় বহনে হিমশিম খান। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তারা বাধ্য হন আবাদ কমিয়ে দিতে। দ্বিতীয়ত, কৃষিকাজের অন্যান্য ধাপেও রয়েছে জ্বালানির ব্যবহার।
ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, ধান মাড়াইয়ের মেশিনসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র চালাতে প্রয়োজন হয় তেলের। সেই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে এসব যন্ত্র ব্যবহারের খরচ বাড়বে, যা উৎপাদন ব্যয়ের সামগ্রিক পরিমাণকে বাড়াবে উল্লেখযোগ্যভাবে। তৃতীয়ত, কৃষিপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও তেলের দাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে পণ্য আনার পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে তা শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্যের দামে প্রতিফলিত হয়। ফলে ভোক্তাদের বেশি দামে খাদ্যপণ্য কিনতে হয়, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। চতুর্থত, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের লাভের পরিমাণ কমে যায়। অনেক সময় বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়েন। এতে কৃষি পেশার প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে ফেলতে পারে হুমকির মুখে।
এ পরিস্থিতিতে করণীয় হিসেবে সরকারকে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষকদের জন্য জ্বালানিতে ভর্তুকি, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোও প্রয়োজন। সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ যারা এরই মধ্যে মুদ্রাস্ফীতির চাপে পিষ্ট, তাদের জন্য এই বাড়তি ব্যয় বহন হয়ে পড়বে দুঃসাধ্য। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার ওপর পড়ে। তাই এ খাতকে সুরক্ষিত রাখতে পরিকল্পিত ও বাস্তবমুখী নীতি গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
বাসের ভাড়া ৬৪ শতাংশ বাড়ানোর আবদার
বাড়বে না, বাড়ছে না করেও শনিবার রাতে হঠাৎ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার। গতকাল রবিবার সকাল থেকেই রাস্তাঘাটে দেখা যায় তার প্রভাব। কমে যায় গণপরিবহন। পরিবহন মালিকরা সরাসরি কিছু না বললেও বাড়তি টাকায় তেল কিনে আগের ভাড়ায় গাড়ি চালাতে চান না তারা। এমন পরিস্থিতিতে গণপরিবহনের ভাড়াও ‘সমন্বয়ের’ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিআরটিএর এক কর্মকর্তা ও মালিক সমিতির এক নেতা নিশ্চিত করেছেন, বাস ভাড়া বেড়ে কত হতে পারে তার একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে। সে প্রস্তাব অনুযায়ী, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ মহানগরীগুলোতে বাস ভাড়া ৬৪ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব তোলা হবে। আর দূরপাল্লার বাসে ৩৭ শতাংশ ভাড়া বাড়াতে চান মালিকরা।
বিআরটিএর তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে মহানগরীতে বাসে প্রতি কিলোমিটারের জন্য যাত্রীদের গুনতে হচ্ছে ২ টাকা ৪২ পয়সা। আর দূরপাল্লায় যাত্রীরা দিচ্ছেন ২ টাকা ৪৫ পয়সা করে। মালিক সমিতির প্রস্তাব অনুযায়ী ভাড়া বাড়লে মহানগরীতে প্রতি কিলোমিটারে বাস ভাড়া হবে ৩ টাকা ৯৬ পয়সা এবং দূরপাল্লায় হবে ৩ টাকা ৩৬ পয়সা।
দেশে সর্বশেষ বড় পরিসরে ভাড়া বেড়েছিল ২০২২ সালের ৬ আগস্ট। তার আগে মহানগরে বাসের ভাড়া ছিল কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ১৫ পয়সা। বাড়িয়ে করা হয় ২ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ সে সময় কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া বাড়ে ৩৫ পয়সা। আর দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ১ টাকা ৮০ পয়সা থেকে করা হয় ২ টাকা ২০ পয়সা। তখন বেড়েছিল মহানগরে মিনিবাসের ভাড়াও। কিলোমিটার প্রতি ৩৫ পয়সা বেড়ে ২ টাকা ৫ পয়সার জায়গায় করা হয় ২ টাকা ৪০ পয়সা। তবে মহানগরে বাস ও মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া থাকে আগেরটাই। ওই সময়ও ডিজেল লিটারপ্রতি বাড়ে ৩৪ টাকা, অকটেন ৪৬ টাকা ও পেট্রলের দাম বাড়ে লিটারে ৪৪ টাকা। দাম বাড়ার পরে ডিজেল ১১৪ টাকা, অকটেন ১৩৫ টাকা এবং পেট্রলের দাম হয় ১৩০ টাকা।
এরপর কয়েক দফায় জ্বালানির দাম কমে। কিন্তু এবার তখনকার মতো তেলের দাম এত বাড়েনি। এবার ডিজেল ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা হয়েছে। অকটেন ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪০ টাকা। আর পেট্রল ১১৬ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে লিটারপ্রতি। দুইবারের মূল্যবৃদ্ধি খেয়াল করলে দেখা যাবে, ২০২২ সালের জ্বলানির দামের তুলনায় এবার বৃদ্ধির পর তফাৎ খুব বেশি নেই। যদিও ভাড়া বাড়ানোর আবদারে ব্যাপক তফাত রয়েছে। তখন সর্ব্বোচ ভাড়া বেড়েছিল ২২ দশমিক ২২ শতাংশ। আর এবার ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর আলোচনা উঠবে।
এর পেছনে অবশ্য যুক্তি দিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. জোবায়ের মাসুদ। তার কথায়, এই সময়ের মধ্যে বেড়েছে সব কিছুর খরচ। বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রাংশের দাম। শুধু তেলের দাম দেখেই তো হবে না। আছে আরও অনেক খরচ। জোবায়ের মাসুদের ভাষ্য, তখন ৮২ টাকায় ১ ডলার পাওয়া যেত। এখন তা ১৩০ টাকা। আমাদের সব কিছু আমদানি নির্ভর। শুধু ডলারের কারণেই খরচ বেড়ে গেল ৫০ শতাংশ। এসবের ভর্তুকি কোত্থেকে আসবে? এমন প্রশ্ন তুলে তার দাবি, বাসের ভাড়া ঢাকায় অন্তত ৪ টাকা ১০ পয়সা হওয়া উচিত। আর দূরপাল্লায় সাড়ে ৩ টাকা। কারণ ঢাকায় ১৬ ঘণ্টা বাস চালিয়েও ১৬০ কিলোমিটার চলা যায় না। আয় না হলেও খরচ তো ঠিকই হচ্ছে।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বাসের ভাড়া বাড়ানোর জন্যও দেওয়া হয় চিঠি। সেই চিঠিতে মহানগরীতে চলাচলকারী বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ৩ টাকা ৬০ পয়সা এবং দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ৩ টাকা করার প্রস্তাব উল্লেখ আছে।
গণপরিবহন ও পণ্যবাহী যানের ভাড়া পুনর্নির্ধারণের আবেদন জানিয়ে ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর এ-সংক্রান্ত চিঠি দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। চিঠিতে ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানানো হলেও নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু মৌখিকভাবে মহানগরীতে কিলোমিটারপ্রতি ১ টাকা ১৮ পয়সা ও দূরপাল্লায় ৫০ পয়সা করে বাড়ানোর কথা জানানো হয় সরকার সংশ্লিষ্টদের। ওই বছর ঢাকায় আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি) সভায় ওঠে বাস ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা।
ওই সভায় উত্থাপন করা হয় সুপারিশ। তারপর দাবি জানিয়ে সমিতির পক্ষ থেকে সরকারকে চিঠি দেওয়া হয়। সেই চিঠিতে বলা হয়, ২০২২ সালের ৬ আগস্ট শুধু ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ভিত্তিতে দূরপাল্লার ও মহানগরীতে বাস ও মিনিবাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। তবে ওই সময় গাড়ির টায়ার-টিউব, লুব্রিকেন্ট, ব্রেক-সু এবং অন্যান্য খুচরা যন্ত্রাংশের মূল্যবৃদ্ধি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া ট্রাক, পিকআপ, মিনি ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইমমুভারের (পণ্যবাহী যান) ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা না থাকায় এসব যানবাহনের ভাড়া সমন্বয় বা বৃদ্ধি করা হয়নি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলমের ভাষ্য, যৌক্তিক হারে ভাড়া না বাড়ালে কঠিন হয়ে যাবে গাড়ি চালানো। সব কিছুর দাম বাড়ছে, বাস ভাড়া কেন বাড়বে না। আর যদি বাসের ভাড়া বাড়ানো না হয়, তাহলে যন্ত্রাংশের দাম কমাতে বলব।
সাধারণত বাসের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে জ্বালানির মূল্য, গাড়ির দাম, যদি ব্যাংক ঋণ থাকে তাহলে সুদের হার, যন্ত্রাংশের মূল্য এবং গাড়ির মানসহ বিবেচনা করা হয় ২২টি বিষয়। একই সঙ্গে বাসের অন্তত ৩০ শতাংশ আসন ধরা হয় খালি থাকবে; যেন সব আসনে যাত্রী না থাকলেও মালিকের লোকসান না হয়। মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সর্বশেষ ভাড়া বাড়ানোর সময় শুধু জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। অন্যান্য খাত গুরুত্ব পায়নি। এখন যন্ত্রাংশের দাম বাড়ছে।
যাত্রীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলছেন, ভাড়া কয়েক পয়সা কমলে এই সুফল যাত্রীরা পায় না। কিন্তু বাড়লে ঠিকই তা কার্যকর হয়। আর ভাড়া যেহেতু ৩ পয়সা, ৫ পয়সা করে কমেছিল এখন ১৫ পয়সা বাড়া উচিত। এর বেশি না। উল্টো দিকে মালিকরা যে তাদের নানা খরচের কথা বলে, তাহলে আমরা যাত্রীরাও তো বলতে পারে সেবার মানের কথা। ভাঙা বাসে উন্নত সেবার মানের ভাড়া দেওয়ার প্রশ্নই উঠে না।
লঞ্চভাড়া ৩৬–৪২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অভ্যন্তরীণ নৌপথে যাত্রীবাহী লঞ্চের ভাড়া ৩৬ থেকে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল যাত্রী পরিবহন (যাপ) সংস্থা। প্রস্তাবনা অনুযায়ী ১০০ কিলোমিটারের কম ও বেশি উভয় দূরত্বে কিলো প্রতি ১ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব ইতিমধ্যেই অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কাছে পাঠিয়েছে সংস্থাটি। এ ছাড়া যাত্রীপ্রতি সর্বনিম্ন ভাড়া ২৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গতকাল রবিবার এ সংক্রান্ত চিঠি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংস্থার মহাসচিব মো. ছিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী। তিনি জানান, ১৮ এপ্রিল সরকার ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। এর ফলে লঞ্চ পরিচালনার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় লঞ্চ খাত টিকিয়ে রাখতে যাত্রীভাড়া পুনর্নির্ধারণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
সংস্থাটির প্রস্তাব অনুযায়ী, ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে বর্তমান প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ২ টাকা ৭৭ পয়সা থেকে ১ টাকা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৭৭ পয়সা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে, যা প্রায় ৩৬ শতাংশ বৃদ্ধি। আর ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে বর্তমান ২ টাকা ৩৮ পয়সার স্থলে ১ টাকা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৩৮ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা প্রায় ৪২ শতাংশ বৃদ্ধি। এ ছাড়া যাত্রীপ্রতি সর্বনিম্ন ভাড়া ২৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, অভ্যন্তরীণ নৌপথে চলাচলকারী লঞ্চগুলো সম্পূর্ণভাবে ডিজেলনির্ভর। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি প্লেট, অ্যাঙ্গেল, প্রপেলার, ইঞ্জিনের খুচরা যন্ত্রাংশ, ওয়েল্ডিং রড, গ্যাস, রং ও স্পেয়ার পার্টসসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এ ছাড়া সড়ক যোগাযোগের ব্যাপক উন্নয়নের কারণে যাত্রীসংখ্যা কমে যাওয়ায় লঞ্চগুলো ধারণক্ষমতা অনুযায়ী যাত্রী পাচ্ছে না। ফলে মালিকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এ পরিস্থিতিতে লঞ্চ খাত টিকিয়ে রাখতে প্রস্তাবিত হারে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে যাপ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









