জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে ৫০ সদস্যের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি দল বিএনপির কোটায় ৩৬ ও বিরোধী দল জামায়াত জোটের ১৩ জন রয়েছেন। বাকি একজন স্বতন্ত্র কোটায়। এর মধ্যে সরকার ও বিরোধী দল থেকে মনোনীত বেশির ভাগ সদস্যই দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিজ দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকে আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে আজ রাজপথ থেকে সংসদের পথে। কিন্তু এদের বিপরীতে অনেকেই আবার ঠিকই অন্যের আলোয় হয়েছেন আলোকিত। অর্থাৎ তাদের নিজের চেয়েও পিতা কিংবা স্বামীর পরিচয়ই মুখ্য হয়ে উঠেছে এমপি হতে। পাশাপাশি বিগত দিনে নিজ নিজ দলে কার কী অবদান- এ নিয়েও সর্বত্র এখন আলোচনা-সমালোচনা তুঙ্গে।
জানা গেছে, গত সোমবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বিএনপি মনোনীত ৩৬ জনের নাম ঘোষণা করেন। আর গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমা শেষে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ গণমাধ্যমের সামনে জোটের মনোনীত প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করেন।
এদিকে দুই জোট থেকে প্রাথমিকভাবে মনোনীত নারী প্রার্থীদের নিয়ে এখন বেশ সরগরম রাজনীতির মাঠ। অতীতে দুই দলেই কার কী অবদান এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিশেষ করে বড় দল বিএনপিতে এ নিয়ে চলছে নানামুখী আলোচনা। কারণ দলটির যে ৩৬ জনকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে তাদের মধ্যে অনেকেই এসেছেন পিতা বা স্বামীর কোটায়। যদিও সংখ্যাটা খুব বেশি নয়। তবু আলোচনায় স্থান পাচ্ছে তাদের অতীত ইতিহাস ও পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়গুলো। বিশেষ করে বিএনপির মনোনীত বেশির ভাগ সদস্যের ক্ষেত্রে নিজের সাংগঠনিক মেধা ও যোগ্যতায় উঠে আসার গল্প বলা হলেও দলীয় রাজনীতিতে কয়েকজনের সরাসরি সম্পৃক্ততা না থাকায় এ নিয়েও চলছে আলোচনা-সমালোচনা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে দলটির গোপালগঞ্জ থেকে মনোনীত হওয়া সুবর্ণা শিকদার (ঠাকুর)-কে নিয়ে। সুবর্ণা শিকদার (ঠাকুর) কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর শ্রীধাম ওড়াকান্দি ঠাকুরবাড়ির সদস্য সুবর্ণার নাম তালিকায় আসার পর এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয়েছে আলোচনার ঝড়। যদিও বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার পর সুবর্ণা দাবি করছেন, আওয়ামী লীগের কমিটিতে অনুমতি না নিয়েই তার নাম রাখা হয়েছিল।
কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনের পর ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষিত হয়।
গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জি এম সাহাবুদ্দিন আজম স্বাক্ষরিত ওই কমিটির তালিকার ২৭ নম্বরে বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে আছে সুবর্ণা ঠাকুরের নাম। সেই সুবর্ণা ঠাকুর বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে যাচ্ছেন ত্রয়োদশ সংসদে। এ নিয়ে জেলাব্যাপী তুমুল আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত লোকজন নানা ধরনের মন্তব্য করছেন।
এমডি জাকির হোসেন নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগের পক্ষে ডবল অভিনন্দন।’ অ্যাড. জাবের আমৈ মোল্লা লিখেছেন, ‘ঠাকুর সবার, তাই এ রকম হয়েছে।’ মো. শফিকুর ইসলাম লিখেছেন, ‘এইডা দিয়েই তো সব হিন্দু ভোটকেন্দ্রে নিয়েছে।’
মনোনয়ন তালিকায় নাম আছে আওয়ামী লীগ আমলের এপিপিরও। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অ্যাডভোকেট মাধবী মারমাকেও মনোনীত করেছে বিএনপি। জানা যায়, মাধবী মারমা ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আওয়ামী সরকারের আমলে দলীয় এপিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০১৫ সালে তিনি নোটারি পাবলিক হিসেবেও দায়িত্বে ছিলেন।
সুবর্ণা ও মাধবীর মনোনয়নের বিষয়টি বিএনপির কৌশলগত সিদ্ধান্ত কি না—তা নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ। এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের মনোনয়ন ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে দলীয় প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় নতুন বাস্তবতা ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হতে পারে।
এর বাইরে বিএনপির মনোনীত আরো অনেকের পিতা বা স্বামীর পরিচয়টিও বেশ আলোচনায় আছে। এর মধ্যে বিএনপি ঘোষিত সংরক্ষিত নারী আসনের ৩৬ জনের তালিকায় আলোচিত নাম ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী। মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মরহুম অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরীর মেয়ে তিনি। তবে কেবল ‘বাবার পরিচয়’ নয়, জহরত আদিব নিজের যোগ্যতায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক পরিচিত নাম। আলোচনা আছে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী ও আংশিক বায়েজিদ) সংসদীয় আসনের সাবেক চারবারের সংসদ সদস্য ও বিএনপির সাবেক মরহুম সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানাকে নিয়েও।
যদিও তিনি দলে খুবই পরিচিত মুখ। কারণ ২০১৫ সালের জঙ্গি সংগঠন হামজা ব্রিগেডকে অর্থায়নের মিথ্যা অভিযোগ এনে র্যাবের দায়ের করা মামলায় তিনি কারাবরণ করেন। বিগত পতিত সরকারের আমলে তিনি চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে কারাবরণ করে বাবার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। এ ছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকনের স্ত্রী শিরিন সুলতানা, শেরপুরের ডাক্তার সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সংস্কৃতি মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরীর মেয়ে ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের পুত্রবধু নিপুণ রায় চৌধুরী, গুম হওয়া বিএনপি নেতা সুমনের বোন এবং মায়ের ডাক-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম, প্রয়াত শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইনসহ আরো বেশ কয়েকজনের নাম আলোচিত হচ্ছে।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন চ্যানেল আইয়ের ‘তৃতীয় মাত্রা’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক সাংবাদিক জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ফাহমিদা হকের মনোনয়ন নিয়ে। তার মনোনয়ন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এ নিয়ে গতকাল জিল্লুর রহমান নিজেও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে। কারণ তার স্ত্রীর মনোনয়নে প্রশ্ন উঠছে—দলের ত্যাগী ও দীর্ঘদিনের নারী নেত্রীদের উপেক্ষা করে কেন ফাহমিদা হককে হঠাৎ এমপি মনোনয়ন দেওয়া হলো? কেউ কেউ বলছেন, এটি কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি পূর্বনির্ধারিত দায়বদ্ধতার অংশ।
সমালোচকদের অনেকেই বলছেন, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতায় পৌঁছেছে। এই সমঝোতার অংশ হিসেবে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। ফাহমিদা হকের মনোনয়ন সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের একটি উদাহরণ, যা বিএনপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতাকেও তুলে ধরে।
তালিকায় আরো আছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক রাশেদা বেগম, সহপ্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক রেহেনা আক্তার, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক বিলকিস ইসলাম, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা নেওয়াজ হালিমা আরলী, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবা, সহ-স্থানীয় সরকারবিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আক্তার, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মানসুরা আক্তারসহ অনেকে। তবে এদের বেশির ভাগ সদস্যই নিজের আলোয় আলোকিত। অর্থাৎ তারা সবাই দলে সরাসরি সক্রিয় থেকে রাজনীতি করেছেন।
জামায়াত জোট : বিরোধী দল জামায়াত জোট থেকে মনোনীত প্রার্থীরা হলেন- নূরুন্নিসা সিদ্দীকা, মারজিয়া বেগম, সাবিকুন নাহার মুন্নি, মারদিয়া মমতাজ, নাজমুন নাহার নীলু, মাহফুজা সিদ্দিকা, সাজেদা সামাদ ও সামসুন নাহার; জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি থেকে মনিরা শারমিন ও মাহমুদা আলম মিতু; জাগপার চেয়ারম্যান তাসমিয়া প্রধান; বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নারী মজলিসের সদস্য মাহবুবা হাকিম এবং জুলাই শহীদ শিশু জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম। এদের মধ্যে জামায়াতের আটজন সরাসরি দলের বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছেন। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী দলটির নেতা বিশেষ করে এবারের সংসদে যাওয়া কোনো এমপির স্ত্রী বা মেয়েকে মনোনীত করা হয়নি। তবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নারী সংগঠন নারী মজলিসের সদস্য মাহবুবা হাকিম দলটির আমির শায়খুল হাদিস আল্লামা মামুনুল হকের ভাগ্নি।
আজ ও আগামীকাল মনোনয়নপত্র বাছাই হবে এবং কোনো প্রার্থী চাইলে ২৯ এপ্রিলের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে পারবেন। চূড়ান্ত প্রতীক বরাদ্দ হবে ৩০ এপ্রিল এবং ভোটের জন্য ১২ মে দিন ধার্য করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বর্তমান সংসদের আনুপাতিক বিন্যাস অনুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াত জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্র জোট ১টি আসন পেতে যাচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









