বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি ইরান যুদ্ধের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে গত কিছুদিনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের চরম বাড়াবাড়িতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণ এবং পারস্য উপসাগরে উত্তেজনার ফলে এই সংকীর্ণ জলপথটি এখন বিশ্ববাজারের নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখন আক্ষরিক অর্থেই হরমুজের মুঠোয়। গতকাল ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এশিয়াসহ ইউরোপের বাজারে তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই জলপথটি দিয়ে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। গত কয়েক সপ্তাহে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সামরিক মহড়া এবং পাল্টাপাল্টি ড্রোন হামলার ঘটনায় জাহাজ চলাচলে চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব শেয়ারবাজারে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল, তারা এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় অনেক দেশ এরই মধ্যে জরুরি জ্বালানি সতর্কতা জারি করেছে।
সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে প্রধান শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া ছায়াযুদ্ধ এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই। গতকাল ২৩ এপ্রিলের সর্বশেষ গোয়েন্দা তথ্য ও স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, প্রণালির আশপাশে মাইন স্থাপন এবং টহল জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজগুলো রুট পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে পরিবহন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ফলে শুধু জ্বালানি নয়, বরং খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য কাঁচামালের দামও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের (স্থানীয় সময়) প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের গোপন তথ্য দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পেতে রাখা অত্যাধুনিক মাইন অপসারণ করতে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই উদ্ধারকাজ শুরু হওয়া অনিশ্চিত এবং জিপিএস প্রযুক্তিসম্পন্ন এসব মাইন শনাক্ত করা অত্যন্ত দুরূহ। এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানি ও তেল বাণিজ্যে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতার আশঙ্কায় মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএন তাদের এক প্রতিবেদনের জানায়, গত ২১ এপ্রিল (স্থানীয় সময় মঙ্গলবার) যুক্তরাষ্ট্রের হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটি গোপন ব্রিফিংয়ে প্রতিরক্ষা দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি সংকেতই দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তি হলেও দ্বন্দ্বের জেরে জ্বালানি তেল চড়া দামেই বিক্রি হতে পারে। সিএনএন বলছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতি চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে জাপান ও চীনসহ এশিয়ার প্রধান দেশগুলো এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল, যা বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের একটি দীর্ঘস্থায়ী উষ্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ।
এ বিষয়ে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ রিচার্ড নেফিউ ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন, সমুদ্রপথে মাইন পুঁতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করা হলে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং দেশের অন্যতম শীর্ষ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম। দৈনিক এদিনকে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া বা এখানে অস্থিরতা বজায় থাকা মানে হলো বিশ্ব অর্থনীতির ধমনী চেপে ধরা। তিনি বলেন, বিশ্বের প্রায় ২০-২৫% তেল ও গ্যাস পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। কিন্তু প্রণালির প্রবেশপথে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় বর্তমান পরিস্থিতিতে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার। তিনি বলেন, যদি দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তবে উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় বিশ্বের শিল্পোৎপাদন ব্যবস্থা থমকে যাবে। তাঁর মতে, শক্তির বিকল্প উৎসগুলো এখনো হরমুজের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ইমতিয়াজ আহমেদ দৈনিক এদিনকে বলেন, এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক পথ নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার পথও। পারস্য উপসাগরের এই সংকীর্ণ জলপথটি এখন বড় রাষ্ট্রগুলোর দরকষাকষির প্রধান হাতিয়ার। ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনার প্রভাব সরাসরি এই রুটটির ওপর পড়ছে।
আন্তর্জাতিক এই বিশ্লেষকের ভাষায়, বর্তমানে বিশ্ব শান্তির চাবিকাঠি এখন আর কোনো রাজধানীর টেবিলে নেই, এটি লোনা জলের ওপর ভাসমান যুদ্ধজাহাজগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও দৃশ্যমান হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন খাতে খরচের লাগামহীন বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। দেশের জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, যদি হরমুজ দিয়ে তেলের জাহাজ আসা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিতিশীলতা ইতিমধ্যে অভ্যন্তরীণ বাজারে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের মূল্যবৃদ্ধিতে চাপ সৃষ্টি করেছে, যা সরাসরি কৃষি ও উৎপাদন খাতে প্রভাব ফেলছে।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়ায়, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বারবার এ সংকটে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে আসছে । চীনের মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলো স্থায়ী সমাধানে মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও এখনো কোনো ইতিবাচক ফলাফল আসেনি। বিশ্বনেতাদের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো মুক্তভাবে জাহাজ চলাচলের নিশ্চয়তা প্রদান করা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে হরমুজ প্রণালি কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির ভাগ্যবিধাতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই সংকটের মেঘ আরো ঘনীভূত হচ্ছে। কূটনৈতিক তৎপরতা সফল না হলে বিশ্ববাসী এক চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হবে। হরমুজের এই মুঠো থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হলো আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









