সারাদেশে চাঁদাবাজের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের ইউনিটের তথ্যের ভিত্তিতে তিন হাজার ৮৪৯ চাঁদাবাজের একটি তালিকা চূড়ান্ত করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় রয়েছে এক হাজার ২৫৪ জন। বাকিরা সক্রিয় দেশের অন্যান্য জেলায়। এ তালিকা ধরে পুলিশ শিগগির সাঁড়াশি অভিযান চালাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সারাদেশের পুলিশের ৭২টি ইউনিট থেকে পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই শেষে ৩ হাজার ৮৪৯ জনের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আসন্ন পুলিশ সপ্তাহের (১০ মে থেকে শুরু) আগেই মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা পেলে দেশজুড়ে বিশেষ অভিযানে নামবে পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেছেন, চাঁদবাজদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। অচিরেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে। এ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। দল-মত-নির্বিশেষে চাঁদাবাজ যেই হোক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অভিযানের ক্ষেত্রে দলীয় কোনো বিবেচনার সুযোগ নেই।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, তালিকা তৈরির পাশাপাশি চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে নিয়মিত আইনি ব্যবস্থা অব্যাহত আছে। তবে এই হালনাগাদ তালিকা ধরে বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান চালানো হবে কিনা, তা নির্ভর করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর।
উল্লেখ্য, গত ৪ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ডিএমপি সদর দপ্তরে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরির সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেন। সেদিন সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে সক্রিয় চাঁদাবাজ, অস্ত্রধারী ও দাগি আসামিদের একটি ‘নির্মোহ’ বা নিরপেক্ষ তালিকা তৈরির ঘোষণা দিয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেদিন আরো জানিয়েছিলেন, তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া ঢাকা থেকে শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে সারাদেশে চলবে। কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর সারাদেশে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং এতে কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। মূলত মন্ত্রীর ওই নির্দেশনার পর থেকেই পুলিশ সদর দপ্তর ও র্যাবসহ বিভিন্ন ইউনিট তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করে, যার ভিত্তিতে বর্তমানে ৩ হাজার ৮৪৯ জনের এই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্যমতে, এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে সড়ক, হাটবাজার, বালুমহাল, বাস-টেম্পো স্ট্যান্ড, নৌঘাট, মাছ বাজার, ভ্রাম্যমাণ কাঁচাবাজার, সরকারি লিজকৃত জমিতে গড়ে ওঠা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পাইকারি আড়ত এবং বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্প থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে আসছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া, তালা ঝুলিয়ে দেওয়া কিংবা নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটায় তারা। পুলিশের তালিকাভুক্তদের প্রায় ৯০ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত—এমন অভিযোগ রয়েছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের পরিচয়ও বদলে ফেলে। এক পর্যায়ে তারা নতুন ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং চাঁদা আদায় করতে শুরু করে।
পুলিশের এক সূত্র জানায়, চাঁদাবাজির মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ কিছু অসাধু রাজনৈতিক নেতা ও দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্যদের কাছেও পৌঁছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই এই চক্র প্রভাবশালী অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং সাম্প্রতিক সময়ে কারা চাঁদা তুলে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে তাদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিতে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেন।
জানা গেছে, সারাদেশের তিন হাজার ৮৪৯ জন চাঁদাবাজের মধ্যে ঢাকা মহানগর এলাকায় চাঁদাবাজ রয়েছে এক হাজার ২৫৪ জন। বাকি দুই হাজার ৫৯৫ জন চাঁদাবাজ রয়েছে ৬৪টি জেলায়। এর মধ্যে গাজীপুরে ৩৪, ঢাকা জেলায় ১৫৪, মানিকগঞ্জে ৩০, নরসিংদীতে ৪০, রাজবাড়ীতে ৪৫, ফরিদপুরে ৩৫, গোপালগঞ্জে ২০, কিশোরগঞ্জে ২৪, মাদারীপুরে ৩৪, মুন্সীগঞ্জে ১৮, নারায়ণগঞ্জে ৫০, শরীয়তপুরে ২৩, টাঙ্গাইলে ৩০, কুষ্টিয়ায় ২৪, মাগুরায় ২৩, মেহেরপুরে ১৭, নড়াইলে ৩৫, সাতক্ষীরায় ৩৮, বাগেরহাটে ৫৫, চুয়াডাঙ্গায় ৪৫, যশোরে ৬৫, ঝিনাইদহে ২২, খুলনায় ৩৬, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৮, চাঁদপুরে ৪৭, চট্টগ্রামে ৬৭, কুমিল্লায় ২৬, কক্সবাজারে ৮৮, ফেনীতে ৪৩, লক্ষ্মীপুরে ২৯, নোয়াখালীতে ৩৪, নাটোরে ১২, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৫, পাবনায় ৫৭, রাজশাহীতে ১৪, সিরাজগঞ্জে ১৮, বগুড়ায় ১৩, জয়পুরহাটে ১৮, নওগাঁয় ৫৪, সুনামগঞ্জে ১২, সিলেটে ৩৫, হবিগঞ্জে ৩৪ ও মৌলভীবাজারে ৪৫ জনের নাম চাঁদাবাজের তালিকা উঠে এসেছে। এ ছাড়া পঞ্চগড়ে ৪৩, রংপুরে ২২, ঠাকুরগাঁওয়ে ১৭, জামালপুরে ৬৭, ময়মনসিংহে ৩৪, নেত্রকোনায় ৩২, শেরপুরে ২৩, দিনাজপুরে ৩৫, গাইবান্ধায় ৩৮, কুড়িগ্রামে ৩৩, লালমনিরহাটে ২২, নীলফামারীতে ৩৬, ঝালকাঠিতে ৬১, বরগুনায় ৪২, বরিশালে ৩৯, ভোলায় ৭৩, পটুয়াখালীতে ৮৮ ও পিরোজপুরে ৩৮ জনের নাম চাঁদাবাজের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। এছাড়া তিন পার্বত্য জেলায় ২৪৬ চাঁদাবাজ রয়েছে বলে পুলিশের তালিকায় উঠে এসেছে। এর মধ্যে রাঙামাটি জেলায় ৯২, খাগড়াছড়িতে ৮৮ জন এবং বান্দরবনে ৬৬ জন চাঁদাবাজ রয়েছে।
ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তারা ডিএমপির আটটি ক্রাইম জোনের ভিত্তিতে এক হাজার ২৫৪ জন চাঁদাবাজের একটি ডাটা তৈরি করা হয়েছে। সেই তালিকা অনুযায়ী হাতিরঝিলে ২০ জন, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে ৪৪, তেজগাঁওয়ে ১০৫, শেরে বাংলা নগরে ১৩, মোহাম্মদপুরে ২২, আদাবরে চার, মিরপুর ২৩, তুরাগে ১২, উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় ১৩, উত্তরা পূর্ব থানা এলাকায় ১৪, উত্তরখানে ১৭, দক্ষিণখানে ১২, বিমানবন্দরে ২৩, গুলশানে ১৪, খিলক্ষেতে ১৫, ভাটারায় ছয়, বাড্ডায় চার, বনানীতে ১৫, ভাষানটেকে পাঁচ, কাফরুলে চার, মিরপুরে ১২২, পল্লবীতে ৩৩, দারুস সালামে ছয়, শাহ আলীতে ১৬, রূপনগরে ১২, শাহবাগে ১৪, কলাবাগানে আট, নিউ মার্কেটে ৩৩, ধানমন্ডিতে ১২, রমনায় ১৪, হাজারীবাগে ৫৪, মতিঝিলে ৩৪, পল্টনে ৩৭, শাহজাহানপুরে ২২, সবুজবাগে ২৪, মুগদায় ১৩, খিলগাঁওয়ে ২৩, রামপুরায় ২৩, কদমতলীতে ২৩, ডেমরায় ১২, যাত্রাবাড়ীতে ৩৪, লালবাগে ৪৫, গেন্ডারিয়ায় ছয়, শ্যামপুরে ৫৫, কোতোয়ালীতে ৩৩, সূত্রাপুরে ২৩, বংশালে ৩৪, চকবাজারে ৪৪, লালবাগে ৩৪ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকার ২৩ জনের নাম রয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









