ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও-পাগলা) সংসদীয় আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু। নির্বাচনের আগে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জয়ী হতে পারলে পাগলা থানাকে উপজেলা করবেন। নির্বাচিত হওয়ার পর সেই অনুযায়ী কাজও শুরু করেন। পাগলা থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আধা সরকারি পত্র (ডিও) দেন।
জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে পাগলা থানাকে উপজেলায় রূপান্তরের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। সরকার তাঁর অনুরোধে সাড়া দিয়ে পাগলা থানাকে উপজেলায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেন। গত ১ জুলাই নিকার বৈঠকে ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে দক্ষিণ গফরগাঁও নামে নতুন উপজেলা গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়। ৮ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি হয়।
গতকাল বুধবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নতুন উপজেলা গঠনে স্থানীয়দের মধ্যে উল্লাসের পরিবর্তে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। দক্ষিণ গফরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা বলছেন, জনবসতি নেই এমন বিস্তীর্ণ এবং জনশূন্য ‘বিরানভূমি’তে উপজেলা সদরদপ্তর স্থাপন হলে সেবার চেয়ে ভোগান্তিই বেশি হবে। ফলে নয়াবাড়ি মৌজার গেজেট প্রকাশের পর পাগলা এলাকার বাসিন্দারা এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, নতুন উপজেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র নির্ধারণে জনমত, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং সরকারি নীতিমালার আলোকে বিষয়টি যেন সরকার অতি দ্রুত পুনরায় পর্যালোচনা করে। অন্যথায় নয়াবাড়ি মৌজায় উপজেলা সদরদপ্তর হলে আগামী স্থানীয় নির্বাচনে সাধারণ জনগণ এবং বিএনপির বড় একটি অংশ এমপির পছন্দের প্রার্থীদের বয়কট করবে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলার নামটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঠিক করেছেন। আর উপজেলার সদরদপ্তরের জন্য নয়াবাড়ি মৌজা নির্ধারণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। উপজেলা সদরদপ্তরের জন্য যে স্থানটি নির্বাচন করা হয়েছে, সেটি সবগুলো ইউনিয়নের যোগাযোগের জন্য সহজ হবে।’
তিনি আরো বলেন, জনগণের সহযোগিতা এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে গফরগাঁও ও দক্ষিণ গফরগাঁও উন্নয়নের নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবে। তা ছাড়া দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলার বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তর কান্দিপাড়া থেকে পাগলা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। পাগলায় থানা এবং হাসপাতাল ভবন থাকবে। উন্নয়নের সেতুবন্ধ হবে পাগলা টু কান্দিপাড়া। পাগলা মৌজায় উপজেলা সদরদপ্তর স্থাপন হলে সমস্যা কী? জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো সমস্যা নেই। তবে, নয়াবাড়ি মৌজাই উপযুক্ত স্থান।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির পাগলা থানা শাখার প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক এবং ময়মনসিংহ জেলা দক্ষিণ শাখার যুগ্ম আহবায়ক ডা. আবু মোঃ মোফাখখারুল ইসলাম (রানা) বলেন, পাগলা থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করা দীর্ঘদিনের দাবি। পাগলা থানার ৮ ইউনিয়নের বাসিন্দারা উপজেলার দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাগলা থানাকে দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা নামে অনুমোদন দেওয়ায় পাগলাবাসীসহ সবাই আনন্দিত। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত দাবি পূরণ হওয়ায় বর্তমান সরকার, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের আমার এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। তবে নতুন উপজেলার স্থান নির্ধারণে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
ড. রানা বলেন, পাগলা থানাটি ৮ ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্থান। ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক বিন্যাসে পাগলা মৌজায় উপজেলা সদরদপ্তর স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থান। কিন্তু স্থানীয় সংসদ নিজের সুবিধার জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের বাড়ির পাশে উপজেলা স্থাপনের চেষ্টা করছেন।
তিনি আরো বলেন, সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান বাচ্চু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল পাগলা থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করবেন। কিন্তু পাগলার নির্বাচনী জনসভায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে তিনি জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন।
ড. রানা বলেন, উপজেলার স্থান নির্ধারণে স্থানীয়ভাবে কোনো গণশুনানি হয়নি। এমপির চাপে ডিসি-ইউএনও মনগড়া প্রতিবেদন দিয়েছেন। নয়াবাড়ি মৌজায় উপজেলা সদরদপ্তর স্থাপনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে পাগলা থানার পাশে উপজেলা দপ্তর স্থাপনের জন্য তিনি সরকার প্রধান ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।
গনশুনানি ছাড়াই নয়াবাড়ি মৌজায় উপজেলা সদরদপ্তর স্থাপনের সুপারিশের বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান এদিনকে বলেন, ‘প্রশাসনিক ও নাগরিক সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে গফরগাঁওকে ভাগ করে দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা গঠন করা হয়েছে। নতুন উপজেলার স্থান নির্ধারণে স্থানীয় পর্যায়ে ইউএনও-এসিল্যান্ড মিলে গণশুনানি করেছেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে তারা একটা প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং সেই প্রস্তাব আমরা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। তবে পাগলা মৌজার বদলে নয়াবাড়ি মৌজায় সদরদপ্তর স্থাপনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্যের ইচ্ছের কথা জানান।
পাগলা মৌজা পরিদর্শনে জেলা প্রশাসনের টিম না যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেননি। স্থানীয়দের লিখিত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন। পরে কয়েকবার চেষ্টা করেও তার সম্পূর্ণ বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে গফরগাঁও উপজেলার বিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এন এম আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, ‘নতুন উপজেলার স্থান নির্ধারণে স্থানীয় সংসদ সদস্যের অভিপ্রায়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়নগুলোতে চেয়ারম্যান বা জনপ্রতিনিধি না থাকায় গণশুনানি আমাদের পক্ষ থেকে করা সম্ভব হয়নি। তবে সমন্বয় কমিটি ও আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্যদের নিয়ে বিশেষ সভা করে এ বিষয়ে মতামতসহ একটি প্রস্তাব উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। সেই আলোকে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে তিনি জানান।’
পাগলা থানা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা ইমদাদুল হক বলেন, ‘পাগলা থানাকে উপজেলা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সংসদ সদস্য আকতারুজ্জামান বাচ্চু। পাগলা তথা দক্ষিণ গফাগাঁওয়ের মানুষকে উপজেলার লোভ দেখিয়ে উন্নয়নের মূলা ঝুলিয়ে তিনি ভোট নিয়ে নির্বাচিত হন। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে জনগণের সাথে প্রতারণা করেন। পাগলা থানাবাসীকে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।’
জামায়াতের এই নেতা বলেন, দীর্ঘদিনের জন-আকাঙ্ক্ষা ও ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনা না করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রভাবে এবং যথাযথ প্রক্রিয়া না মেনে সদরদপ্তর নির্ধারণ করার কারণে সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি উপজেলা সদরদপ্তর পাগলা মৌজায় স্থাপনের জন্য সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসন ও সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।
জানা গেছে, দীর্ঘদিনের আন্দোলন, গণস্বাক্ষর ও জনদাবির মধ্যে শেষ পর্যন্ত সরকারি গেজেটে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে ‘দক্ষিণ গফরগাঁও’নামে নতুন উপজেলা গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। তবে নতুন উপজেলার সদর দফতর পাগলা থানার পরিবর্তে উস্তি ইউনিয়নের নয়াবাড়ি মৌজায় নির্ধারণ করায় এলাকায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গত ৮ জুলাই প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটে বলা হয়েছে, মশাখালী, পাগলা, উস্তি, লংগাইর, পাইথল, দত্তের বাজার, নিগুয়ারী ও টাংগাব এই আট ইউনিয়ন নিয়ে ‘দক্ষিণ গফরগাঁও’উপজেলা গঠন করা হয়েছে।
একই সাথে উপজেলার সদর দফতর উস্তি ইউনিয়নের ১৪৩ নম্বর জে এল ভুক্ত নয়াবাড়ি মৌজায় স্থাপনের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। গেজেট প্রকাশের পর পাগলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের জনআকাঙ্খা, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও প্রশাসনিক সুবিধা উপেক্ষা করেই সদর দফতরের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান বাচ্চুর বাড়ির কাছাকাছি কাল্পনিক স্থানে নতুন উপজেলার সদর দপ্তর স্থাপনে করতে ডিসি-ইউএনওকে চাপ দিয়ে তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গফরগাঁও উপজেলার মোট ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মধ্যে নতুন উপজেলার অন্তর্ভুক্ত আটটি ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে পাগলা থানার প্রশাসনিক সেবা গ্রহণ করে আসছে। পাগলা ভৌগোলিকভাবে নতুন উপজেলার প্রায় মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত হওয়ায় এখানেই উপজেলা সদর হলে সব ইউনিয়নের মানুষের জন্য যাতায়াত সহজ হতো। পাশাপাশি পাগলায় আগে থেকেই থানা, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে।
অন্য দিকে উস্তি ইউনিয়নের নয়াবাড়ি মৌজা অবিভক্ত গফরগাঁও উপজেলার সীমানা ঘেঁষে খুব কাছাকাছি। স্থানীয়দের দাবি, পাগলা থেকে নয়াবাড়ির দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হলেও নয়াবাড়ি থেকে বর্তমান গফরগাঁও উপজেলার সীমানা মাত্র তিন কিলোমিটারের মতো। ফলে নতুন উপজেলা গঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য দূরবর্তী জনগণের প্রশাসনিক সেবা সহজ করা- কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাচ্চু নির্বাচনের আগে পাগলা থানাকে উপজেলায় উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমে তিনি পাগলা থানার নামেই উপজেলা গঠনের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দেন। পরে সেই অবস্থান পরিবর্তন করে ‘আদর্শনগর’নামে কাল্পনিক স্থানে নতুন উপজেলা গঠনের প্রস্তাব পাঠান।
স্থানীয়দের দাবি, এমপির বাড়ি লংগাইর ইউনিয়নের শেষ সীমানা এবং উস্তি ইউনিয়নের নয়াবাড়ি মৌজার আধা কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। আর সেই কাল্পনিক আদর্শ নগরকে কেন্দ্র করে উপজেলার সদর দফতর স্থাপনের উদ্যোগ নেন। তিনি এই অযৌক্তিক ও দাম্ভিকতা থেকে সরে না আসলে আগামী নির্বাচনে তাঁকে এবং তাঁর প্রার্থীদের বয়কট করা হবে।পাগলা থানাসংলগ্ন এলাকায় সদর দফতরের দাবিতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, বিক্ষোভ, গণস্বাক্ষর কর্মসূচি ও স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। গেজেট প্রকাশের পর পাগলা এলাকার আন্দোলনকারীরা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, নতুন উপজেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র নির্ধারণে জনমত, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং সরকারি নীতিমালার আলোকে বিষয়টি আবার পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
জানা গেছে, মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর উপজেলা গঠনের জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দেন। পরে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় গফরগাঁও উপজেলা প্রশাসন সম্ভাব্যতা যাচাই করে চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল একটি প্রস্তাব পাঠায়। সেটি জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার দপ্তর হয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগে যায়। এর আগে গত ৩০ মার্চ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাবিত পাগলা উপজেলার নাম পরিবর্তনের জন্য আধা সরকারি পত্র (ডিও) দেন সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু।
ওই আধা সরকারি পত্রে বলা হয়, গত ১ মার্চ গফরগাঁও উপজেলাকে বিভক্ত করে ‘পাগলা’নামের উপজেলা গঠনসংক্রান্ত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ মার্চ তারিখের নির্দেশনা মোতাবেক প্রস্তাবিত পাগলা উপজেলার নাম পরিবর্তন করে ‘আদর্শনগর’ উপজেলা নামকরণের জন্য পুনঃ পেশ করা প্রয়োজন। প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রস্তাবিত পাগলা উপজেলার নাম পরিবর্তে আদর্শনগর করার কথা উল্লেখ করা হয় ওই চিঠিতে। কিন্তু ১ জুলাই নিকার বৈঠকে পাগলা থানার ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে দক্ষিণ গফরগাঁও নামে নতুন উপজেলা গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামানের বাড়ি পাগলা থানার লংগাইর ইউনিয়নের সৈয়দপাড়া গ্রামে। সংসদ সদস্যের নিজ বাড়ি থেকে পাগলা থানার দূরত্ব প্রায় ৮ থেকে ৯ কিলোমিটার। বর্তমানে পাগলা থানাটি যেখানে রয়েছে, সেখান থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে নয়াবাড়ী মৌজায় আদর্শনগর নামে উপজেলা করার প্রস্তাব করা হয়। যেটি সংসদ সদস্যের গ্রামের বাড়ি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে। সংসদ সদস্যের সুবিধার জন্যই পাগলা থানার আশপাশে উপজেলা না করে নিজ বাড়ির কাছাকাছি নেওয়া হচ্ছে।
পাগলা থানার আশপাশে না হয়ে উপজেলা হবে উস্থি ইউনিয়নে (জায়গাটি সংসদ সদস্যের বাড়ির কাছাকাছি) নয়াবাড়ি মৌজায়। এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশের পর অন্য ইউনিয়নগুলোর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে পাগলা থানার টাঙ্গাব, নিগুয়ারি, পাইথল, দত্তেরবাজার এবং মশাখালী এমন কি এমপির বাড়ি লংগাইর ইউনিয়নের বাসিন্দারা ক্ষোভে ফুঁসে উঠছেন। তাঁরা সবাই উপজেলা সদরদপ্তর থানার আশপাশে হোক, এটাই চান। এমপির পছন্দের নয়াবাড়ি মৌজা গফরগাঁও উপজেলার সীমান্তবর্তী হওয়ায় তারা সব ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্থান পাগলাতেই উপজেলার সদরদপ্তর চান।
দত্তের বাজার ইউনিয়নের বাসিন্দা ও বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচনী সভায় পাগলা নামে উপজেলা হবে বলেছিলেন এমপি; কিন্তু এখন নাম বদলে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছেই দক্ষিণ গফরগাঁও হয়েছে। আমরা চাই যেখানে থানা রয়েছে, সেখানেই উপজেলা দপ্তর হোক।’
উপজেলার টাঙ্গাবর ইউনিয়নের বাসিন্দা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক এম. এ. আল মিনহাজ বলেন, নতুন উপজেলার অন্তর্ভুক্ত আটটি ইউনিয়নের জন্য 'পাগলা' এলাকাটি ভৌগোলিক দিক থেকে একদম মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। সেখানে উপজেলা সদর হলে সব ইউনিয়নের মানুষের যাতায়াত সহজ হতো। অন্যদিকে, নির্ধারিত 'নয়াবাড়ি মৌজা' অবিভক্ত গফরগাঁও উপজেলার সীমানার খুবই কাছাকাছি (মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে) এবং নতুন উপজেলার প্রান্তসীমায় অবস্থিত। ফলে দূরবর্তী জনগণের প্রশাসনিক সেবা সহজ করার মূল উদ্দেশ্যটি ব্যাহত হবে।
নিগুয়ারি ইউনিয়নের বাসিন্দা এডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, পাগলা এলাকায় ২০১২ সাল থেকেই থানা কার্যকর রয়েছে। এছাড়া সেখানে আগে থেকেই বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এই তৈরি অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ নতুন ও সুযোগ-সুবিধাহীন একটি মৌজাকে সদর দফতর হিসেবে বেছে নেওয়ায় অন্য ইউনিয়নগুলোতে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তিনি পাগলা থানার আশপাশে উপজেলা সদরদপ্তর স্থাপনের জোর দাবি জানিয়েছেন।
মশাখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ কোনো গণশুনানি করা হয়নি। এমপির নির্দেশে কেবল সমন্বয় ও আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্যদের নিয়ে বিশেষ সভা করে নয়াবাড়ি মৌজায় উপজেলা সদরদপ্তর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যা, প্রশাসনিক কাজে সুবিধার চেয়ে বেশি দুর্ভোগ সৃষ্টি হবে। তিনি পাগলা থানার পাশে পাগলা মৌজায় উপজেলা সদরদপ্তর স্থাপনের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।
লংগাইর ইউনিয়নের বাসিন্দা শেখ ফরিদ বলেন, এমপি নিজের সুবিধা দেখতে গিয়ে জনগণের ভোগান্তি সৃষ্টি করছেন। তাঁর এই স্বেচ্ছাচারিতার মাশুল আগামীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দিতে হবে। লংগাইর ইউনিয়নের বাসিন্দারা এমপির ভাইয়ের অত্যাচার ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ। এমপির ভাই এই ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে চাচ্ছেন। এলাকাবাসী চাঁদাবাজ ও ইয়াবা কারবারির বিরুদ্ধে ভোটের মাধ্যমে জবাব দেবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নবসৃষ্ট দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলার দক্ষিণ অংশের আটটি ইউনিয়ন—দত্তের বাজার, উস্থি, পাঁচবাগ, মশাখালী, লংগাইর, পাইথল, নিগুয়ারী ও টাঙ্গাব নিয়ে ২০১২ সালে দত্তের বাজার ইউনিয়নের পাগলা বাজারে পাগলা থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। উপজেলা সদর থেকে দূরে হওয়ায় প্রশাসনিক কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণ করে নতুন উপজেলা গঠনের জন্য স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বর্তমান সরকার সেই দাবি পূরণে নতুন উপজেলা গঠন করলেও স্থান নির্ধারণে জনআকাঙ্খা পূরণ হয়নি। প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করতে পাগলা থানার পাশেই উপজেলা সদরদপ্তর স্থাপনের পক্ষে মত দিচ্ছেন অধিকাংশ নাগরিক।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









