## জঙ্গি হামলার শঙ্কায় দেশের ৮ বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ সতর্কতা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে এমনিতেই চলছে ব্যাপক সংকট। এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য বেড়ে গেছে। ফলে বাংলাদেশেও তেলসহ নিত্যপণ্যের বাজারে বিরাজ করছে অস্থিরতা। তারই মাঝে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে বিদ্যুৎ সংকট। এসব সংকট সামাল দিতে সরকার যখন আপ্রাণ চেষ্টায় রত, তখনই হঠাৎ এলো জঙ্গি হামলার আশঙ্কার খবর। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জারি করা একটি চিঠিকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে নতুন আশঙ্কা। সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের আটটি বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোতে হতে পারে জঙ্গি নাশকতা কিংবা হামলা। দেশের এই ভীষণ ক্রান্তিকালে জঙ্গি হামলার আশঙ্কার বিষয়টি দেশবাসীকে ফেলেছে চরম দুশ্চিন্তায়।
ঢাকাসহ দেশের ৮টি বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে। গতকাল সোমবার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেন । মূলত পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া একটি বিশেষ চিঠির প্রেক্ষিতেই এই বাড়তি নিরাপত্তা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
গতকাল বিকেলে রাজধানীর কুর্মিটোলায় সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় বেবিচক চেয়ারম্যান জানান, বিমানবন্দরগুলো সবসময়ই কেপিআই (গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা) হিসেবে কঠোর নিরাপত্তাবলয়ে থাকে। তবে সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তা আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নিরাপত্তা বৃদ্ধির একটি চিঠি পেয়েছি। সে অনুযায়ী আমরা সিকিউরিটি অ্যালার্ট জারি করেছি। এটি আমাদের নিয়মিত কাজের অংশ হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না আমরা।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ২৩ এপ্রিল ডিআইজি (কনফিডেনশিয়াল) কামরুল আহসানের সই করা একটি দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে এই সতর্কতা জারি করা হয় । গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া উগ্রবাদী সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী ওরফে আবু বক্করের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, এই চক্রটি জাতীয় সংসদ ভবন, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা এবং বিমানবন্দরসহ দেশের স্পর্শকাতর স্থাপনায় নাশকতার ছক আঁকছিল। এ ছাড়া তারা বিভিন্ন বাহিনীর অস্ত্রাগারে হামলার পরিকল্পনাও করে থাকতে পারে বলে গোয়েন্দা তথ্যে ইঙ্গিত রয়েছে।
নিরাপত্তার এই কড়াকড়ির ফলে শাহজালাল বিমানবন্দরসহ আটটি বিমানবন্দরের অ্যারাইভাল ও ডিপারচার এলাকায় নিরাপত্তা তল্লাশি কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে । বেবিচকের নিজস্ব এভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) ইউনিটের পাশাপাশি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা পোশাকে ও সাদা পোশাকে নজরদারি চালাচ্ছেন। টার্মিনাল ভবন, রানওয়ে এবং বিমানবন্দরের প্রবেশপথগুলোতে কড়া তল্লাশি নিশ্চিত করা হয়েছে। বিমানবন্দর এলাকায় সন্দেহভাজন কাউকে দেখা গেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার, রাজশাহী, যশোর, সৈয়দপুর ও বরিশাল বিমানবন্দরেও একই ধরনের কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় এই ৮টি বিমানবন্দরের সীমানা প্রাচীর সংলগ্ন এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা প্রহরী মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ করে রানওয়ে এবং এয়ারসাইড এলাকায় কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি বা বস্তু যেন প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য আধুনিক প্রযুক্তির সিসিটিভি ক্যামেরা ও সেন্সর ব্যবহার করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাইবার হামলা ও আন্তর্জাতিক উগ্রবাদের প্রেক্ষাপটে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল বাইরের তল্লাশি নয়, বরং প্রতিটি স্তরে কারিগরি এবং গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন । নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক জানান, পুলিশের চিঠিতে সুনির্দিষ্ট নাশকতার ইঙ্গিত থাকায় বিমানবন্দরগুলোতে রেড অ্যালার্ট জারি করা একটি সঠিক পদক্ষেপ। এটি যাত্রীদের মধ্যে সাময়িক আতঙ্ক তৈরি করতে পারে, তবে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে এই কড়াকড়ি অপরিহার্য।
এদিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ যাত্রীদের বাড়তি সময় হাতে নিয়ে বিমানবন্দরে আসার পরামর্শ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রতিটি বিমানবন্দরের প্রবেশপথে দীর্ঘ লাইন এবং কড়া তল্লাশির কারণে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন হতে পারে । বেবিচক চেয়ারম্যান আশ্বাস দিয়ে বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাঁদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত দেশের আটটি বিমানবন্দরে এই সর্বোচ্চ সতর্কতা ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
ডিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হামলার আশঙ্কা থাকলেও সিটিটিসি সহ পুলিশের বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিট বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা চেয়েছে পুলিশ। গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি শনাক্ত করতে মাঠ পর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









