## রূপপুরে ফুয়েল লোডিং শুরু, নিউক্লিয়ার ক্লাবে বাংলাদেশ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার উপর নজিরবিহীন চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০-২৫ শতাংশ জ্বালানি তেল ও ২০ শতাংশ এলএনজি পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে জ্বালানি ও সারের অস্থিরতায় ধুঁকছিল অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও। জ্বালানি তেল ও এলএনজি সংকটের জেরে কমে যায় বিদ্যুৎ উৎপাদন। শুরু হয় লোডশেডিং। তেলের পাম্পে কিলোমিটারের পর কিলোমিটারের লাইন দেখতে হয় বাংলাদেশে। লোডশেডিংয়ের আশঙ্কায় মানুষ জেনারেটর নিয়ে ছুটে যায় ফিলিং স্টেশনে।
জনজীবনে নামতে থাকে অন্ধকার। এই আঁধারের মাঝে আলো হয়ে দেখা দিয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর নতুন ইতিহাসের সূচনা করল। কেন্দ্রটিতে পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসে সূচিত হলো অনন্য এক অধ্যায়। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে পাবনার রূপপুর প্রকল্পটির এক নম্বর ইউনিট নির্মাণযজ্ঞের বহু ধাপ অতিক্রম করে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত। এক দশকের অবকাঠামো নির্মাণ ও জটিল কারিগরি সক্ষমতা অর্জনের পর অবশেষে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে পা রাখল বাংলাদেশ। আশার আলো ফুটতে যাচ্ছে দেশের ২০ কোটি মানুষের প্রাণে।
গতকাল মঙ্গলবার বেলা ৩ টার পর পাবনার ঈশ্বরদীতে এ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে (ইউনিট-১) ফুয়েল লোডিং শুরু হয়। এর মাধ্যমেই বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পরমাণু শক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিচালন পর্বে প্রবেশ করল। প্রকল্পের ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস জানান, রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় এবং দেশীয় দক্ষ প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে বিকাল থেকে রিঅ্যাক্টর কোরে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন করা শুরু হয়েছে।
# জ্বালানি লোডিং উদ্বোধন
পাবনার ঈশ্বরদীতে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং শুরু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ৩টার দিকে পদ্মার তীর ঘেঁষা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এরপর নানা ধাপ পেরিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার পর আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে পারে রূপপুরের প্রথম ইউনিট। ফকির মাহবুব আনাম বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে। কারণ নিরাপত্তাই বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকার। এই পারমাণবিক কেন্দ্র ঢাকা ও মস্কোর মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেবে। প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, আজকের দিনটি বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে বাংলাদেশ আরও একধাপ এগিয়ে গেল।
রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বাংলাদেশকে যেভাবে সহযোগিতা করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও সেভাবে পাশে থাকবে। বাংলাদেশের মানুষকে আশ্বস্ত করতে চাই নিরাপত্তা নিয়ে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সর্বোচ্চ মানদণ্ড বজায় রাখা হয়েছে। নিরাপদ পারমাণবিক কেন্দ্র থেকেই সরবরাহ করা হবে বিদ্যুৎ। এমনকি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ ভবিষ্যতের প্রয়োজনে সহযোগিতা থাকবে রোসাটমের।
প্রকল্পের ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস জানান, রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় এবং দেশীয় দক্ষ প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে বিকাল থেকে রিঅ্যাক্টর কোরে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন করা শুরু হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন জানান, প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শেষ হতে ৪৫ দিন সময় লাগবে। জুলাইয়ের শেষে অথবা আগস্টের শুরুর দিকেই প্রথম ইউনিট থেকে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। সেই সঙ্গে চলতি বছরের শেষ নাগাদ বা আগামী বছরের শুরুতে প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে ১২০০ মেগাওয়াট নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ মিলবে।
পদ্মা নদীর তীরে ঈশ্বরদীতে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পে রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়েছে। এখানে দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর ব্যবহার করা হয়েছে। দুটি ইউনিট পূর্ণ উৎপাদনে গেলে এখান থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, যা দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশেরও বেশি পূরণ করবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সুযোগ এনে দিয়েছে রূপপুর। এই কেন্দ্র বাংলাদেশের বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে আরও এগিয়ে নেবে।
অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি। এই জ্বালানি লোডিংয়ের মধ্য দিয়েই মূলত এই কেন্দ্র থেকে ধাপে ধাপে শুরু হবে বহুল কাঙ্ক্ষিত সেই বিদ্যুৎ উৎপাদন।
# পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ
রিঅ্যাক্টর বা পরমাণু চুল্লিতে ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরুর মাধ্যমে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। জ্বালানি লোডিংসহ পরীক্ষামূলক ধাপগুলো শেষে আগামী আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে রূপপুর থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সব কিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বর কিংবা আগামী বছরের জানুয়ারিতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রথম ইউনিট পূর্ণভাবে উৎপাদনে যেতে পারে।
গতকাল মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকেলে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে শুরু হয়েছে ‘ফুয়েল লোডিং’। ঐতিহাসিক এই অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্যদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোসাটমের মহাপরিচালক এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতিনিধিরা। প্রথম ইউনিটে 'ফুয়েল লোডিং' উপলক্ষে প্রকল্প এলাকায় ছিল বিশেষ আয়োজন। সরকারের পক্ষে এতে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, রুশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ। এছাড়া আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা আইএইএ-এর প্রধান রাফায়েল ম্যারিয়ানো গ্রসি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
# ২০২৩ সালে আসে পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান
২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আকাশপথে রাশিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছায় পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান। এরপর আসে আরও কয়েকটি চালান। বিশেষ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সড়কপথে অক্টোবরে রূপপুরে নিয়ে যাওয়া হয় জ্বালানি। এরপর এটি মজুত করে রাখা হয়েছে রূপপুরে। অতিরিক্ত একটিসহ মোট ১৬৪টি বান্ডিল দেশে আনা হয়। রূপপুরে ব্যবহৃত প্রতিটি বান্ডিলে ৩১২টি জ্বালানি রড আছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি মূলত ইউরেনিয়াম থেকে তৈরি হয়। প্রথমে ইউরেনিয়াম অক্সাইড দিয়ে ছোট ট্যাবলেটের মতো জ্বালানি দানা (প্যালেট) বানানো হয়। এগুলোর ব্যাস সাধারণত ৮ থেকে ১৫ মিলিমিটার এবং দৈর্ঘ্য ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার। এমন অনেক জ্বালানি দানা প্রায় চার মিটার দীর্ঘ ধাতব নলের ভেতরে সাজিয়ে তৈরি হয় জ্বালানি রড। আবার নির্দিষ্ট কাঠামোতে অনেকগুলো রড একসঙ্গে যুক্ত করলে তৈরি হয় জ্বালানি বান্ডিল বা ফুয়েল অ্যাসেম্বলি।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই জ্বালানি বান্ডিল চুল্লির কেন্দ্রে বসানো হবে। রূপপুরের প্রথম ইউনিটে একসঙ্গে ১৬৩টি বান্ডিল ব্যবহার করা হবে। একবার জ্বালানি বসালে প্রায় ১৮ মাস বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। ব্যবহৃত জ্বালানিতেও তেজস্ক্রিয় পদার্থ থাকে। তাই তা বিশেষ নিরাপত্তায় রাশিয়ায় নেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নজরদারিতে প্রতিটি জ্বালানি বান্ডিলের হিসাব থাকবে।
# ১৫-২১ আগস্টের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, ১৫ থেকে ২১ আগস্টের মধ্যে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে। এরপর দুই মাসের মধ্যে এটি ৫০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা যাবে। আর ডিসেম্বরের শেষ বা ২০২৭ সালের জানুয়ারির শুরুতে ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, প্রথম ইউনিট চালুর পর দ্রুতই দ্বিতীয় ইউনিটও উৎপাদন পর্যায়ে আনার কাজ এগোবে। সব মিলিয়ে ২০২৭ সালের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, দুই ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে রূপপুর থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাবে, যা ২ কোটি মানুষের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
# পারমাণবিক জ্বালানি কী
পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ভিন্ন। এটি ইউরেনিয়াম ২৩৫- এর সমৃদ্ধ ধাতব পদার্থ। খনির আকরিক থেকে নানা প্রক্রিয়া করে তৈরি করা হয় ইউরেনিয়ামের এ জ্বালানি। পারমাণবিক জ্বালানি শক্তির মূল উপাদান হলো এ ক্ষুদ্র আকৃতির ইউরেনিয়াম পেলেট। এ রকম কয়েকশো পেলেট একটি নিশ্ছিদ্র ধাতব টিউবে ঢোকানো থাকে। এ ধাতব টিউবই ফুয়েল রড হিসেবে পরিচিত। অনেকগুলো ফুয়েল রড একসঙ্গে যুক্ত করে তৈরি হয় ফুয়েল অ্যাসেম্বলি। একটি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি লম্বায় সাড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৪ মিটার পর্যন্ত হয়। আর এ রকম ফুয়েল অ্যাসেম্বলি জ্বালানি হিসেবে রিঅ্যাক্টরে লোড করা হয়।
# যেভাবে কাজ করে
পারমাণবিক চুল্লিতে ফিশান বিক্রিয়ার মাধ্যমে পোড়ানো হয় নিউক্লিয়ার ফুয়েল। সেখানে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজন ঘটে। এর ফলে প্রচুর তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। এ তাপশক্তিকে কাজে লাগিয়ে পানিকে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদন করে। পারমাণবিক চুল্লিতে এটি এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত চেইন রিয়্যাকশন। ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি থেকে আবার ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি পাওয়া যায় বিধায় অনেকে এ জ্বালানিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবেও অভিহিত করেন। তেল, গ্যাস বা কয়লার মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি থেকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমনের কোনো সুযোগ নেই। এটিকে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী ও নির্মল বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি বলা হয়। তবে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটলে এর থেকে যে ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয়তা ছড়াতে পারে, সেটি প্রাণ-প্রকৃতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়। কারণ এই তেজস্ক্রিয়তা বছরের পর বছর ধরে ক্রিয়াশীল থাকে।
# জ্বালানির ক্ষমতা কেমন
নিউক্লিয়ার ফুয়েলের শক্তি অন্যান্য জ্বালানির তুলনায় অনেক গুণ বেশি। এ ক্ষুদ্র আকারের মাত্র সাড়ে ৪ গ্রাম ওজনের একটি ইউরেনিয়াম পেলেট যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, এর জন্য কয়লা লাগবে ৪০০ কেজি, গ্যাস লাগবে ৩৬০ ঘনমিটার। আর ডিজেলের মতো জ্বালানি পোড়াতে হবে সাড়ে ৩০০ কেজি। অর্থাৎ এক কেজি নিউক্লিয়ার জ্বালানির সক্ষমতা ৬০ টন জ্বালানি তেল আর ১০০ টন কয়লার সমান। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ভয় কাজ করে। তাই নিরাপত্তাই হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সবচেয়ে আলোচিত এবং উদ্বেগের বিষয়। এ কারণে পারমাণবিক জ্বালানি এমনভাবে তৈরি, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং ব্যবহার হয়, যাতে এটি থেকে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে না পড়ে। এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য স্থাপিত নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টরের বহু স্তর নিরাপত্তার প্রথম ধাপটি হলো ফুয়েল পেলেট। এই ফুয়েল পেলেট সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয়।ফলে তেজস্ক্রিয়তা পেলেটের ভেতরেই আবদ্ধ থাকে। এছাড়া দ্বিতীয় ধাপে এই পেলেট জিরকোনিয়াম অ্যালয়ের তৈরি আস্তরণ দ্বারা মোড়ানো থাকে। কোনো কারণে তেজস্ক্রিয়তা ফুয়েল পেলেট থেকে বের হলেও আস্তরণ ভেদ করতে পারে না।
# রূপপুরে যেভাবে ব্যবহার হবে
রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি চুল্লিতে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি লোড করা হবে। দুটি চুল্লিতে ৩২৬টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলিতে থাকবে ৮০ টন ইউরেনিয়াম জ্বালানি। চুক্তির আওতার মধ্যে প্রথম তিন বছরের জ্বালানি রাশিয়া থেকে আসবে। এরপর প্রতি ১৮ মাস পর পর এক তৃতীয়াংশ ফুয়েল অ্যাসেম্বলি বদলানো হবে। এই জ্বালানির দাম নিয়ে বাংলাদেশ এবং রাশিয়ার পক্ষ থেকে কোনো হিসাব দেয়া হয়নি। তবে গবেষকদের হিসাবে, বর্তমানে একেকটি ফুয়েল অ্যাসেম্বলির দাম দেড় থেকে দুই মিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবে বাজারদর অনুযায়ী, বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর তিন বছর পর থেকে প্রতি দেড় বছরে নিউক্লিয়ার ফুয়েলের জন্য খরচ হতে পারে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা।
# বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যেভাবে
পারমাণবিক বিদু্ৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত নিউক্লিয়ার ফুয়েল থেকে তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। তাই বিশেষ পদ্ধতিতে এটি পরিবেশ ও মানুষের নাগালের বাইরে রাখতে হয়। আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রতিটি পারমাণবিক চুল্লিতে ব্যবহৃত ফুয়েল রডগুলো নিরাপদে সংরক্ষণ করার নিশ্চয়তা দিতে হয়। ইউরেনিয়াম জ্বালানির তেজস্ক্রিয়তা যাতে কোনো অবস্থাতেই পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য শুরু থেকেই নিরাপত্তার দিকটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার কথা দাবি করা হচ্ছে।উচ্চমানের নিউক্লিয়ার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ চুক্তি করেছে। চুক্তি মোতাবেক উচ্চমানের নিউক্লিয়ার জ্বালানি বর্জ্য অর্থাৎ স্পেন্ট ফুয়েল বাংলাদেশ থেকে রাশিয়া ফিরিয়ে নেবে। রুশ কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তার স্বার্থে স্পেন্ট ফুয়েল রি-প্রসেস করার পর চূড়ান্ত পর্যায়ে উচ্চমানের তেজস্ক্রিয় বর্জ্য জনমানবশূন্য এলাকায় মাটির ৪০০ মিটার গভীরে পুতে ফেলা হয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









