বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এক বক্তব্যে তুষের আগুনে পুড়ছে জামায়াতের ভেতর-বাহির। ‘জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূলে কাজ করতে হবে’ দলের নেতা-কর্মীদের মির্জা ফখরুলের এমন নির্দেশনায় যারপরনাই আঘাত পেয়েছেন জামায়াতের নেতা-কর্মীরা। কারণ মাঠে-ঘাটে বিরোধীদের ঘায়েলের রাজনৈতিক বক্তব্য দিলেও ‘র্নিমূলের’ মতো কঠিন শব্দের ব্যবহারকে অনেকটাই ‘ফ্যাসিবাদী’ চিন্তা বলে এ নিয়ে সর্বত্রই আলোচনা সমালোচনা এখন তুঙ্গে, বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে। সর্বশেষ গতকাল সংসদে সরকার দলীয় এমপি ফজলুর রহমান জামায়াতকে স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার ইস্যুতে দেওয়া বক্তব্যে যেন সে আগুনে আরেকবার ঘি ঢালে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জামায়াতের দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপির দ্বিতীয় শীর্ষ নেতার এমন বক্তব্যকে খাটো করে দেখার সুযোগ নাই। কারণ তিনি কন্সাসলিই (সতর্কভাবেই) বলেছেন। কারণ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলের শব্দের প্রয়োগ ও ব্যবহার জ্ঞানে পরিমিতবোধ থাকে। তাই তিনি জেনেশুনেই ‘নির্মূলের’ মতো এমন কঠিন শব্দ বলেছেন। সেজন্য বিষয়টি এখন অনেকটাই টক অব দ্য পলিটিক্স।
জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৫ বার নিষিদ্ধ হয়েছিল ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী যা আর কোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে হয়নি। এতবার নিষিদ্ধের খড়গ নিয়েও ফের ঘুরে দাঁড়ানোর রেকর্ডও একমাত্র দলটিরই রয়েছে। মজার বিষয় হচ্ছে যতবার ই নিষিদ্ধ হয়েছে পরের বার ফিরে এসেছে আরও শক্ত ভাবে। কিন্তু গত শনিবার নয়াপল্টনের দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতকে নির্মূলের জন্য কাজ করতে হবে মর্মে নেতা-কর্মীদের যে নির্দেশনা দিয়েছেন সেটি নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। কারণ, ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিবের এমন আলোচনায় জামায়াতের অতীতে নিষিদ্ধের বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। যদিও জামায়ত বর্তমান সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করছে।
এ ব্যাপারে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যে পতিত স্বৈরাচারকেও ছাড়িয়ে গেছে। রাজনীতিতে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও বিরোধীদের মোকাবিলা খুবই পুরনো পদ্ধতি। কিন্তু নির্মূল খুবই জঘন্য চিন্তা। বিএনপি মহাসচিবের নিশ্চয়ই জামায়াতের সর্ম্পকে অতীত ইতিহাস মনে থাকলে এমন ফ্যাসিবাদী চিন্তা ও কথা বলতেন না।
নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ কংগ্রেসের মহাসচিব ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ইয়ারুল ইসলাম বলেন, প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়তো টুইস্ট করেছে। কিন্তু পরে দেখলাম, মির্জা ফখরুল আসলেই জামায়াতকে লক্ষ্য করে এ কথা বলেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, সজ্জন ভদ্রলোক গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বলে পরিচিতি মির্জা ফখরুলের মতো কীভাবে এমন কথা বললেন, এটা ভাবনার বাইরে। যদি স্লিপ অব টাং হয়ে থাকে, তাহলে তো কিছু বলার নেই। কিন্তু ১২ ঘণ্টার পরও যেহেতু বক্তব্যের বিষয়ে তিনি ব্যাখ্যা দেননি, তাতে ধরে নেওয়া যায় জেনে-বুঝেই বলেছেন।’ তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূলের চিন্তা থাকলে, বলতেই হবে তা ক্ষমতার দম্ভের প্রকাশ। অথবা যে মির্জা ফখরুলকে আমরা চিনতাম, তিনি আসলে তেমন নন। ভুল চিনেছিলাম।
তবে জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি মহাসচিবের এমন বক্তব্যকে সিরিয়াসলি দেখলেও জামায়াতকেও হালকাভাবে দেখার সুযোগ নাই বলে মনে করেন রাজনীতিবিদরা। তারা মনে করেন, দেশে যতগুলো রাজনৈতিক দল আছে সবগুলোর মাঝেই জামায়াতের একটা প্রভাব কাজ করেছে সবসময়। নিষিদ্ধ হতে হতে দলটি এখন বাংলাদেশের শক্তিশালী বিরোধী দল। শুধু বিরোধী দল নয়, ২০০১ সালের সরকারের পরে সবচেয়ে বেশি আসন নিয়ে বিরোধী দলের চেয়ারে তারা। বিশেষ করে সংসদীয় গণতন্ত্র সূচনার পর ৯৯১ সালের ভোটে জামায়াতের সমর্থনে বেগম খালেদা জিয়া যখন প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন, একই সংসদে জামায়াতের সমর্থনে শেখ হাসিনা প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা হন।
সূত্র জানায়, ১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল প্রথম সংসদ অধিবেশনে ওয়াক আউট করে জামায়াত। যদিও সেই ওয়াক আউট ছিল শেখ হাসিনাকে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা দেয়ার দাবিতে। এরপর সংসদীয় গণতন্ত্রের সরকারের প্রথম সংসদে জল অনেক গড়িয়েছে। পরে কেয়ারটেকার সরকারের রূপরেখা দিয়ে আওয়ামী লীগসহ আন্দোলন করে বিএনপি সরকার কে চাপে ফেলে, সংসদ ভেঙে, খণ্ডকালীন সরকার গঠন করে আবার নির্বাচন হয়। কারণ, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রশাসনিক ক্যু হয়। সবদিক থেকে চাপে পড়ে যায় বিএনপি। বাধ্য হয়ে সংসদ ভেঙে নির্বাচন আয়োজন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার যুক্ত করতে হয় সংবিধানে। ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এরপর চলতে থাকে জামায়াত-বিএনপি নিধন। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯৯ সালে সাংবাদিক আনোয়ার জাহিদের মধ্যস্থতায় আবারও বিএনপি-জামায়াত এক হয়, সাথে যুক্ত হয় মুফতি আমিনীর ইসলামী ঐক্যজোট। যার মহাসচিব ছিল মুফতি ইজহার।
এরপর ২০০১ সালের ১ অক্টোবরে নির্বাচনে সরকার গঠন করে বিএনপি-জামায়াত। জামায়াতের তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ মন্ত্রী হন। ২০০২ সালে দেশজুড়ে অপারেশন ক্লিনহার্ট, দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা, শায়খ রহমান ও বাংলা ভাইয়ের মতো জঙ্গিদের উথ্যান ইস্যুতে জোট সরকার হঠাতে নানা আন্দোলন শুরু করে আওয়ামী লীগ। তখন বিএনপির মহাসচিব মান্নান ভুঁইয়ার ট্রাম্পের পর আবদুল জলিলের ওভার ট্রাম্প আন্দোলনে কত কি ঘটে।
এর মধ্যে সবচেয়ে ঘটনাবহুল ছিল ২০০৬ সাল। এ বছর ২৮ মার্চ পল্টন ময়দানে শিবিরের জাতীয় ছাত্র সমাবেশ হয়, যা দেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো ছাত্র সংগঠনের জাতীয় সমাবেশ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, ওই সময়কার স্বাস্থ্য মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, সাদেক হোসেন খোকাসহ বিএনপি হেভিওয়েট নেতারা সেখানে অতিথি ছিলেন।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম হাসান এবং কমিশনার এমএ আজীজ বিরোধী আন্দোলন হয়। এই আন্দোলনের মাঝেই বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচে কলঙ্কজনক দিনের আবির্ভাব হয় ২৮ অক্টোবর ২০০৬ সালে। আওয়ামী লীগের দুর্বার আন্দোলনে কেএম হাসান এবং এমএ আজিজ পদত্যাগে বাধ্য হয়। এরই প্রেক্ষাপটে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে তত্বাবধায়ক সরকার গঠন হয়। নাটকীয়ভাবে সে সরকার থেকে পদত্যাগ করে আকবর আলীসহ ৪ জন। এরপর আসে ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিনের সরকার। সরকার গঠন করেই তারা জরুরি অবস্থা জারি করে, ঘরোয়া রাজনীতি ছাড়া সবকিছুর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
ঘটনার পরম্পরায় গ্রেফতার করা হয় সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীকে। একমাত্র শেখ হাসিনা ছাড়া বাকি নেতারা ওই সময় চরম নির্যাতনের শিকার হন। আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জীবনে নেমে আসে দুর্বিষহ নির্যাতন। রিমান্ডের নামে চালানো হয় ইতিহাসের ভয়াবহ অত্যাচার। শেষে বাধ্য হন দেশ ছাড়তে। এরই মাঝে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের ভোটে আবারও সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট যা পরে মহাজোট হয়। সরকার গঠনের পরপরই ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআরএ হয় নৃশংসতম হত্যাকান্ড, যা পিলখানা ট্র্যাজেডি নামে পরিচিত। জাতি হারায় ৫৭ চৌকস সেনা অফিসার।
এরপর ২০১০ সালে রেজাউল করিম চাঁদপুরির ধর্ম অবমাননার মামলায় গ্রেফতার হয় জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামি, সেক্রেটারি আলী আহসান মুজাহিদ, নায়েবে আমির দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী, সহকারী সেক্রেটারি কামারুজ্জামান, কাদের মোল্লা, সাবেক আমির গোলাম আযম। পরে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী, জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামি, সেক্রেটারি আলী আহসান মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি কামারুজ্জামান, কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়। কারাগারে মারা যান দলটির সাবেক আমির গোলাম আযম। আর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নায়েবে আমির দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী।
এ নিয়ে বিএনপি-জামায়াত যুগপৎ আন্দোলন করেও দলীয় নেতাদের ফাঁসি ও জেল-জুলুম থেকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। হঠানো যায়নি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে। গত ১৭ বছর টানা আন্দোলন করেও কাজের কাজ কিছু করতে পারেনি বিএনপি-জামায়াত জোট। তবে ২০২৪ সালে কোটা সংস্কার ইস্যুতে সৃষ্ট ছাত্র আন্দোলন এক পর্যায়ে গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এক পর্যায়ে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। তিনদিন পর ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূছের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। দীর্ঘ আঠারো মাসের নানা সংস্কার শেষে চলতি বছর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্বাচন। এতে বিএনপি ২১১ আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। বিপরীতে বিপ্লবোত্তর গঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপিকে নিয়ে জামায়াতের নেতৃত্বে এগার দলীয় জোট ৭৪ আসন পেয়ে সংসদের বিরোধী প্রধান বিরোধী দল হিসেবে যাত্রা শুরু করে, যা তাদের ইতিহাসে প্রথম এত বড় অর্জন।
এমতাবস্থায় শনিবার জামায়াতকে নির্মূল করতে হবে বলে বিএনপি মহাসচিবের দেওয়া এক বক্তব্যে এখন সর্বত্র আলোচনা তুঙ্গে। বিএনপি মহাসচিবের এমন বক্তব্যের প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামীকে পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করার বক্তব্যকে হুমকি, অগণতান্ত্রিক ও অনভিপ্রেত উল্লেখ করে দলটির পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, তার (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর) এ বক্তব্যেই প্রমাণিত হচ্ছে, তারা জাতীয় সংসদের বিরোধীদলকে পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করে এ দেশে আবার একদলীয় কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েমের ষড়যন্ত্র করছেন।
জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, যেই মুহূর্তে দেশের ১৮ কোটি মানুষ এক রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের মাধ্যমে একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসকদের দেশ থেকে বিতাড়িত করে দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে জাতীয় সংসদের বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামীকে পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে নির্মূলের হুমকি দিয়ে বিএনপি মহাসচিব একদলীয় আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সুরে কথা বলেছেন। তার এ বক্তব্যেই প্রমাণিত হচ্ছে, তারা জাতীয় সংসদের বিরোধী দলকে পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করে এ দেশে আবার একদলীয় কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েমের ষড়যন্ত্র করছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









