প্রকৃতির অকাল খেয়ালে ঋতুচক্রের হিসাব আজ ওলটপালট। চৈত্রের খরতাপ পেরিয়ে বৈশাখের শুরুতেই এক পশলা বৃষ্টির জন্য হাহাকার থাকে জনজীবনে। যখন মাঠভরা সোনালি ধান ঘরে তোলার স্বপ্নে বিভোর হওয়ার কথা কৃষকের, ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে নামছে অকাল বৃষ্টি। বৈশাখের এই অসময়ের বর্ষণ আশীর্বাদ হয়ে নয়, বরং ‘আকালের পদধ্বনি’হয়ে হানা দিয়েছে বাংলার জনপদে। দেশের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত জেলাগুলোতে এখন কেবলই হাহাকার।
অসময়ের এই অতিবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টিতে মাঠের সোনালি ফসল নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন লাখ লাখ কৃষক। মাঠের পর মাঠ ধান তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা মরিয়া হয়ে আধাপাকা ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু শ্রমিক সংকট এবং বৈরী আবহাওয়ায় সেই ফসল শুকানোও সম্ভব হচ্ছে না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে পাকা ধান পানিতে ডুবে যেতে দেখে জমির আইলে লুটিয়ে পড়ে আহাদ মিয়া (৫৫) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শনিবার সকালে উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের রামপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অকালের এই বৃষ্টি কেবল কৃষকের ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি।
এবারের বোরো মৌসুম শুরু হয়েছিল খরা দিয়ে। আর শেষ হচ্ছে টানা বৃষ্টিতে। সেই সঙ্গে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যোগ হয়েছে পাহাড়ি ঢল। অতিবৃষ্টি ও ঢলে দেশের ধানের অন্যতম বড় উৎস ওই অঞ্চলের হাওর এখন পানির নিচে। তাই শেষ সময়ে এসে পাকা ধান আর ঘরে তুলতে পারছেন না কৃষক। এতে কৃষকের গোলা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় গোলার ধানে টান পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের প্রাথমিক তথ্যমতে, এবারের অকাল বৃষ্টিতে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ভয়াবহ। দেশের প্রধান খাদ্যশস্য বোরো ধানের বড় একটি অংশ এখন পানির নিচে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের কৃষকরা আধাপাকা ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন, যার ফলন ও মান দুটোই অত্যন্ত নিম্নমুখী। এছাড়াও টমেটো, শসা, ঝিঙা ও খিরাসহ গ্রীষ্মকালীন সবজির মাচাগুলো বৃষ্টির পানিতে পচে নষ্ট হচ্ছে। এতে করে বাজারে সবজির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
শিলাবৃষ্টির কারণে দেশের আম ও লিচু বেল্টে ব্যাপক ফলন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ঝরে পড়েছে কচি গুটি, যা কৃষকের সারা বছরের আয়ের স্বপ্নে আঘাত হেনেছে। মাঠের পর মাঠ ধান এখন পানির নিচে পচছে। কৃষক জলমগ্ন জমিতে নেমে বুক সমান পানিতে ডুব দিয়ে আধাপাকা ধান কাটার চেষ্টা করছেন। নেত্রকোণার এক কৃষক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ধারদেনা করে চাষ করেছিলাম। আশা ছিল ধান বেচে দেনা শোধ করব। কিন্তু এই অকাল বৃষ্টি তো আমাদের পথে বসিয়ে দিল। ঘরে চাল নেই, মাঠে ধান নেই—সামনে যে আকাল (দুর্ভিক্ষ) আসছে, তা পরিষ্কার বুঝতে পারছি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অকালের এই বৃষ্টি কেবল কৃষকের ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন কম হলে চালের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বাজারে সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিলে নিম্নবিত্ত মানুষের পাতে দুবেলা অন্ন জোটানো কঠিন হয়ে পড়বে। ধান তলিয়ে যাওয়ায় খড়ের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যা প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
প্রকৃতি যখন বিরূপ হয়, তখন সাধারণ মানুষের লড়াইটা হয়ে ওঠে অসম। অকালের এই বর্ষণ যেন সত্যি কোনো বড় ‘আকাল’এ রূপ না নেয়, সেজন্য এখনই প্রয়োজন পরিকল্পিত কৃষি ব্যবস্থাপনা ও সরকারি তদারকি। কৃষকের মুখের হাসি না বাঁচলে, দেশের সমৃদ্ধিও যে ফিকে হয়ে যাবে—এটাই এখন রূঢ় বাস্তবতা। প্রকৃতির এই রুদ্রমূর্তিতে কৃষকের স্বপ্ন এখন কাদামাটির নিচে। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে পুনর্বাসন ও আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা না হলে, সামনে বড় ধরনের খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অকালের এই বর্ষণ যেন সত্যিই কোনো ‘আকাল’বা দুর্ভিক্ষের বার্তা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রার্থনা। কৃষি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই অকাল বর্ষণের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে। ধানের ফলন কমলে চালের বাজারে অস্থিরতা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
হাওর এলাকার বড় অংশ পড়েছে সুনামগঞ্জ জেলায়। সেখানে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জলাবদ্ধতায় রূপ নেয় হাওর। এতে অন্তত ২০ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে বলে দাবি কৃষকদের। তবে কৃষি অধিদপ্তর বলছে, জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান। কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার হেক্টর জমির ধান। সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১২ উপজেলার ১৩৭টি হাওরে এ বছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে।
হাওরবেষ্টিত আরেক জেলা কিশোরগঞ্জ। এই জেলার কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৮১ হেক্টর। হাওরাঞ্চলের আবাদের ৫১ শতাংশ অর্থাৎ ৫২ হাজার ৮১ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। তবে কৃষকদের দাবি, এটি ৪৫ শতাংশের বেশি হবে না। সে হিসাবে এখনো প্রায় ৬৫ শতাংশ ধান মাঠেই রয়ে গেছে।
নেত্রকোনা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ওই জেলায় ২২১৫ হেক্টর জমির ধান ঝুঁকিতে রয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এর পরিমাণ আরও বাড়বে। হাওরাঞ্চলে ৬৫ শতাংশ ধান ইতিমধ্যে কাটা শেষ হয়েছে বলে তাদের দাবি। আর হবিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে হবিগঞ্জে হাওর ও নন-হাওর মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে অর্ধেকের কিছু বেশি এবং নন-হাওর এলাকায় মাত্র ২০ ভাগ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। জেলার চারটি উপজেলার প্রায় ২৭১০ হেক্টর জমির ধান ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া মৌলভীবাজার কৃষি বিভাগ বলছে, জেলার হাওর এলাকায় ৮৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। নন-হাওর এলাকায় ১৭ শতাংশ।
প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই ধানখেতে চলে যেতেন স্বপন কুমার দাস। সোনালি রোদ পিঠ ছুঁয়ে দিত। কাদাভর্তি দু’পায়ে দাঁড়িয়ে দেখতেন সোনালি ধানে ভরে উঠেছে খেত। কিন্তু সে স্বপ্ন যে এমন দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে তা ভাবতে পারেননি হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জের স্বপন কুমার দাস। টানা কয়েকদিনের বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে ভেসে গেছে স্বপনের ১৭ বিঘা জমির ধান। স্বপন বলেন, প্রতিবেশী ও মহাজনের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা ধার করেছিলাম। লাজ-লজ্জা ভুলে স্বজনদের কাছেও হাত পেতেছিলাম। আশা ছিল ধান বিক্রি করে শোধ করে দেবো। ফলনও ভাল হয়েছিল। কিন্তু এখন তো সব শেষ। স্বপন জানান, চার-পাঁচ দিন বৃষ্টি ঝরেছে। এরপর থেকে একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৃষ্টি চলেছে। টানা বৃষ্টিতে হাওরের পানি দ্রুত বাড়তে লাগল। গত মঙ্গলবার ভোরবেলা তিনি গিয়ে দেখেন পুরো ১৭ বিঘা জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
পরিশ্রমের ফসলের এমন অবস্থা দেখে স্বপন কাঁদতেও ভুলে গেছেন। বুক সমান পানির মধ্যে নেমে দুহাতে ধানের গোছা তুলে ভাঙা গলায় স্বপন বললেন, ‘আমার যা ছিল সব শেষ হয়ে গেছে। হাওরের এই করুণ পরিস্থিতি কেবল স্বপনের একার নয়। আজমিরীগঞ্জের বদলপুর ইউনিয়নের উত্তরহাটী গ্রামের বাতাসে এখন শুধুই পচা ধানের গন্ধ। কয়েকদিন আগেও হাওরের যে মাঠজুড়ে ছিল ফসলের হাতছানি—সেখানে এখন থৈ থৈ জল। কোথাও কোথাও ডুবে যাওয়া ধানগাছের ডগা উঁকি দিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।
উত্তরহাটী গ্রাম থেকে সামান্য দূরেই সদর ইউনিয়নের হাওর তীরবর্তী বিরাট গ্রাম। সেখানেই কথা হয় আরেক কৃষক গিরিন্দ্র দাসের সঙ্গে। তার দুচোখে এখন কেবলই শূন্যতা। নিজের জমির পাশাপাশি মহাজনের কাছ থেকে জমি ইজারা নিয়ে ২৩ বিঘার জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন তিনি। গিরিন্দ্র বলেন, কত স্বপ্ন ছিল, মনে মনে কত হিসেব কষেছিলাম।
মাত্র তিন বিঘার ধান কাটতে পেরেছি। বাকি জমির সব ফসল এখন পানির তলায়। গিরিন্দ্র দাসের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখনও বৃষ্টি থামেনি। গিরিন্দ্র বলেন, এমন এক আবহাওয়া! এই আবহাওয়ায় ধান কাটার শ্রমিকও পাচ্ছি না। হাওর জুড়ে এখন এক ভিন্ন দৃশ্যের দেখা মিলছে। বুকসমান পানিতে নেমে কৃষকেরা হাত দিয়ে ধান টেনে টেনে তুলছেন। যেন তারা শেষবারের মতো কিছুটা হলেও ধান ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কালো হয়ে যাওয়া ধান নৌকায় তুলছেন। কদিন ধরেই রোদের কোন দেখা নেই। তাতেও কৃষকের দুশ্চিন্তা বেড়েই চলেছে।
আজমিরীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন জানান, চলতি বোরো মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন হাওরে মোট ১৪ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। এ পর্যন্ত ৫ হাজার ১৫৫ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। উপজেলার বদলপুর, সদর, জলসুখা, শিবপাশা ও কাকাইলছেও ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রেজাউল করিম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এর মধ্যে শ্রমিক সরবরাহে জনপ্রতিনিধিসহ সবাইকে নিয়ে জরুরি সভা করা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড হবিগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সায়েদুর রহমান বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টায় মাঝারি থেকে হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। খোয়াই ও সুতাং নদীর পানি কমলেও আজমিরীগঞ্জ অংশে কুশিয়ারা নদীর পানি আরও বাড়তে পারে।
সুনামগঞ্জের হাওরে একের পর এক ভাঙছে ফসলরক্ষা বাঁধ। তাতে হাওরবাসীর সংকট আরও বেড়েছে। গতকাল শনিবার সকালে বাঁধ ভেঙে মধ্যনগরের বোয়ালা হাওরের ফসল ডুবছে। হাওরে ডুবে যাওয়া ধান কাটবেন, না কি বাঁধ রক্ষা করবেন—এই সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল শনিবার ভোর থেকে বৃষ্টিপাত হয়েছে। তাতে সোমেশ্বরী নদীর পানি বেড়ে মধ্যনগর জামে মসজিদের পাশের কালভার্টের সামনের পাউবো’র দেওয়া বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। সকালে ধান কাটতে গিয়ে এই পরিস্থিতি দেখে কান্নাকাটি শুরু করেন স্থানীয় কৃষকরা। আশপাশের কৃষক ও প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও ভাঙনের তীব্রতা ঠেকাতে পারেননি। স্থানীয় কৃষকরা বাঁধের এই ভাঙনের জন্য পাউবো ও তাদের নিয়োজিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) লোকজনকে দোষারোপ করছেন। পানির প্রবল বেগ দেখে আশা ছেড়ে দিয়েছেন শত শত কৃষক। উপস্থিত কৃষক ও কৃষাণিরা বলেন, বাঁধের কাজে অবহেলা ছিল। কালভার্টের মুখের এই বাঁধে আড়-প্যালাসেটিং কিছুই দেওয়া ছিল না। মধ্যনগর গ্রামের কৃষক মুরাদ মিয়া জানান, তার ১৭ কিয়ার জমি কাটার বাকি ছিল। শনিবার সকালে ধান কাটার জন্য শ্রমিক নিয়ে হাওরে গিয়েছিলেন। এ সময় বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় ফসল।
মধ্যনগর ইউনিয়ন কৃষি উপ-সহকারী কর্মকর্তা কবির হোসেন বলেন, হাওরে ২০ হেক্টরের মতো জমির ধান কাটা হয়নি। এগুলো ডুবে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, হাওরের ধান কাটা শেষ হয়ে গেছে। এমন সময় বাঁধও ভেঙেছে। এজন্য বাঁধ ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়নি।
বৃষ্টি ও উজানের ঢলে কিশোরগঞ্জে নতুন করে আরও ২ হাজার হেক্টর বোরো ধানের জমি তলিয়ে গেছে। এতে এ পর্যন্ত মোট ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে জেলার হাওরাঞ্চলে, বিশেষ করে ইটনা উপজেলার হাওরে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে। গতকাল শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
জানা গেছে, টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। ফলে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে চলে গেছে। এর মধ্যে শুধু ইটনা উপজেলাতেই প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ধান কাটতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষকরা। একই সঙ্গে অতিবৃষ্টির কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় সবজির ক্ষেতেও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শুক্রবার (১ মে) রোদ থাকলেও শনিবার সকাল থেকে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় নতুন করে আরও জমি তলিয়ে গেছে। জেলার নিকলী আবহাওয়া অফিস জানায়, ভোর ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৩৬ মিলিমিটার এবং দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত আরও ১৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ইটনা পয়েন্টে ধনু-বৌলাই নদীর পানি বেড়ে ৩.০৬ মিটারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় ৫ সেন্টিমিটার বেশি। চামড়াঘাটে মেঘনা নদীর পানি ২.৭৩ মিটার, বেড়েছে ১০ সেন্টিমিটার। অষ্টগ্রামে কালনী নদীর পানি ২.৪৫ মিটার, যা ১৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ভৈরব বাজার পয়েন্টে মেঘনা নদীর পানি কিছুটা কমে ১.৮০ মিটারে নেমেছে, যা গতকালের তুলনায় ৭ সেন্টিমিটার কম। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, এখনো সবকটি নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিভিন্ন পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১০৯ থেকে ৪০০ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। তবে বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে নদীর পানি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ জমির ধান তলিয়ে যাওয়ায় তারা চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। গতকাল রোদ থাকলেও আজ সারাদিনের বৃষ্টিতে খলায় রাখা ধান শুকাতে পারছেন না। এতে ধানে চারা গজানো ও পচন ধরার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এর আগেই দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, শনিবার বিকেল পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের তথ্যমতে ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি। তবে বৃষ্টিপাত না বাড়লে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা কিছুটা কমতে পারে। এর আগে শুক্রবার বাঁধ ভেঙে এই উপজেলার শালদিঘা হাওরে পানি ঢুকছিল। দিনভর চেষ্টার পর ভাঙনের অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ আটকানো সম্ভব হয়।
কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি শেষে দুই দিন স্বস্তি মিলেছিল নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে। হালকা রোদ উঠেছিল। গতকাল শনিবার ভোর থেকেই আবার আকাশ মেঘে ঢেকে যায়। দুপুরের পর নামে বৃষ্টি, সঙ্গে বজ্রপাত। উজান থেকে নামা পাহাড়ি ঢলের পানির সঙ্গে মিলে এই বৃষ্টি হাওরপারের কৃষকদের অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। জেলার খালিয়াজুরি, মোহনগঞ্জ, মদন, কলমাকান্দা, বারহাট্টা, আটপাড়া, কেন্দুয়াসহ বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় পাকা বোরো ধান এখন পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ধান কাটার কাজ চললেও বৃষ্টিতে পানি আরও বাড়ায় সেই কাজ থমকে গেছে।
খালিয়াজুরি উপজেলার হায়াতপুর গ্রামের কৃষক দুলাল চন্দ্র সরকার বলেন, হাতে কিছু টাকা আছিল আর ধারদেনা কইরা চার একর বোরো ধান লাগাইছিলাম। ধান পাকতে শুরু করছিল। এইবায় একটানা বৃষ্টি হইব, ভাবছিলাম না। বৃষ্টির পানির জন্য সব খেতে ধান তল হয়ে গেছে। দেড় হাজার টেকা রোজ দিয়াও কামলা পাইছি না। বউ–বাচ্চা লইয়া পানিত নাইম্মা মাত্র ৮০ শতাংশ খেতে ধান কাটছি। আর সব ধান পানির নিচে। কাটা ধানও শুকাইতে পারতাছি না। ভিজা ধানে অহন জালা (অঙ্কুর) বাইরসে। আবুদুব (সন্তান) লইয়া কীবার চলবাম, কিছুই বুঝতাছি না। অহন পথে বওন ছাড়া আর কিছু উপায় নাই।
মদন উপজেলার বাগজান গ্রামের কৃষক ফয়েজ আহমেদ বলেন, পানি কমার কোনো লক্ষণ নাই। যে খেতে ধানের আগা একটু ভাইসা আছে, তা কাডনের লাইগ্গা দেড় হাজার টেহা দিয়াও শ্রমিক পাওয়া যাইতাছে না। আর অত টেহা দিয়া কাটাইলেও কোনো লাভ হতো না। কাটলেও লস, না কাটলেও লস। চোক্ষের সামনে এই ক্ষতি আর সহ্য হয় না।
কলমাকান্দা উপজেলার বড়খাপন গ্রামের কৃষক রুবেল তালুকদার বলেন, ধান কাটতে গেলে একজন শ্রমিকের মজুরি দেড় হাজার টাকা দিতে হয়। এর সঙ্গে কাটা ধান শুকনা জায়গায় আনতে নৌকা ভাড়া দিতে হয়। তারপর বাড়িতে এনে মাড়াই করতে আরও টাকা খরচ পড়ে। সব মিলিয়ে লস ছাড়া কোনো লাভ নাই। গুড়াডোবা হাওরে আমার ৯ একর জমির ধান পানির নিচে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয় জানায়, জেলায় ১ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর খেতে বোরো আবাদ করা হয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে হাওরে ৪২ হাজার হেক্টর খেতে বোরো আবাদ হয়। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৪৬৬ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে স্থানীয় লোকজনের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এর দ্বিগুণ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম জানান, পানি আরও বাড়লে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নেত্রকোনার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, কংস নদের পানি জারিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ১ দশমিক ৩ মিটার ও উব্দাখালী নদীর কলমাকান্দা পয়েন্টে বিপৎসীমার ৭৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে এখনো কোনো ফসল রক্ষা বাঁধ ভাঙেনি। বৃষ্টির পানিতে ধানের ক্ষতি হচ্ছে। দ্রুত ধান কেটে ফেলাই এখন সবচেয়ে নিরাপদ।
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল হক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে বলেন, কৃষকের অনেক ক্ষতি হয়েছে। তাঁদের পাশে দাঁড়াতে সরকার সব ধরনের সহায়তা দেবে।
গাইবান্ধায় গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে বোরো ধানের নিচু জমিতে পানি জমেছে। গতকাল শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় গাইবান্ধায় ৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। বৃষ্টির সঙ্গে সম্প্রতি কালবৈশাখীর আঘতে জেলায় প্রায় ২১২ হেক্টর জমির ধানগাছ নুইয়ে পড়েছে। দুপুরে একাই নুইয়ে পড়া ধান কাটছিলেন পলাশবাড়ী উপজেলার কুমারগাড়ি গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম (৫০)। ওই কৃষক এ বছর তিন বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছেন। সম্প্রতি কালবৈশাখীর আঘাতে তাঁর ৮০ শতক জমির ধান পানিতে নুইয়ে পড়ে। একই ধান কাটা প্রসঙ্গে কৃষক আমিরুল ইসলাম বলেন, ঝরিতে (বৃষ্টি) জমিত পানি আটকি আচে।
মাঝেমদ্দে ঝড় হবার নাগচে। একনো ধান পুরাপুরি পাকে নাই। তার মদ্দে ঝড়োত ধানগাচ শুইয়ে গ্যাচে। গায়োত কামলা পাওয়া যাচ্চে না। পাওয়া গেলেও কামলা খরোচ বেশি পড়চে। গাছ বেশি দিন পানিত ডুবি থাকলে ধান নষ্ট হোবে। তাই কষ্ট করি নিজের ধান নিজে কাটপ্যার নাগচি। শুইয়ে পড়া ধান নিয়া হামরা চিন্তাত পড়চি। আমিরুলের মতো শনিবার অন্তত ২০ জন কৃষক নুইয়ে পড়া ধান কাটা নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানালেন। তবে নতুন করে ঝড়বৃষ্টি না হলে ধানের ক্ষতি হবে না বলে জানিয়েছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, জমি থেকে দ্রুত পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি বছর জেলার সাতটি উপজেলায় ১ লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। কয়েক দিনের বৃষ্টিতে অনেক জমিতে পানি জমেছে। ঝড়ে উঠতি বোরো ধান নুইয়ে পড়েছে। কৃষি বিভাগের সূত্র জানায়, বোরো ধান কাটা পুরোপুরি শুরু হয়নি। শনিবার পর্যন্ত শতকরা ২ ভাগ ধান কাটা হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









