নোয়াখালীতে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর, রংপুরে এক হাজার শয্যার নতুন হাসপাতাল, গাজীপুরে অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ ৪৯৮টি প্রস্তাব দিয়েছেন জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনাররা। আজ রোববার শুরু হতে যাওয়া চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এই সম্মেলন চলবে আগামী ৬ মে পর্যন্ত। এতে মোট ৩৪টি অধিবেশন হবে। সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়া এবার রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন ডিসিরা। গতবার তা হয়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর এটিই প্রথম ডিসি সম্মেলন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এ সম্মেলন উপলক্ষে বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিরা সারা দেশ থেকে ১ হাজার ৭২৯টি প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। তার মধ্যে আলোচনার জন্য ৪৯৮টি প্রস্তাব নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে আরও রয়েছে জাতীয় বাজেটের সব অর্থ ১৫ এপ্রিলের মধ্যে ছাড় করা, ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক আট লেনে উন্নীত করা, চা–বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন, জেলাভিত্তিক দরিদ্র পরিবারের সব প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষা অবৈতনিক করা, সব শিশুর শিখন নিশ্চিত করতে একীভূত শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়নব্যবস্থা চালু, কওমি মাদ্রাসা স্থাপনে নীতিমালা প্রণয়ন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় পাঠদান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ভাষায় শিক্ষক নিয়োগ করা ইত্যাদি।
এবারের ডিসি সম্মেলনে প্রধান প্রধান আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে- ভূমি ব্যবস্থাপন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যক্রম জোরদারকরণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসৃজন ও দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়ন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ই-গভর্ন্যান্স, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার কল্যাণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ রোধ, ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও সমন্বয়।
ডিসিদের উল্লেখযোগ্য কিছু প্রস্তাব
গাজীপুরের ডিসি প্রস্তাব করেছেন, গাজীপুর জেলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করে শিল্প কারখানাসমূহ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে স্থানান্তরকরণ। ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রসমূহ পুনর্নির্মাণ/মেরামতকরণ, জনবল ও পর্যাপ্ত ঔষধ সরবরাহকরণ। রংপুর বিভাগে ১,০০০ (এক হাজার) শয্যা বিশিষ্ট একটি সরকারি হাসপাতাল চালুর প্রস্তাব করছেন রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার। ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক প্রস্তাব করেছেন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ। হাসপাতাল ও ক্লিনিকের চিকিৎসা বর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্যের বিজ্ঞানসম্মত পরিশোধনাগার নির্মাণ। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র সমূহে মিডওয়াইফারি পদসৃজন ও পদায়ন। এছাড়াও দেশীয় বাইসাইকেল শিল্পের বিকাশে স্থানীয় শিল্পকে প্রণোদনা চান তিনি।
বাংলাদেশের সকল দরিদ্র প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর শিক্ষাকে সম্পূর্ণ অবৈতনিক ঘোষণা করা সংক্রান্ত প্রস্তাব দিয়েছেন বরিশাল জেলা প্রশাসক। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী শিক্ষক (আইসিটি), সহকারী শিক্ষক (হিন্দু ধর্ম), সহকারী শিক্ষক (গ্রন্থাগার বিজ্ঞান/গ্রন্থাগারিক) পদে শিক্ষক নিয়োগ চেয়েছেন ফরিদপুরের ডিসি। এছাড়াও সরকারি মাধ্যমে হজযাত্রীর সংখ্যা ২৫% এ উন্নীতকরণের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। স্থানীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতি রক্ষায় প্রতিটি জেলার শিল্পকলা একাডেমিতে কালচারাল আর্কাইভ স্থাপন। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারি ডোমেইন ব্যবহার করে ওয়েবসাইট তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন বরগুনার ডিসি। বিভাগীয় পর্যায়ে একটি করে আধুনিক সমন্বিত বিজ্ঞান গবেষণাগার চান তিনি।
চাঁদপুর ও নেত্রকোণার ডিসিরা প্রস্তাব দিয়েছেন কওমি মাদ্রাসা স্থাপনের নীতিমালা প্রণয়নপূর্বক মাদ্রাসাসমূহকে নীতিমালার আওতাভুক্ত করার। সিলেট বিভাগের সকল চা-বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন ও বিদ্যমান নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহ জাতীয়করণের প্রস্তাব দিয়েছেন সিলেট বিভাগীয় কমিশনার। সকল শিশুর শিখনের প্রতি লক্ষ্য রেখে একীভূত কারিকুলাম/শিক্ষাক্রম, সময়সূচি ও মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রণয়ন চান বাগেরহাটের ডিসি। দেওয়ানী আদালত ও ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে আপীল মামলা দাখিলে তামাদি মওকুফকরণের প্রস্তাব দিয়েছেন যশোরের ডিসি। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে জিপি, এডিশনাল জিপি, এজিপি নিয়োগ। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক আট লেনে উন্নীতকরণ চান ময়মনসিংহের ডিসি। মৌলভীবাজারের ডিসি প্রস্তাব করছেন পর্যটন শিল্পকে আরো আধুনিক ও যুগোপযোগী করার জন্য পর্যটন এলাকাগুলোতে সমন্বিত উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের।
নোয়াখালী জেলায় আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর স্থাপন চান সেখানকার ডিসি। সকল ধরনের অর্থ ছাড় ১৫ এপ্রিলের মধ্যে চান বগুড়া জেলা প্রশাসক। মাগুরার ডিসি প্রস্তাব দিয়েছেন রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যে নগদ অর্থ লেনদেনকারী ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে (যেমন: চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, আইনজীবী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিআরটিএ অফিস, পাসপোর্ট অফিস, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বাড়িভাড়া ইত্যাদি) ডিজিটাল লেনদেন (পজ মেশিন/ব্যাংকিং চ্যানেলে) এর আওতায় আনয়নে নির্দেশনা প্রদান/নীতিমালা প্রণয়ন। পরিবেশবান্ধব ব্রিকস তৈরিতে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান। এছাড়াও জেলা পর্যায়ে খাদ্যদ্রব্য পরীক্ষার জন্য সমন্বিত পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
কৃষিপ্রধান জেলাসমূহে স্থানীয় উদ্যোক্তা/খামারিদের জন্য স্বল্প সুদে বৃহৎ আকারে ঋণ সুবিধা চান ঠাকুরগাঁওয়ের ডিসি। মা ইলিশ রক্ষা অভিযানের সময় ভিজিএফ চাল প্রদানের পাশাপাশি জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাব পিরোজপুরের ডিসির। হাওড় অঞ্চলে স্থায়ী মৎস্য অভয়াশ্রম চান সুনামগঞ্জের ডিসি। রপ্তানিযোগ্য পণ্যের (সবজি, আম, পান ইত্যাদি) গুণগত মান পরীক্ষা করার জন্য অ্যাক্রিডিটেশন ল্যাব স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন রাজশাহীর ডিসি।
কক্সবাজার জেলায় লবণ প্রসেসিং প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন সেই জেলার ডিসি। সিলেট-ওসমানী বিমানবন্দর সড়কের লাক্কাতুরা হতে বিমানবন্দর পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ চান এই জেলার ডিসি। টিআর ও কাবিখা কর্মসূচির আওতায় খাদ্য সহায়তার পরিবর্তে নগদ অর্থ বরাদ্দ চান রাঙ্গামাটির ডিসি। এছাড়াও পার্বত্য অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও শতভাগ বিদ্যুতায়ন এবং দুর্গম এলাকার শিশুদের শিক্ষার অভিগম্যতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিদ্যালয়সমূহে হোস্টেল স্থাপন এবং হোস্টেলে খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
পার্বত্য এলাকায় ইটভাটা বন্ধ করতে ইটের বিকল্প হিসাবে ব্লক ব্যবহারের জন্য প্রকল্প প্রাক্কলন পরিবর্তন করার প্রস্তাব দিয়েছেন বান্দরবানের ডিসি। মডেল মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের চাকুরি স্থায়ীকরণ ও বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছেন গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসক। এছাড়াও ভরাট হয়ে যাওয়া খাসপুকুর খনন চান তিনি। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে ঢাকা থেকে ডিসেন্ট্রালাইসড করে জেলাভিত্তিক নিযুক্ত করার দাবি রাজবাড়ীর ডিসির। পর্যায়ক্রমে জেলা/উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় বিদেশি ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন চান পঞ্চগড়ের ডিসি। জেলা পর্যায়ে গুজব ও ফ্যাক্ট চেকিং সেন্টার চান রাজবাড়ীর ডিসি। এছাড়াও ক্ষতিকর ও অনুপযুক্ত ওয়েবসাইটসমূহ চিহ্নিত করে বন্ধকরণের প্রস্তিাব দিয়েছেন তিনি। জেলা পরিষদ ও পৌরসভার প্রকল্পের অনলাইন ডাটাবেজ চান টাঙ্গাইলের ডিসি।
পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি পৌরসভা ও ইউনিয়নে পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র ও ওয়াটারপ্লান্ট নির্মাণ চেয়েছেন সিলেট বিভাগীয় কমিশনার ও মাদারীপুর, বরগুনা, সিলেট, হবিগঞ্জ, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, রাজশাহী, নওগাঁ, খুলনা, মেহেরপুর, কক্সবাজারের ডিসি। জেলাভিত্তিক সমবায় সমিতির ডেটাবেইস তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন মানিকগঞ্জের ডিসি। ভূমিসংক্রান্ত সকল আইনকে একত্রিত করে একটি সংকলন প্রণয়ন চান মেহেরপুরের ডিসি। ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ এর সংশোধন চান পটুয়াখালীর ডিসি।
কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, কুড়িগ্রাম ও বগুড়ার ডিসি পর্যায়ক্রমে প্রতিটি উপজেলায় প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র চান। পর্যায়ক্রমে প্রতি জেলায় ইনডোর স্টেডিয়াম স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন নওগাঁর ডিসি। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্লাইমেট ফান্ড চট্টগ্রামের ডিসি। জেলা কারাগার হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ডাক্তার ও জনবল নিয়োগ চেয়ে প্রস্তাব দিয়েছেন কিশোরগঞ্জের ডিসি।
গতবারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কতটা
জেলা প্রশাসক সম্মেলনে সিদ্ধান্তগুলো তিন ভাগে বাস্তবায়ন করা হয়। এগুলো হলো স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি। স্বাভাবিকভাবেই মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বেশি সময় লাগে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত গতবারের জেলা প্রশাসক সম্মেলনে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার ৬১.৭৪ শতাংশ। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত মধ্যমেয়াদি সিদ্ধান্ত ৩৫.৭৫ শতাংশ এবং দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত ১৬.৬৭ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।
গত জেলাপ্রশাসক সম্মেলনের উল্লেখযোগ্য বাস্তবায়িত/বাস্তবায়নাধীন প্রস্তাবগুলো হলো- সরাসরি ক্রয়ের উর্ধ্বসীমা বৃদ্ধি করতে হবে। গ্রামাঞ্চলের হাট-বাজার ও গ্রোথ সেন্টারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে জেলেদের ঋণ প্রদান করতে হবে। প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। সমগ্র দেশের জন্য একই মডেলের ভৌত-অবকাঠামো প্রকল্প নকশা না করে পাহাড়, হাওড় এবং লবণাক্ত পানি বিধৌত উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য ডিপিপিতে আলাদা আলাদা ডিজাইনের সুযোগ রাখতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি শিক্ষকদের বদলির নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের বিভিন্ন উৎস হতে প্রাপ্ত আয় ও ব্যয় সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। বন্যা-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে মেরামত খাতে বরাদ্দ প্রদান করতে হবে। লংগদু, বরকল ও জুরাছড়ি উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে (মাদ্রাসা সরকারীকরণ, উপবৃত্তির ব্যবস্থাকরণ এবং আনুপাতিকহারে জনবল নিয়োগ) উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যমুনা সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতি অর্জনকারী অসচ্ছল ক্রীড়াবিদদের আর্থিক প্রণোদনা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রয় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মূল্য তালিকা একটি কেন্দ্রীয় ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। তামাক চাষীদের বিকল্প ফসল করার জন্য আর্থিক ও অন্যান্য প্রণোদনা প্রদান করতে হবে। সিলেট বিভাগের অনাবাদি জমি সেচের আওতায় আনতে হবে। উন্মুক্ত জলাশয়ে স্বাদু পানির মাছের প্রজনন সময় জুন-জুলাইয়ে মাছ আহরণ বন্ধ রাখতে হবে। সরকারিভাবে খাদ্য সংগ্রহের সময় আতপ ও মোটা চালের মূল্য পৃথকভাবে নির্ধারণের ব্যবস্থা করতে হবে।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শহিদ ছাত্র-জনতার স্মৃতি রক্ষার্থে সকল জেলায় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে ডিজিটাল লাইব্রেরি স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে। বিএসটিআই, বিভাগীয় কার্যালয়, বরিশাল-এ একটি মাইক্রোবায়োলজিক্যাল ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে। কক্সবাজার জেলায় লবণ শিল্পের বিকাশে ফরোয়ার্ড ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। চায়ের নিলাম মূল্য ও ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রয়মূল্যের মধ্যে সামঞ্জস্য আনয়ন করতে হবে। ক্যানসার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোক, প্যারালাইজড, জন্মগত হৃদরোগ এবং থ্যালাসেমিয়াজনিত দুরারোগ্য রোগে আক্রান্তদের আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধিকরণ এবং জেলাভিত্তিক বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।
সরকারি সকল দপ্তরে বয়স্ক, শারীরিকভাবে চলনে অক্ষম ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচল সুগমের জন্য র্যাম্প/লিফট স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে। গ্রাম পুলিশদের বেতনভাতা বৃদ্ধি করতে হবে। দুর্গম অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আবাসিক সুবিধা ও খাদ্য সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সুন্দরবনে পর্যটকবাহী নৌযানসমূহের রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স প্রদানের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং-এ দক্ষ জনশক্তি তৈরি করার উদ্দেশ্যে প্রতিটি জেলায় আইসিটি বিভাগের অধীন প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় মা ইলিশ রক্ষা অভিযানের সময় জেলেদের জন্য ভিজিএফ চালের বরাদ্দ বৃদ্ধিকরণ ও নগদ অর্থ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
চার দিনের সম্মেলনে কী কী হবে
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তত্ত্বাবধানে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে মন্ত্রী ও সচিবদের উপস্থিতিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ-সংক্রান্ত বিষয়ে ডিসিদের দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মাঠপর্যায়ে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে ডিসিরা নীতিনির্ধারণ, উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্বপালন করেন। ফলে তাঁদের প্রস্তাব ও এই সম্মেলনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়াও সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেবেন বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিরা। গতকাল শনিবার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
‘জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৬’ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ) মো. হুমায়ুন কবির জানান, এবারের ডিসি সম্মেলন উপলক্ষে আটজন বিভাগীয় কমিশনার ও ৬৪ জেলার ডিসিদের কাছ থেকে এক হাজার ৭২৯টি প্রস্তাব পেয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এর মধ্যে কার্যপত্রে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ৪৯৮টি প্রস্তাব। প্রাপ্ত প্রস্তাবগুলোতে জনসেবা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধি, জনদুর্ভোগ কমানো, রাস্তাঘাট ও ব্রিজ নির্মাণ, পর্যটনের বিকাশ, আইন-কানুন বা বিধিমালা সংশোধন, জনস্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি ৪৪টি প্রস্তাব স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সংক্রান্ত বলেও জানান তিনি। অতিরিক্ত সচিব আরও বলেন, প্রথম দিন রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ডিসি সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে।
এবারের সম্মেলনের বিশেষ দিক তুলে ধরে হুমায়ুন কবির বলেন, এবারের সম্মেলন ৩ থেকে ৬ মে চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত সম্মেলন তিন দিনব্যাপী ছিল। সম্মেলন চলাকালে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ, নির্দেশনা গ্রহণ ও মতবিনিময় করবেন। এছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারদের সঙ্গে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গে কার্য-অধিবেশন রয়েছে। এবারের ডিসি সম্মেলনে মোট ৩৪টি অধিবেশন ও কার্য-অধিবেশন রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কার্য-অধিবেশন ৩০টি। এর মধ্যে একটি উদ্বোধন অনুষ্ঠান, রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ, নির্দেশনা গ্রহণসহ অন্য আনুষ্ঠানিকতা দুটি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনা এবং বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে সভা রয়েছে। এবারের ডিসি সম্মেলনে একটি কার্যালয় (প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়), দুটি কমিশন (নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন) এবং ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ অংশ নেবে বলেও জানিয়েছেন অতিরিক্ত সচিব। এসময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি উপস্থিত ছিলেন।
সশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দিনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও আওতাধীন সংস্থা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং আইন মন্ত্রণালয় বিষয়ে আলোচনা হবে। প্রথম দিনের অধিবেশন শেষে ডিসিরা বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। দ্বিতীয় দিনে সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ-সম্পর্কিত আলোচনা হবে। এ ছাড়া এদিন জাতীয় সংসদ ভবনে জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় সভায় অংশ নেবেন ডিসিরা। তৃতীয় দিনে ৫ মে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সম্পর্কে আলোচনা হবে।
একই দিনে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ভবনে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন ডিসিরা। এদিন নির্বাচন কমিশন-সংক্রান্ত বিষয়েও আলোচনার কথা রয়েছে। ৬ মে সম্মেলনের শেষ দিনে স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত বিষয়ে আলোচনা হবে। এদিন রাতে রাজধানীর বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে ডিসিসহ প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাতের খাবার খাবেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









