বিশ্বাসযোগ্যতা ও সততার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত আরবি ‘সাদিক’ শব্দের অর্থ সত্যবাদী বা সৎ হলেও তার ক্ষেত্রে পুরোটাই উল্টো। রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি আর লুটপাট যেন তার নামের প্রতিশব্দ হয়ে শোভা পাচ্ছে অফিসের অনার বোর্ডে। কারণ জাতির সভ্যতার প্রতীক জাদুঘরকে কিভাবে ফোকলা করে দেওয়া যায় সে সবই হয়েছে তার হাত ধরে। শুধু কি তা-ই? এখানেই ক্ষান্ত নন তিনি। দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীনভাবে সংঘটিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরকে অন্ধকারে রাখতে করেছেন সবই। তিনি জাতীয় জাদুঘরের সচিব সাদেকুল ইসলাম, যার দুর্নীতি ও লুটপাটের উপাখ্যান আলাদিনের চেরাগের গল্পকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সাদিকুল ইসলাম শুধু একা নন, জাতীয় জাদুঘর এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ প্রকল্পে শত শত কোটি টাকার অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটে জড়িত আরো অনেকেই। এসব অপকর্মে জড়িত জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব, জাদুঘর পর্ষদের চেয়ারম্যান ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের কনসালট্যান্ট মেরিনা তাবাসসুমের আশীর্বাদ রয়েছেও বলে সশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
জানা গেছে, ঘুষ, দুর্নীতি ও লুটপাট যেন জাতীয় জাদুঘরের বর্তমান সচিব (উপসচিব) সাদিকুল ইসলামের নেশায় পরিণত হয়েছে। এ পদে আসার আগে তিনি ছিলেন শেখ হাসিনা সরকারের দুর্নীতিবাজ ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের একান্ত ব্যক্তিগত সচিব (পিএস)। কিন্তু ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতন হলেও রাতারাতি পোশাক বদলে নিজেকে বদলে নেন তিনি। অদৃশ্য ক্ষমতার বলে কৌশলে বাগিয়ে নেন জাতীয় জাদুঘরের সচিবের পদ। অবশ্য তিনি একাই বাগাননি। তার মতোই রাতারাতি মহাপরিচালকের পদ বাগিয়ে নেন সমন্বয়ক পরিচয় দেওয়া তানজিম ওয়াহাবও। তৎকালীন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর হাত ধরে এসব হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, সাদেকুল ইসলাম জাতীয় জাদুঘরের সচিবের পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) পদেও অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পালন করছেন। এটাই মূলত পোয়াবারো হয়ে ওঠে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এ ছাত্রলীগ নেতার।
এর মধ্যে জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারির সংস্কার, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ওপর ডকুমেন্টারি নির্মাণ, শীতল পাটির ছবি সরবরাহ ও ইতিহাস বিভাগের প্রদর্শনী, আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, বিনা টেন্ডার অকেজো মালামাল বিক্রি, জিয়া জাদুঘরের মেরামত ও সংস্কার, নিয়োগ ও পদোন্নতিসহ অসংখ্য খাতে শত কোটি টাকার অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ অন্যতম।
সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারির সংস্কার করা হলেও ২০২৩ সালে আবার প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে পুনঃসংস্কার করা হয়। সম্প্রতি একই গ্যালারির অস্থায়ী ডেকোরেশন ও প্রদর্শনী স্থাপনে কোনো বৈধ টেন্ডার ছাড়াই তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় দেড় কোটি টাকার সংস্কারকাজ করানো হয়। আংশিক কাজ দ্রুত শেষ করতে প্রচলিত নিয়ম ভঙ্গ করে ছুটির দিনেও জাদুঘর খোলা রাখা হয়। এইচএম ইলেকট্রিকের মাধ্যমে জনৈক মো. লিটন মল্লিকের নামে প্রায় ৬০ লাখ টাকা এবং ১৭৩২ (১৯/১২/২০২৫) স্মারক অনুযায়ী জিজিবির মাধ্যমে প্রায় ৩৯ লক্ষ টাকার লাইট সরবরাহ করে বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। মূলত সরকারি টাকা আত্মসাৎ করতেই এ কাজ করান সচিব।
এদিকে সম্প্রতি জাতীয় জাদুঘরের বিভিন্ন পদে ৪৮ জনকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, সংসদ নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডে এ নিয়োগের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এতে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে প্রক্সি পরীক্ষার ব্যবস্থা, খাতা পরিবর্তন, পরীক্ষার হলে উত্তরপত্র সরবরাহ এবং আত্মীয় নিয়োগের মতো ঘটনা ঘটেছে। পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে।
সবকিছু ছাপিয়ে টাকার বিনিময়ে চাকরির নিশ্চয়তা দেওয়া সংক্রান্ত একটি ফোনালাপেই ঘুষ লেনেদেনের একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফোনালাপের শুরুতে অপর প্রান্তের ব্যক্তি সুমন নামে এক লোককে ‘সুমন ভাই’ সম্বোধন করে ‘রেটের’ বিষয়ে জানতে চান। জবাবে সুমন বলেন, ‘বাজারদর অনুযায়ী রেট হলো ১৩ (১৩ লাখ)। অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তি রেট কমানোর অনুরোধ করলে সুমন জানান, এর চেয়ে কমানো সম্ভব নয়, এমনকি ১০ হাজার টাকাও কমানো সম্ভব নয়। তখন অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তি বলেন, ‘টেলিফোন অপারেটর আটকায় রাখছেন, আবার ওদিক দিয়ে বলতেছেন! কোন দিকে যামু?’
এ সময় সুমন নিজেকে একজন মাধ্যম হিসেবে পরিচয় দেন। জানান, তার কাজ হলো টাকাটা নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া, যাতে কোনো ক্যাচাল বা ঝামেলা না হয়।
ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তিকে চাকরির নিশ্চয়তা দিয়ে সুমন জানান, এ প্রক্রিয়ায় পরীক্ষায় পাস করার কোনো প্রয়োজন নেই। ফলে প্রার্থীকে এ বিষয়ে চিন্তা করতে হবে না। কথোপকথনের এক পর্যায়ে কবির নামে একজনের নাম উল্লেখ করে তার মেয়ের চাকরির বিষয়েও একই ধরনের লেনদেনের আলোচনা চলছে বলে জানান।
অপর প্রান্তের ব্যক্তি পরীক্ষায় পাস করা না-করার বিষয়ে শতভাগ নিশ্চয়তা পেতে আবারও প্রশ্ন করেন, পরীক্ষায় পাস হতে হবে নাকি পাস না করলেও চলবে? এমন প্রশ্নে সুমনের সাফ জবাব, ‘টোটাল প্যাকেজ। টোটাল প্যাকেজ। তোমার চিন্তা করার দরকার নাই, কী করা লাগবে, না লাগবে তোমার জানার দরকার নাই।’
অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক থেকে সম্প্রতি পদোন্নতি পেয়ে রেজিস্ট্রেশন সহকারী হওয়া সুমন প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারী ইউনিয়নেরও সেক্রেটারি। টাকার বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি সংক্রান্ত অডিও নিয়ে সুমন মিয়ার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। ১৩ লাখ টাকায় কিভাবে চাকরির নিশ্চয়তা দিচ্ছেন? এমন প্রশ্ন করা হলে বিষয়টি অস্বীকার করেন সুমন মিয়া। তার এ-সংক্রান্ত ফোনালাপের রেকর্ড হাতে আছে; এমন তথ্য জানালে তিনি বলেন, ‘আমি এমন কিছু বলিনি। আর আমার পক্ষে এটা সম্ভবও না।’ এ সময় ফোনালাপ নিয়ে দেখা করার কথা বললে তিনি বলেন, ‘আমি আপনাকে প্রমাণ দেব কেন?’
এই লেনদেনের সঙ্গে জড়িত সুমন মিয়ার বোন তাসলিমা আক্তারও জাতীয় জাদুঘরের টেলিফোন অপারেটর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তার অনলাইন আবেদনপত্রে সুমনের ইমেইল ব্যবহার করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমার নিয়োগও প্রক্সি পরীক্ষার মাধ্যমে হয়েছে। পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই তিনি নিয়োগ পেয়েছেন এবং নির্ধারিত পদের বিপরীতে তাকে পদায়ন করা হয়েছে।
জাতীয় জাদুঘরের টেলিফোন অপারেটর পদে নিয়োগ পেলেও তাসলিমা আক্তারকে ময়মনসিংহে অবস্থিত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালায় বদলি করা হয়েছে। মূলত তিনি যে সুমন মিয়ার বোন তা গোপন করতেই এই বদলি।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৪তম শাহাদাৎ বার্ষিকী উপলক্ষে কোনো বৈধ টেন্ডার ছাড়াই কাটপেস্ট ও সীমিত সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রায় ২০ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করান জাদুঘরের সচিব মো. সাদিকুল ইসলাম। ভিডিও চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শনীর নামে সচিব গোপনে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৪০ লাখ টাকার ভুয়া টেন্ডার ডকুমেন্টস প্রস্তুত ও বিল উত্তোলন করেন। কিন্তু এ পত্রটির কপি জাদুঘরের কোথাও বিতরণ করা হয়নি। এ ছাড়া জাতীয় জাদুঘরের দুটি কিউরেটোরিয়াল বিভাগে শীতল পাটির ছবি সরবরাহ ও ইতিহাস বিভাগের প্রদর্শনীর নামে কোনো বাস্তব প্রদর্শনী আয়োজন ছাড়াই ভুয়া ও জাল ডকুমেন্টস প্রস্তুত করে প্রায় ১২ লাখ টাকা সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণেও প্রায় ১ কোটি টাকার দুর্নীতি করেন সচিব সাদিক। তিনি তার পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইসমত আরা এন্টারপ্রাইজকে এ কাজটি পাইয়ে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রাচীরের কাজ শুরু হওয়ার আগেই ৫০% বিল উত্তোলন করার ব্যবস্থা করে দেন। বিলের কাগজে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক প্রত্যয়ন নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিনা টেন্ডারে ইসমত আরা এন্টারপ্রাইজ নামে সচিবের এক পছন্দের ঠিকাদারের কাছে জাদুঘরের অকেজো মূল্যবান মালামাল নামমাত্র মূল্যে বিক্রয় করা হয়।
এদিকে বিগত ১৭ বছর ধরে অবহেলিত থাকা জিয়া স্মৃতি জাদুঘরের উন্নয়নের নামে ৫ আগস্ট পরবর্তীতে এক কোটি ৮৮ লাখ টাকার কাজ পাইয়ে দেন তার পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইসমত এন্টারপ্রাইজকে। এ কাজে রোজ গার্ডেনের সাবেক পিডিকে প্রধান করে কমিটি করেন ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী আমলা, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও বিএনপি বিদ্বেষী মো. সাদেকুল ইসলাম। উল্লেখ্য, যে হেরিটেজ সংরক্ষণের জন্য যে ধরনের কাজ (রেক্টোফিটিং) করা দরকার সে ধরনের কাজ এ শিডিউলে ধরা হয়নি।
সচিব সাদিকুলের এসব কাজে শক্তি যুগিয়েছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী, জাদুঘরের ডিজি তানজিম ওয়াহাব ও কনসালট্যান্ট মেরিনা তাবাসসুম।
জানতে চাইলে জাতীয় জাদুঘরের সচিব সাদেকুল ইসলাম দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘সচিব হিসেবে আমার এক টাকার কাজ অনুমোদন দেওয়ার এখতিয়ার নেই। আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের কোনো ভিত্তি নাই।’ তিনি বলেন, ‘যেখানে ডিজি মহোদয় আছেন সেখানে আমি কিভাবে সব কাজে সম্পৃক্ত হই?’
তিনি বলেন, ‘নিয়োগের জন্য সাত সদস্যের একটি নিয়োগ কমিটি আছে। তারাই এ-সংক্রান্ত সব বিষয় দেখে। এখানে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগের বিষয়টি সঠিক নয়।’
উল্লেখ্য, ২৪তম বিসিএসের মাধ্যমে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় সহকারী কমিশনার হিসেবে চাকরি শুরু করা সাদিকুল ইসলাম রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, বাগমারা (রাজশাহী) উপজেলা নির্বাহী অফিসার, গোমস্তাপুর (চাপাইনবাবগঞ্জ) উপজেলা নির্বাহী অফিসার, রাজশাহী ওয়াসার সচিব ও সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের একান্ত সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অর্থাৎ গোটা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দাপুটে ছিলেন এই কর্মকর্তা। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতেও তিনি জাতীয় জাদুঘরের সচিবের দায়িত্ব পান।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাবের সঙ্গে একাধিকবার চেষ্টার পরও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার সাথে দেখা করতে অফিসে গেলেও তিনি না থাকায় সাক্ষাৎ করা যায়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









