দেশে হাম ও হামের উপসর্গে এ পর্যন্ত মোট ৪২৫ শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সেই সঙ্গে এ উপসর্গের রোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে যা নজিরবিহীনভাবে দেশের অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া হামের এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, অনেকটাই মহামারি পর্যায়ে চলে গেছে। সরকারের জরুরি টিকাদান কর্মসূচি ও পদক্ষেপের মধ্যেই আরো কত শিশু প্রাণ হারাবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, এত শিশুর মৃত্যুর জন্য দায়ী কে, কারা? কারণ ক্ষমতাসীন সরকার ও বিরোধী দলও যেন দায়ীদের শনাক্তকরণে খুব বেশি আগ্রহী নয়। কারো তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। এমন বাস্তবতায় সর্বত্রই প্রশ্ন উঠেছে, রাজনৈতিক দলগুলো যেন শুধু তাদের চেয়ারের পেছনে ছুটছেন সবাই। শত লাশেও তাদের চোখে অশ্রু ঝরে না।
গতকাল বুধবার পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের ‘সন্দেহজনক’উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫১ হাজার ৫৬৭ জন। এর মধ্যে ৭ হাজার ২৪ জনের হাম সংক্রমণ নিশ্চিত। তবে আক্রান্ত ও মৃতদের প্রায় সবাই শিশু। এর মধ্যে মোট ৭ হাজার ২৪ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ও চায়ের টেবিলে সরব আলোচনা-সমালোচনা এখন তুঙ্গে। বিশেষ করে এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর উদাসীনতা ও নিরুদ্বেগে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। যদিও পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার গত ৬ মে হাম-রুবেলা, ওরাল পোলিওসহ ১০ ধরনের টিকার চালান এনেছে বলে দাবি করেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, ১৫ লাখ ডোজ হামের টিকা দেশে এসেছে। আরো ১০ ধরনের ১ কোটি ৮ লাখ ডোজ টিকা আনার তথ্য জানিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে টিকার আর সংকট হবে না।
তবে মাঠের চিত্র ভিন্ন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকা নিয়ে সচেতনতা কমেছে। রাজধানীর অনেক বস্তিতে শিশুদের টিকা দিতে অভিভাবকদের অনাগ্রহী দেখা গেছে। টিকা দিলে শিশু মারা যায় বলে গুজবও ছড়ানো হয়েছে। যে কারণে সরকারের টিকাদান কর্মসূচি খানিকটা ব্যাহত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্যে জানা গেছে, গত আড়াই দশকে কখনো দেশে হামের সংক্রমণ ৫০ হাজার ছাড়ায়নি। এর আগে হামের সর্বাধিক রোগী পাওয়া গিয়েছিল ২০০৫ সালে, ২৫ হাজার ৯৩৪ জন। এর পর থেকে রোগী কমে আসে। ২০২৫ সালে মাত্র ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। আগের পাঁচ বছরের (২০২০ থেকে ২০২৪) রোগীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২ হাজার ৪১০, ২০৩, ৩১১, ২৮১ ও ২৪৭।
এদিকে ঠিক কি এতগুলো শিশু মারা গেছে, সেসব নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল কেউই তেমন কোনো কথা বলছে না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাম রেখে ধান নিয়ে কথা বলছেন প্রকাশ্যে। সোমবার এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, হামে মৃত্যুর জন্য হাসিনা সরকার দায়ী। আর বিরোধী দলও আছে তাদের নিয়মতান্ত্রিক সরকারবিরোধী কথাবার্তা নিয়ে। সদ্য সমাপ্ত সংসদ অধিবেশনে হাম নিয়ে তাদের জোরালো কোনো কথা বলতে দেখা যায়নি।
অপরদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি বলেছেন, ‘হামের টিকার দায় অন্তবর্তী সরকার নেবে না।’
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা বা জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি ছিল না। ব্র্যাকের মতো বেসরকারি সংস্থা কিছু কাজ করলেও তা থেকেছে সীমিত পরিসরে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘টিকার সংকটের কারণে হাম পরিস্থিতির চরম অবনতির জন্য দায়ী মূলত অন্তর্বর্তী সরকার।’ তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন ছাড়াই উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্তের ফলে হামের বর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নিজ উদ্যোগেই শ্বেতপত্র প্রকাশ করা উচিত।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর টিকা সংগ্রহের পুরোনো পদ্ধতি বাতিল করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করেছিল। সে সময় ইউনিসেফের কর্মকর্তারা একাধিকবার সরকারের উচ্চপর্যায়ে সতর্ক করে জানিয়েছিলেন, নতুন সিদ্ধান্ত ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। টিকা সংগ্রহে ১২ মাস বিলম্ব ঘটবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন এদিনকে বলেন, শিশুদের ওপর একের পর এক অন্যায় করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন নেই, মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর পক্ষে প্রচারণা নেই, কৃমিনাশক ঠিকমতো খাওয়ানো হয়নি। এসব কারণে শিশুদের অপুষ্টি বেড়েছে। পুষ্টিহীন শিশুরা টিকা না পেয়ে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে বিপজ্জনক অবস্থা চলে গেছে। যার পরিণতি হামের প্রাদুর্ভাব, মৃত্যুর মিছিল।’
তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, দেশে টিকার পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও যথাসময়ে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করতে না পারাই এই মারাত্মক বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। অবশ্য অনাকাঙ্ক্ষিত এই প্রাণহানির পেছনে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় কারও কোনো অবহেলা রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে সরকার একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, দেশে কখনোই হামের (এমআর) টিকার কোনো ঘাটতি ছিল না। এমনকি বর্তমান টিকাদান কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় টিকা গত বছরের সেপ্টেম্বরেই কেন্দ্রীয় গুদামে এসে পৌঁছায়।
কিন্তু পূর্বনির্ধারিত টাইফয়েডের টিকা ক্যাম্পেইন, জাতীয় নির্বাচন এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য সহকারীদের টানা কর্মবিরতির কারণে হামের বিশেষ ক্যাম্পেইনটি বারবার পিছিয়ে যায়।
ইউনিসেফ এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা মহামারির প্রভাব, বিগত প্রায় পাঁচ বছর ধরে জাতীয় টিকাদান ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত না হওয়া এবং গত এক বছর ধরে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো বন্ধ থাকার কারণে শিশুদের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় ব্যাপক ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা এই প্রাদুর্ভাবকে ত্বরান্বিত করেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে শিশুদের অংশগ্রহণের হার উদ্বেগজনকভাবে কমেছে। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে হামের প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। এর ওপর গত বছরের ডিসেম্বর মাসে পদোন্নতি ও নিয়োগবিধি সংশোধনসহ বিভিন্ন দাবিতে স্বাস্থ্য সহকারীরা দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ রেখে লাগাতার আন্দোলন করেন।
বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান সমন্বয়কারী মো. ওয়াসি উদ্দিন রানা জানান, দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তারা ডিসেম্বর মাসজুড়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন, যার ফলে অস্থায়ী কেন্দ্রগুলোতে টিকাদান কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে।
ইপিআইয়ের তৎকালীন উপ-পরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদও বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন থাকলেও মাঠপর্যায়ে আন্দোলনের কারণেই মূলত টিকাদানে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়।
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ড. তাজুল ইসলাম বারী মনে করেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরে টিকা আসার পরপরই যদি দ্রুত ক্যাম্পেইন শুরু করা যেত, তবে হয়তো এই ভয়াবহ মৃত্যুঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হতো। পাশাপাশি, ভিটামিন ‘এ’ক্যাপসুল খাওয়ানো বন্ধ থাকায় শিশুদের অপুষ্টি ও নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বেড়ে গিয়ে মৃত্যুর হারকে আরো ভয়াবহ রূপ দিয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে কেন্দ্রীয় গুদামে হাম-রুবেলাসহ ১০টি রোগের টিকার মজুত শূন্যে নামে। যে মাসে সারা দেশে ৪১ শিশু প্রাণ হারায়। এক সাক্ষাত্কারে ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রতি দফায় বৈঠকের পরপরই চিঠির মাধ্যমে টিকার সম্ভাব্য ঘাটতি, রোগের প্রাদুর্ভাব, মৃত্যুহারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে কেউই সেসব সতর্কবার্তা আমলে নেয়নি। এমনকি জাতীয় টিকাদান পরামর্শক কমিটিও আজ থেকে দেড় বছর আগে হাম নিয়ে সতর্ক করেছিল। তবে সে সতর্কবার্তাও উপেক্ষিত হয়েছে।
অবশ্য, দেশের বৃহত্তম বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক জরুরি ভিত্তিতে ১৫ লাখ ডোজ হামের টিকার ক্যাম্পেইন চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্র্যাক স্বাস্থ্য কর্মসূচির অধীনে লিড, রুরাল প্রাইমারি হেলথকেয়ার হিসেবে কর্মরত মেহেদী হাসান। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্র্যাকের এক কর্মকর্তার ভাষ্য, জাতীয় টিকাদান ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে একটি বেসরকারি সংস্থার পক্ষে এত বড় সংকট মোকাবিলা করা অসম্ভব। বিশ্লেষকদের মতে, ব্র্যাকের টিকাদান প্রশংসনীয় হলেও ২ কোটি শিশুর তুলনায় এটি নগণ্য।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (সিডিসি) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ বলেন, টিকার ব্যাপারে প্রচার-প্রচারণার ঘাটতি আছে। মানুষের মধ্যে দ্বিধা আছে। আগে ৯ মাস বয়সীদের টিকা দেওয়া হতো, এখন বয়স কমিয়ে ৬ মাস করা হয়েছে। এতে শিশুর ক্ষতি হবে কি না, তা মায়েদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি করতে পারে। এর জন্য দরকার ছিল স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে মায়েদের মুখোমুখি যোগাযোগ। সেটি হয়নি।
সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এদিনকে জানান, দীর্ঘদিন ধরে অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থাকা এবং যথাসময়ে জাতীয় ক্যাম্পেইন না হওয়ার কারণেই আজকের এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি দ্রুততম সময়ে মোকাবিলা করতে এবং হামে আক্রান্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধানে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (আইইডিসিআর) ইতোমধ্যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









