সহস্রাধিক মানুষের জীবনের বিনিময়ে ঘটা জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতির জাদুঘর প্রকল্পে অর্থ হরিলুটের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে কোটি কোটি টাকা হরিলুটের বাতাসা বণ্টনের মতো কাণ্ড ঘটিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বিভিন্ন পদে নিয়োগ, ‘আয়নাঘর’ নির্মাণ, কনসালটেন্সি ফি ও নাশতা বাবদ পরতে পরতে এমন লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, যাকে পুকুর নয় রীতিমতো সাগর চুরি বললেও যেন কম হবে। লুটেরাদের এমন কর্মকাণ্ডে ইতোমধ্যে প্রকল্পটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সর্বত্র। চক্রের সদস্যরা প্রকল্পটির গায়ে এমন কলঙ্কের তিলক এঁকে দিয়েছেন যাতে অনিয়ম, দুর্নীতি আর লুটপাটে কালো হয়ে গেছে হাজার শহীদের রক্তে রঞ্জিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত স্মৃতির দেয়াল।
জানা গেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আবেগকে পুঁজি করে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর প্রকল্পে নজিরবিহীন দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। বিশেষ করে মাত্র ছয় মাসে ভিভিআইপি আপ্যায়ন ও 'নাশতার বিল' হিসেবে দেখানো হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ টাকার বেশি। এর বাইরে ভুয়া টিনের বাউন্ডারি, দরপত্র ছাড়া সংস্কার এবং ভুয়া প্রদর্শনীর নামে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বিপুল অর্থ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তৎকালীন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর প্রত্যক্ষ মদদে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর প্রকল্পে জড়িত শীর্ষ কর্তাদের এই লুটের লঙ্কাকাণ্ড ঘটেছে। এত কিছুর পরও শতকোটি টাকার এই প্রকল্প এখনো আলোর মুখ দেখেনি। গত বছরের আগস্টে উদ্বোধন করার কথা থাকলেও এখনো সেখানে কাজ চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই নিয়োগপ্রত্যাশীদের ভাইভা গ্রহণ, দিনে নাশতা, আপ্যায়নের বিল বাবদ লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ের মচ্ছব হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি গভীর রাতে ভাইভা নেয়ার একটি ভিডিও প্রকাশের পর নতুন করে আলোচনায় আসে এই প্রকল্প।
এর মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৬২ পদে নিয়োগ দিতে গত ২৮ জানুয়ারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। কিন্তু বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দুদিন আগে (২৬ জানুয়ারি) থেকেই শুরু হয় ভাইভা পরীক্ষা। প্রচলিত আইন না মেনে সার্কুলারের আগেই গোপনে গভীর রাতে এই ভাইভা নেওয়া হয়। যাদের ভাইভা নেওয়া হয়েছিল তাদের কারোই লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়নি।
এসব অনিয়মের বিষয়ে গত ফেব্রুয়ারি মাসে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। ফলে বিতর্কের মুখে ভেস্তে যায় নিয়োগপ্রক্রিয়া। সে সময় জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক এবং জুলাই জাদুঘরের প্রধান কিউরেটর তানজিম ইবনে ওয়াহাব দাবি করেন, কাউকে গোপনে এমন পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়নি। গণমাধ্যমে এ নিয়ে ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে জুলাই জাদুঘরের এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে বেশ কিছু তথ্য-উপাত্ত ও ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে গোপনে ভাইভা আয়োজনের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে।
মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, জাতীয় নির্বাচনের আগে গত ২৮ জানুয়ারি মাত্র এক সপ্তাহের সময় বেঁধে দিয়ে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের ব্যবস্থাপক, উপ-পরিচালক, কিউরেটর, ডেপুটি কিউরেটরসহ অন্তত ৯৬ জনের নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। ওই নিয়োগের আবেদনের সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রাপ্ত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ঠিক দুই দিন আগে অর্থাৎ গত ২৬ জানুয়ারি থেকেই জাদুঘরের ওই ৬২ পদের জন্য মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া শুরু হয়ে যায়। অফিস সময় শেষে বিকাল ৫টা থেকে জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তন ও সিনে কমপ্লেক্সে হওয়া ওই মৌখিক পরীক্ষা চলে রাত ১২টা পর্যন্ত। ২৬ থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত গোপনে শতাধিক কথিত প্রার্থীর মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। গত ২৬ জানুয়ারির সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ৮টার পর সুফিয়া কামাল মিলনায়তন ও সিনে কমপ্লেক্সের করিডোরে একের পর এক লোক প্রবেশ করছে। কারোর হাতে কাগজের খাম, কারোর হাতে কাগজপত্র ভরা শপিংব্যাগ। কেউ আবার আগতদের কাগজ পরীক্ষা করে একেকজন করে ভেতরে পাঠাচ্ছেন। ভেতর থেকে অনেকে আবার হাসিমুখে বের হয়ে আসছেন।
ওই রাতে জাতীয় জাদুঘরের সিনেপ্লেক্সের দায়িত্বে থাকা নাজু মণ্ডল বলেন, ‘নিয়মিত অফিস সময়ের পর জাদুঘরে প্রবেশ করেন চাকরিপ্রার্থীরা। আমিও সে সময় ডিউটিতে ছিলাম। ২৬ তারিখ থেকে ৩১ তারিখ পর্যন্ত প্রতিদিন বিকাল ৫টার পর থেকে রাত ১১টা-১২টা পর্যন্ত চলে জুলাই জাদুঘরের নিয়োগ পরীক্ষা। যারা পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন তাদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করতে বলা হয়েছিল আমাদেরকে। আমরা সেটাই করেছি।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন লোক আসত। ছয় দিনে অন্তত শতাধিক লোক এসেছিলেন।’
সার্কুলারের আগেই ওই ভাইভা দেওয়া চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ছিলেন মো. ফারুক নামের একজন। তিনি বলেন, ‘আমি হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে আবেদন করেছিলাম। গত ২৭ জানুয়ারি ভাইভা দিয়েছি। ভাইবার জন্য বিকাল ৩টার পর আমরা শাহবাগের জাদুঘরে যাই। আমার পরীক্ষা শেষ হতে রাত সাড়ে ৮টা-৯টা বেজে যায়। আমার সঙ্গে আরো অনেকেই সেখানে ভাইভা দিয়েছে। তবে আমাদের কোনো লিখিত পরীক্ষা হয়নি।‘ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির আগেই কিভাবে ভাইভা হলো- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভাই, এগুলো সম্পর্কে তো আপনারা জানেনই। এ বিষয়ে বেশি কিছু বলা যাবে না। আমাদের ডাকা হয়েছিল বলেই আমরা গিয়েছিলাম। ভাইভার পর আমরা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী আবার আবেদন করি। আমাদেরকে বলা হয়েছিল- নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির সময় শেষ হলেই আমাদেরকে চাকরিতে ঢুকিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু তারপর সব ভেস্তে যায়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক প্রার্থী বলেন, ‘জাদুঘরে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার জন্য একেক প্রার্থীর কাছে অন্তত ১৩ লাখ টাকা চাওয়া হয়। জাতীয় জাদুঘরের রেজিস্ট্রেশন সহকারী সুমন মিয়ার মাধ্যমে আমার কথা হয়। তিনি আমাকে বলেন- চাকরি পেতে গেলে ফুল প্যাকেজ ১৩ লাখ লাগবে। এখানে আমি ১০ হাজারও কম নিতে পারব না। সব বড় স্যারদের হাতে। শুধু টাকা দিলেই হবে। বাকি সব আমরা করে দিব।’
তিনি বলেন, মূলত জাদুঘরে কারা কারা নিয়োগ পাবেন, কাদেরকে কোন পদে নিয়োগ দেওয়া হবে তা আগে থেকেই ঠিক করা হয়। এরপরই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। তবে সে সময় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হওয়ায় সব ভেস্তে যায়।
এদিকে জুলাই জাদুঘরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ফারুকী উপদেষ্টা থাকাকালীন জুলাই জাদুঘরের জন্য ৩০০ থেকে ৪০০ লোক নিয়োগের পরিকল্পনা করেছিলেন। অর্থ বিভাগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত তা ১০৭ জনে নামিয়ে আনতে বাধ্য হন। জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে নিয়োগের পরও তানজিম ইবনে ওয়াহাবকে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে মহাপরিচালক করেন ফারুকী। পরে ওই তানজিমকেই আবার জুলাই জাদুঘরের মহাপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। তিনি বলেন, শুধু লোক নিয়োগই নয়, জুলাই জাদুঘরের কেনাকাটাতেও অনিয়ম করা হয়েছে। মোট দুইটি খাত থেকে অর্থব্যয় করা হয়েছে। একদিকে জুলাই জাদুঘরের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। অন্যদিকে একই কাজের জন্য আবার বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের বাজেট থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে।
তবে নাশতা ও আপ্যায়ন বিল যেন ভুতুড়ে হিসাব। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাত্র ছয় মাসে আপ্যায়ন ও নাশতার বিল হিসেবে ১ কোটি ২ লাখ টাকার বেশি খরচ দেখানো হয়েছে। দিনপ্রতি হিসাব করলে যা গড়ে প্রায় ৫৬ হাজার টাকা। আর গত ২৫ জানুয়ারি থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ২৫ দিনে ভিভিআইপিদের আপ্যায়ন ও ইন্টারনেট বিলই ভ্যাটসহ দেখানো হয়েছে ২৯ লাখ ৫৪ হাজার ৭৬০ টাকা। এ ছাড়া স্বেচ্ছাসেবকদের দৈনিক গড় খরচ দেখানো হয়েছে ৩১ হাজার ৬৬৬ টাকা। গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে কাজ করা ৮০ জন স্বেচ্ছাসেবকের আপ্যায়ন খরচ দেখানো হয়েছে মোট ৫৭ লাখ টাকা।
গত ৬ অক্টোবর ইসলামিক ওয়ার্ল্ড এডুকেশনাল, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশনের (আইসেস্কো) মহাপরিচালক (ডিজি) ড. সেলিম এম আল মালিকের একদিনের জাদুঘর পরিদর্শনে আসার আপ্যায়ন বিলই তোলা হয়েছে ৭০ হাজার টাকা। এর বাইরেও জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের অদূরে মোহাম্মদপুরের ‘আড্ডা প্রবর্তনা রেস্টুরেন্ট’-এর নাম দেখিয়ে বিভিন্ন সভা ও অনুষ্ঠানের নামে ১০ লাখ ২৮ হাজার ৫১৫ টাকার বিল করা হয়েছে। বিভিন্ন কর্নার উদ্বোধনের ওই রেস্টুরেন্ট এর নামে এক দিনেই নাশতার বিল করা হয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। লাইট লাগানোর খরচ দেখানো হয়েছে ৩৮ লাখ ২ হাজার ১৭৪ টাকা। গ্যালারি সংস্কারের নামেও দেড় কোটি টাকার বিল তোলা হয়েছে। জুলাই জাদুঘরের সড়কের পাশে টিনের বাউন্ডারি নির্মাণের কথা বলে জাতীয় জাদুঘর থেকে তোলা হয়েছে ৬৪ লাখ ৩৮ হাজার ৪৭০ টাকা।
জুলাই জাদুঘরের স্বেচ্ছাসেবক, কর্মকর্তা ও অনুষ্ঠানের জন্য খাবার নেওয়া মোহাম্মদপুরের ওই ‘আড্ডা প্রবর্তনা রেস্টুরেন্টে’ গিয়ে দেখা যায়, সেখান থেকে দিনে লাখ টাকার খাবার নেওয়ার তেমন কোনো সক্ষমতা নেই। রেস্টুরেন্টের দায়িত্বে থাকা মং মারমা ও মো. শাহিন বলেন, ‘আমাদের এখান থেকে এখন আর খাবার নেওয়া হয় না। তবে কিছু দিন আগেও প্রতিদিন বিকালে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ জনের নাশতা নেয়া হতো। কোনো দিন নান রুটি, সবজি, পিঠা এসবই নিত। তবে তা লাখ টাকা হবে না। লাখ টাকার খাবার দেয়ার মতো অবস্থা আমাদের নেই। হাজার টাকা হলেই আমরা খুশি।‘ তবে আপনাদের নামে লাখ লাখ টাকার বিল তোলা হয়েছে- এমন কথার জবাবে তারা বলেন, ‘আসলে এগুলো আমাদের জানা নেই।’
সূত্র জানায়, 'জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর'-এর রূপান্তর প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও সরকারি অর্থ লুটপাটের অভিযোগ অনুযায়ী, শেরে-বাংলানগরস্থ জাদুঘরের নকশা প্রণয়নে সরকারি আর্থিক বিধি উপেক্ষা করে জাতীয় জাদুঘর ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতির প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। মূলত ভুয়া ক্রয়াদেশ দেখিয়ে নিজস্ব তহবিল থেকে এ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। এ্যাটিলিয়ার রবিন আর্কিটেক্টস-নামে প্রতিষ্ঠানের সাথে নকশা প্রণয়নের চুক্তি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। যদিও এ-সংক্রান্ত কোনো চিঠি জাদুঘরের কোনো শাখায় বিতরণ করা হয়নি। এ অনিয়মে পর্ষদের চেয়ারম্যান মেরিনা তাবাস্সুম, মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর' সংশ্লিষ্ট তথ্যচিত্র নির্মাণ প্রকল্পেও গুরুতর অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক্ষেত্রে মেসার্স মিনহাজ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে ৫ মিনিট দৈর্ঘ্যের মোট ১৯টি ভিডিও নির্মাণের কাজ গোপন ও নিয়মবহির্ভূত টেন্ডারের মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়া হয় এবং এ কাজে অস্বাভাবিকভাবে কমপক্ষে সাড়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়। কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই সম্পূর্ণ বিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে সরকারি আর্থিক বিধি উপেক্ষা করে সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টাকে সন্তুষ্ট করতে জাতীয় যাদুঘরের সচিব মো. সাদেকুল ইসলাম এক রাতে ব্যাকডেটে পত্র প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে চেক একসাথে প্রদান করেন। এতে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ লুটপাট ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুস্পষ্ট অভিযোগ প্রতীয়মান হয়।
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ প্রকল্পে নজিরবিহীন দুর্নীতির অন্যতম চিত্র মেলে ‘আয়নাঘর’ নির্মাণে। এক্ষেত্রে মাত্র ৩ ফুট বাই ৬ ফুটের আয়নাঘর নির্মাণে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়, যেখানে বাস্তবে এ ধরনের স্থাপনার ব্যয় ১০ লাখ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। এ কাজটিও নিয়ম-বহির্ভূত টেন্ডার ছাড়াই ব্যাকডেটে টেন্ডারের কাগজপত্র প্রস্তুত করেন মো. সাদেকুল ইসলাম। এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে ৭০টি সিসি ক্যামেরা সরবরাহ ও সংস্থাপনে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়, 'মাটি স্টুডিও' নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফাইবার নির্মিত ভাস্কর্য তৈরিতে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে যেখানে পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ।
মাটি স্টুডিও একটি শৈল্পিক প্রতিষ্ঠান, যে প্রতিষ্ঠানটি বিগত হাসিনা সরকারের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে শেখ মুজিব ও তার লোকজনের ভাস্কর্য তৈরি করেছে। এ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীর তেজস হালদার যশের মাধ্যমে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের বিভিন্ন ভাস্কর্য (ফাইবারের) তৈরি করতে নিয়ম-বহির্ভূত টেন্ডার জালিয়াতি করে প্রায় ৪০ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে। লুটপাটে সহযোগিতা করায় যশকে ২০২৫ সালে একুশে পদক প্রদানের জন্য মনোনীত করা হয়।
এসব ছাড়াও গণভবনের ফলস বা টিনের বাউন্ডারি নির্মাণ বাবদ প্রায় দেড় কোটি টাকা ‘ঘুপচি’ টেন্ডারের মাধ্যমে লুটপাট, জুলাই জাদুঘরে বিনা টেন্ডারে অসংখ্য মূল্যবান মালামাল নামমাত্র মূল্যে বিক্রি, জাদুঘরের কনসালট্যান্ট নিয়োগ না দিয়েও কনসালট্যান্সি ফি বাবদ প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা, জুলাই জাদুঘরে দর্শনার্থীদের দেখাতে অডিও কাজের জন্য তিন কোটি ঊনচল্লিশ লক্ষ সাত হাজার টাকা, জুলাই জাদুঘরের জন্য সরকারি আর্থিক নিয়মনীতি অনুসরণ না করে অতি গোপনে সস্তায় শিল্পকর্ম ও পেইন্টিং ক্রয় করে অতি উচ্চমূল্যে ক্রয় দেখিয়ে প্রায় ৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাবেক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে একাধিকবার চেষ্টার পরও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









