নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় অন্যতম আলোচিত নাম বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। শপথ গ্রহণের পর প্রথম কর্মদিবসেই তিনি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে সিন্ডিকেট দমনের বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বিশেষ করে আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালে রাখা এখন তার জন্য প্রথম ও প্রধান অগ্নিপরীক্ষা। প্রথম দিনেই তিনি স্পষ্ট করেছেন, সস্তা বাগাড়ম্বর নয় বরং কাজের মাধ্যমেই তিনি নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করতে চান। বাজার বিশ্লেষকরা এটাকে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ‘লাইভ ট্র্যাকিং’ হিসেবে দেখছেন।
বাণিজ্যমন্ত্রীর প্রথম দিনের কার্যক্রমে একটি ইতিবাচক দিক ছিল তার আত্মোপলব্ধি। কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তিনি দ্রব্যমূল্যের উত্তাপ ও এর সামাজিক প্রভাবের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, বাজার নিয়ন্ত্রণ কেবল মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়, এটি সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত। মন্ত্রীর ভাষায়, দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেলে তার আঁচ কর্মকর্তাদের পরিবারেও লাগে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসেন এদিনকে বলেন, এই মানবিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি আশার সঞ্চার করবে, হয়তো এবার প্রশাসন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে মাঠপর্যায়ে কঠোর হবে। একই সাথে বাংলাদেশ (ক্যাব) মনে করে, রমজান ঘনিয়ে আসায় দ্রুত প্রশাসনিক বা নীতিগত সিদ্ধান্ত না নিলে বাজার নিয়ন্ত্রণে বিলম্বের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে মন্ত্রীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিনি আগে পরিস্থিতি বুঝতে চান এবং দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছেন।
মন্ত্রীর আরেকটি বড় লক্ষ্য এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়া। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতির চাপে দেশের ব্যবসায়িক সক্ষমতা ধরে রাখতে এটি একটি কৌশলগত ইতিবাচক পদক্ষেপ। মন্ত্রী এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রথম দিন থেকেই কাজ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন। বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সুসংহত করতে এই সময়সীমা বৃদ্ধি উৎপাদন ও রপ্তানি খাতের জন্য বড় স্বস্তি হতে পারে, যা পরোক্ষভাবে অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখবে।
তবে বাজার সিন্ডিকেট ইস্যুতে মন্ত্রীর কঠোর অবস্থানই এখন মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘সিন্ডিকেট নিয়ে কোনো সাউন্ড বাইট দেব না, কাজ করে দেখাব।’ এ বিষয়ে ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন এই অবস্থানটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। অতীতে অনেক মন্ত্রীই সিন্ডিকেট দমনের কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন কম দেখা গেছে। খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের এই নীরব অথচ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হওয়ার মানসিকতা যদি বাস্তবে কার্যকর হয়, তবে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের দৌরাত্ম্য কমবে বলে আশা করা যায়।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন দায়িত্বের প্রথম দিনে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি নিয়ে মন্ত্রীর ব্যাখ্যা ছিল ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কেবল বাজার তদারকি সংস্থা নয়, এর বহুবিধ আন্তর্জাতিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম রয়েছে। তার অধীনে শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকায় সামগ্রিক সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণে তার ক্ষমতা অনেক বেশি। এটি যেমন একটি ইতিবাচক দিক, তেমনি তিনটি বড় মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় করা এবং একইসাথে বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা তার জন্য এক বিশাল প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ।
ক্যাব বলছে, নতুন বাণিজ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক সদিচ্ছা এখন প্রমাণের অপেক্ষায়। প্রথম দিনে তিনি যে দর্শন উপস্থাপন করেছেন, তা যদি রমজানে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে জনমনে হতাশা বাড়বে। এলডিসি উত্তরণের লড়াই এবং অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার এই দ্বিমুখী যুদ্ধে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির কতটা সফল হন, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সরকারের পলিটিক্যাল উইল বা রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হবে তখনই, যখন বাজারের সাধারণ ক্রেতারা ন্যায্যমূল্যে পণ্য কিনতে পারবেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









