ঈদ ঘনিয়ে এলেই শহর যেন নিজেই এক ব্যস্ত মঞ্চে পরিণত হয়। যেখানে আলো, ভিড় আর রঙিন পোশাকের ভেতর লুকিয়ে থাকে ভিন্ন ভিন্ন জীবনের গল্প। ফুটপাতের অস্থায়ী দোকানে দরদাম করে কেনাকাটা করা মানুষ থেকে শুরু করে ঝলমলে শপিংমলে ব্র্যান্ড খুঁজে বেড়ানো ক্রেতা, সবাই একই উৎসবের অংশ কিন্তু অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা।
কারও জন্য ঈদ মানে সামর্থ্যের ভেতর ছোট্ট আনন্দ খোঁজা, কারও জন্য ট্রেন্ড আর স্বাচ্ছন্দ্যের সমন্বয়। এই বৈচিত্র্যময় বাস্তবতার মাঝেই জমে উঠেছে এবারের ঈদ বাজার। যেখানে কেনাবেচার হিসাবের পাশাপাশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থান, স্বপ্ন আর সীমাবদ্ধতার নিঃশব্দ গল্প। এ যেন একই শহরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে দুই রকমের পৃথিবী। সব মিলিয়ে শপিংমল থেকে ফুটপাত, ক্রেতার চাপে কোথাও দম ফেলার সময় নেই বিক্রেতাদের।
দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির তথ্যমতে, ঢাকায় সাড়ে সাত শ মার্কেটের মধ্যে দোকান রয়েছে প্রায় আড়াই লাখ। তার অর্ধেকেই পোশাকের দোকান। রমজানে এ পর্যন্ত সারা দেশে (পাইকারি ও খুচরা) পোশাকে আনুমানিক ৭০ হাজার কোটি টাকা বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় বিক্রি হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। ক্রেতা অধিকাংশ মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন আয়ের মানুষ।
রাজধানীর গুলিস্তান, নিউমার্কেট, ফার্মগেট, মৌচাক কিংবা মিরপুর, প্রতিটি এলাকার ফুটপাতেই এখন জমজমাট বেচাকেনা। দুপুরের পর থেকে রাত গভীর পর্যন্ত চলে কেনাকাটা। নিম্নআয় ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের ভিড়ই এখানে বেশি। তবে মূল্যস্ফীতির চাপে মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশও এখন এই বাজারমুখী।
ফুটপাতের দোকানগুলোতে ২০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের পোশাক। শিশুদের জামা, নারীদের থ্রি-পিস, পুরুষদের শার্ট-প্যান্ট, স্যান্ডেল—সবকিছুই সাজানো ছোট ছোট স্টলে। ক্রেতারা ধৈর্য নিয়ে একাধিক দোকান ঘুরে দাম যাচাই করছেন, দরদাম করছেন, তারপর কিনছেন প্রয়োজন অনুযায়ী। গুলিস্তানের এক ফুটপাত বিক্রেতা রহিম গাজী বলেন, “ঈদের সময়টাই আমাদের মূল ভরসা। মানুষ আসছে, কিন্তু সবাই খুব হিসাব করে কিনছে। আগে এক পরিবার পাঁচ-ছয়টা আইটেম নিত, এখন দুই-তিনটার বেশি নিচ্ছে না।”
এই বাজারেই দেখা মেলে জীবনসংগ্রামের বাস্তব গল্প। রিকশাচালক মো. রাসেল মিয়া, যিনি দুই সন্তানের জন্য কাপড় কিনতে এসেছেন, তার চোখেমুখে ক্লান্তি থাকলেও কণ্ঠে ছিল ঈদের আনন্দের এক অন্যরকম আবেগ। তিনি বলেন, “সারা মাস কষ্ট করি, ঈদের সময় বাচ্চাদের মুখে হাসি দেখার জন্য। বড় দোকানে যাওয়ার সাহস নাই। এখানে একটু কম দামে পাই, তাই এখানেই কিনি। নিজের জন্য কিছু না নিলেও চলবে, কিন্তু বাচ্চাদের যেন খুশি করতে পারি।”রাসেলের এই কথাগুলোই যেন ফুটপাতের বাজারের আসল চিত্র তুলে ধরে। যেখানে কেনাকাটা মানে শুধু পণ্য কেনা নয়, বরং সীমিত সামর্থ্যের ভেতরে আনন্দ খোঁজার চেষ্টা।
অন্যদিকে, শহরের বড় শপিংমলগুলোতেও ভিড় কম নয়। আড়ং এর বিভিন্ন আউটলেট, বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্ক, ধানমন্ডি, উত্তরা কিংবা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আউটলেটে ক্রেতাদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। এখানে উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষজন বেশি কেনাকাটা করছেন।
আধুনিক সাজসজ্জা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ এবং নতুন ফ্যাশনের সংগ্রহ, সব মিলিয়ে শপিংমলগুলোতে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। তবে এখানেও বদলে গেছে ক্রেতাদের আচরণ। অনেকে ঘুরে দেখছেন, দাম তুলনা করছেন, কিন্তু আগের মতো একসাথে অনেক কিছু কিনছেন না।
এলিফ্যান্ট রোড এলাকার দোকানি রাজিব মিয়া বলেন, ‘গত রমজানের তুলনায় এবার বেচাকেনা বেশি। বিয়ের কাস্টমার বেশির ভাগ ঢাকার বাইরের ক্রেতা। আমাদের এখানে শেরওয়ানি সেট ৩ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ক্রেতা আমেনা বেগম বলেন, গতবারের তুলনায় এবার দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে। অন্য এক ক্রেতা বলেন, আগে যে জামা কিনেছি তিন হাজার টাকায়, সেটি এখন সাড়ে চার হাজারের বেশি। তবে বিক্রেতারা বলছেন, দাম আগের মতোই। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ ও ডিজাইনের বৈচিত্র্যের কারণে মান অনুযায়ী পোশাকের দাম খানিকটা বেশি।
বসুন্ধরা সিটির একটি ব্র্যান্ড শোরুমের বিক্রয়কর্মী জানান, “ভিড় আছে, কিন্তু সবাই কিনছে না। অনেকে অফার খুঁজছে, ডিসকাউন্ট থাকলে তখনই নিচ্ছে। আগের মতো হুট করে কেনা কমে গেছে।”একই সময়ে উচ্চবিত্ত ক্রেতাদের মধ্যে ঈদ কেনাকাটা ঘিরে উচ্ছ্বাস থাকলেও সেখানে আছে এক ধরনের বাছবিচার।
ধানমন্ডি থেকে আসা এক ব্যবসায়ী বলেন, “ঈদের কেনাকাটা একটা আনন্দের বিষয়। তবে এখন আমরা কোয়ালিটির দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। কম কিনলেও ভালো জিনিস কিনছি।’’
এই দুই প্রান্তের মাঝখানে অবস্থান মধ্যবিত্ত শ্রেণির। যারা সবচেয়ে বেশি দ্বিধা আর হিসাবের মধ্যে দিয়ে ঈদের বাজারে অংশ নিচ্ছেন। কখনো ফুটপাত, কখনো শপিংমল, দুই জায়গাতেই ঘুরে দেখছেন, তুলনা করছেন, তারপর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









