রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব ও তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ এবং নিয়োগে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বে থাকা প্রায় দেড় বছরে শিক্ষক, চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে মোট ৫১৫ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যার বড় একটি অংশে দলীয় বিবেচনা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ও রাজনৈতিক পরিচয় প্রাধান্য পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।
এসব নিয়োগের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও নথিপত্র তলব করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম। ইতোমধ্যে অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় সাবেক প্রশাসনের শেষ সময়ে দেয়া দুটি নিয়োগ বাতিল করেছে বর্তমান প্রশাসন। একই সঙ্গে গত ১৮ মাসে সম্পন্ন হওয়া সব নিয়োগের তথ্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দপ্তর থেকে চাওয়া হয়েছে।
শিক্ষক, চিকিৎসক ও কর্মচারীসহ মোট ৫১৫ নিয়োগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাবেক উপাচার্যের আমলে বিভিন্ন বিভাগ ও দপ্তরে ১৯৫ জন শিক্ষক, ৩১৫ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী এবং ৫ জন চিকিৎসক নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা যাচাই ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কিনা তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে দৈনিক মজুরিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া ৩১৫ জন কর্মচারীর নিয়োগ নিয়ে বেশি আলোচনা রয়েছে। দৈনিক ৭৫০ টাকা হারে বেতনভাতা পাওয়া এসব কর্মচারীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে পদায়ন করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ‘জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ’-এর বিষয়টি সামনে এনে এই নিয়োগ দেয়া হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক আনুগত্য ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।
আত্মীয়করণ ও গোপন নিয়োগের অভিযোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল কয়েকটি সূত্রের দাবি, সাবেক উপউপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মাঈন উদ্দীন প্রথমদিকে নিজের জেলা দাগনভূঞা থেকে দুজনকে নিয়োগ দেন। নিয়োগ তালিকার শুরুতেই থাকা আবু বকর সিদ্দিক ও শাহরিয়ার তামিম নামের ওই দুজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা গেস্ট হাউজ-এ পদায়ন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে তাদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
এছাড়া, বিদায়ের আগে গত ২৮ মার্চ অনেকটা নীরবে পরিবহন দপ্তরে আরো দুজনকে নিয়োগ দেয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এ বিষয়ে সাবেক উপাচার্য ড. সালেহ হাসান নকীবের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
‘বৈষম্যবিরোধী’ পরিচয়ের আড়ালে দলীয়করণের অভিযোগ
বিগত স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সরব অবস্থানে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ড. নকীব। সেইসময়ের আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে তিনি রাজপথেও আন্দোলন করেছিলেন। পরবর্তীতে আলোচনায় আসেন ড. সালেহ হাসান নকীব। স্বৈরাচার সরকার পতনের পরে বৈষম্যরিরোধী ছাত্রনেতাদের সুপারিশে ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫তম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক।
কিন্তু দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই তিনি ছাত্রনেতাদের প্রভাববলয়ে চলে যান এবং তাদের বিভিন্ন আবদার পূরণে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন এমন অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তি ও সমর্থকদের পুনর্বাসন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
শ্বশুরকে ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক
অভিযোগের তালিকায় রয়েছে পারিবারিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়ও। দায়িত্ব নেয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর, সিন্ডিকেটের ৫৩৫তম সভায়, নিজের শ্বশুর পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. একেএম আজহারুল ইসলামকে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এ নিয়োগ নিয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। নিজের আত্নীয়কে এভাবে নিয়োগের কারণে অনেকে প্রশ্নও তুলেছেন।
স্বচ্ছতার প্রশ্ন শিক্ষকদের
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগেও অনিয়ম হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বলেন, কিছু বিভাগে নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। মেধাতালিকা চূড়ান্তকরণ থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ মতামত সব ক্ষেত্রেই অসঙ্গতির অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় ইউট্যাবের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মামুনুর রশিদ স্বজনপ্রীতির বিষয়ে বলেন, অধ্যাপক নকীব প্রশাসনের নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব লক্ষ্য করা যায়। অনেক বিভাগের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করতেও দেখেছি। নতুন প্রশাসন এসব বিষয়ে তলব করেছে। কেনো নিয়োগে অস্বচ্ছতা থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষক বলেন, আমাদের আশা ছিল স্বৈরাচার সরকার পলায়নের পর আর কোনো অনিয়ম, দূনীর্তি ও স্বজনপ্রীতি হবে না। কিন্তু আমরা বিগত নকীব প্রশাসনের বিরুদ্ধে এগুলো অনিয়মের দেখা পেয়েছি। তিনি তার শশ্বুরকেও নিয়োগ দিয়েছেন। এর চেয়ে আর স্বজনপ্রীতি কি হয়?
বর্তমান প্রশাসনের অবস্থান
সবগুলো নিয়োগ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে তথ্য চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম বলেন, গত ১৮ মাসে কোথায়, কতজন, কী প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পেয়েছেন এসব তথ্য জানা প্রয়োজন। সব বিভাগ ও দপ্তর থেকে তথ্য আসার পর বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
রাবির সাম্প্রতিক নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগ এখন বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তথ্য যাচাই ও তদন্ত শেষে প্রকৃত চিত্র সামনে এলে বিতর্কিত নিয়োগের পেছনের বাস্তবতা আরো স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









