রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেছেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং পুলিশ বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে অপরাধীদের শনাক্তের চেষ্টা করছে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মহাখালীর কড়াইল বস্তির টিএনটি খেলার মাঠে ‘দেশব্যাপী বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৬’ উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
ডিএনসিসি প্রশাসক জানান, হামলার খবর পেয়ে শুক্রবার তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তবে রাতের ঘটনায় কারা জড়িত, তা তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে পুলিশের উপকমিশনারের (ডিসি) সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে।
শফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকার এ ধরনের ঘটনা চায় না। তারাও এমন ঘটনার সমর্থন করেন না। হামলায় যে-ই জড়িত থাকুক, তাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, জায়গা বা স্থাপনা নিয়ে কোনো বিরোধ থাকলে তা আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। কোনো পক্ষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেখানে প্রবেশ করে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করেন। এরপর মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, ভ্যাকসিন, নগদ টাকা ও অন্যান্য মালপত্র লুট করে নিয়ে যান। পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে এ ভাঙচুর চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর সেখানে ওই সমিতির সাইনবোর্ডও লাগানো হয় বলে জানিয়েছে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার দাবি করেছেন, হামলা ও লুটপাটে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর আগে তিনি এক কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছিলেন। এ ঘটনায় তাঁর করা মামলাটি শাহ আলী থানায় তদন্তাধীন রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা সরকারি ইপিআই টিকা, টিকাদানের রেজিস্টার ও নথিপত্র, পরিবার পরিকল্পনার সরঞ্জাম, ওষুধ ও ভ্যাকসিনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী নিয়ে গেছে। এ ছাড়া প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নগদ, প্রায় ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, একটি জেনারেটর, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি এসি, সিসিটিভি ক্যামেরা, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র লুটের অভিযোগ করেছে কর্তৃপক্ষ।
ডা. নাসরিন আখতার জানান, সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে প্রায় ৫০ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি এলাকার দরিদ্র ও অসহায় মানুষ, নারী ও শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে। স্থানীয় হাজারো মানুষের জন্য এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রায় ১০ কাঠা জমি দখলের উদ্দেশ্যে এ হামলা চালানো হয়েছে। সেখানে বিএনপির দুটি পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি দখলের চেষ্টা করছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে একটি পক্ষ সমবায় সমিতির ব্যানারে জায়গাটি দখলে নেয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
হামলার পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হলেও সেখানে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্টরা তাঁদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।
তবে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হামলার পর স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনসহ অন্যান্য সেবা পুনরায় চালু করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
দীর্ঘ সময় ধরে স্থাপনা ভাঙার ঘটনা ঘটলেও প্রশাসন কেন তা ঠেকাতে পারেনি—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুল ইসলাম খান বলেন, তাঁর জানা মতে, সেখানে টিনশেড ও আধাপাকা ধরনের স্থাপনা ছিল। পুরোপুরি কোনো ভবন ছিল না। তবে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ক্ষতিপূরণ দিয়ে দ্রুত কার্যক্রম পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ডা. নাসরিন আখতার বলেন, এ হামলা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত নয়, বরং দরিদ্র, শিশু ও অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকারেও আঘাত। তিনি ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
এদিকে শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাতে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে উৎসুক জনতার ভিড় দেখা যায়। ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









