বাসাবাড়ি ও আশপাশের বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করলে প্রাথমিক পর্যায়েই ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ এডিস মশার বিস্তার প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে জানিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। সংস্থাটির বর্ষাকালীন এডিস মশার লার্ভা জরিপে দেখা গেছে, প্লাস্টিকের বালতি, ড্রাম, ভবনের বেজমেন্টে জমে থাকা পানি ও ফুলের টব এডিস মশার লার্ভা জন্মানোর অন্যতম উৎস।
বুধবার (৪ নভেম্বর) নগর ভবন অডিটোরিয়ামে ‘বর্ষাকালীন এডিস মশার লার্ভা জরিপ ২০২৬’-এর ফলাফল প্রকাশ ও পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। জরিপের ফলাফল তুলে ধরেন ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ডিএসসিসি এলাকায় এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বিস্তার রোধে এ জরিপ পরিচালনা করা হয়। গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১২ দিন ধরে জরিপের কাজ চলে।
সম্পূর্ণ দৈবচয়ন ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটি থেকে ৩০টি করে মোট ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি নমুনা হিসেবে নির্বাচন করা হয়। জরিপ পরিচালনায় ডিএসসিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার মোট ৩৬ জন মাঠকর্মী অংশ নেন।
জরিপে সংগৃহীত তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে আধুনিক ‘কবো টুলবক্স’ (KoboToolbox) ব্যবহার করা হয়। পরে ব্রেটো ইনডেক্স (BI), হাউস ইনডেক্স (HI), কন্টেইনার ইনডেক্স (CI) ও পিউপা ইনডেক্স (PI)-এর মাধ্যমে তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
এসব সূচকের ভিত্তিতে ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বা হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে।
জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, লার্ভার ঘনত্ব বিবেচনায় ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৯টি ওয়ার্ড অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ২৮টি মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৮টি সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ২৯টি ওয়ার্ড হলো ১, ২, ৯, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৩১, ৫৩, ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৮, ৫৯, ৬০, ৬১, ৬২, ৬৫ ও ৭১ নম্বর ওয়ার্ড।
মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ২৮টি ওয়ার্ড হলো ৪, ৫, ৬, ৮, ১০, ১৮, ২৩, ২৯, ৩০, ৩২, ৩৩, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪৩, ৪৬, ৫১, ৫২, ৫৭, ৬৪, ৬৭, ৬৮, ৬৯, ৭৩ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ড।
সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ ১৮টি ওয়ার্ড হলো ৩, ৭, ১৭, ২৮, ৩৪, ৪১, ৪২, ৪৪, ৪৫, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৬৩, ৬৬, ৭০, ৭২ ও ৭৪ নম্বর ওয়ার্ড।
জরিপে পরিদর্শন করা ২ হাজার ২৫০টি বাড়ির মধ্যে ৩২২টিতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে। বাড়ির ধরন অনুযায়ী বহুতল ভবনের ৩১ দশমিক ০৬ শতাংশ, স্বতন্ত্র বাড়ির ৩১ দশমিক ৩৭ শতাংশ, সেমিপাকা বাড়ির ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ, খালি প্লটের ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং নির্মাণাধীন বাড়ির ১৩ দশমিক ০৪ শতাংশ স্থানে লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া লার্ভার উৎস হিসেবে বিভিন্ন ধরনের পাত্র ও জমে থাকা পানির তথ্য উঠে এসেছে জরিপে। এর মধ্যে প্লাস্টিকের বালতিতে ১৪ দশমিক ২১ শতাংশ, প্লাস্টিকের ড্রামে ১১ দশমিক ২২ শতাংশ, ভবনের বেজমেন্টে জমে থাকা পানিতে ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ, প্লাস্টিকের মগে ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং ফুলের টবে ৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ লার্ভা পাওয়া গেছে।
জরিপের তথ্য তুলে ধরে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, নাগরিকেরা নিজ নিজ বাসাবাড়ির আঙিনা ও বিভিন্ন পাত্রের বিষয়ে সচেতন হলে এডিস মশার বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এ জন্য নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, বাসাবাড়ি ও কর্মস্থলের আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং সপ্তাহে অন্তত এক দিন জমে থাকা পানি অপসারণের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমের মাধ্যমে সঠিক তথ্য ও সচেতনতামূলক বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে সংবাদকর্মীদের সহযোগিতা প্রয়োজন। নাগরিক সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ডেঙ্গুমুক্ত, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর ঢাকা গড়ে তোলা সম্ভব।
জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ মশক নিধন অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান প্রশাসক। তিনি আরো জানান, প্রতি শনিবার ডিএসসিসির নিয়মিত ‘ক্লিনিং ডে’ কর্মসূচির আওতায় শিশুদের ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকে সুরক্ষায় সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনা ও শৌচাগার পরিষ্কারের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান, সচিব মো. মশিউর রহমান খান, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমানসহ করপোরেশনের বিভাগীয় ও আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









