যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির জয়ের পর বিশ্বজুড়ে সরকারপ্রধান, রাজনীতিক ও বিভিন্ন দেশের নেতারা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাদের কেউ এই ফলকে মার্কিন ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের শক্তিশালী বার্তা হিসেবে দেখছেন। কেউ মনে করছেন, এর প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার ও ইউক্রেন যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়কে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, মার্কিন জনগণ এমন নীতির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন, যেগুলো সাধারণ মানুষকে আরও দরিদ্র করে। তারা ঘৃণা, নারী বিদ্বেষ, জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকার এবং অভিজাতদের বিশেষ সুবিধার বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন। ব্রাজিলের পর যুক্তরাষ্ট্রেও এমন পরিবর্তন দেখা গেল। শিগগিরই স্পেনেও এমন পরিবর্তন আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরে রয়টার্সকে বলেন, এই নির্বাচনের ফল মার্কিন ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী বার্তা। তার মতে, জলবায়ু, পরিবেশ, পররাষ্ট্রনীতি ও উন্নয়ন সহায়তার মতো বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এখন এমন কিছু কণ্ঠস্বর সামনে আসছে, যাদের অবস্থান বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও প্রশাসনের তুলনায় ইউরোপের কাছাকাছি।
তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা সব সময় দলনিরপেক্ষতা, পারস্পরিক সুসম্পর্ক এবং সক্রিয় যোগাযোগের নীতি অনুসরণ করে আসছে। নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে চায় তাইওয়ান।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা বলেছেন, এই নির্বাচনের ফল বিশ্বসম্পর্কে নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। তার ভাষ্য, ডেমোক্র্যাটরা সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে মার্কিন জনগণ তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টেল শালদেমোজে মনে করেন, এই ফল ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন, সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তর এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আরও শক্তিশালী ও স্বনির্ভর হওয়ার পথে এগিয়ে যেতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গ্রিসের সরকারের মুখপাত্র পাভলোস মারিনাকিস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গ্রিসের সম্পর্ক আগের মতোই শক্তিশালী থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৌশলগত মিত্র। তাই নির্বাচনের ফলের কারণে বড় কোনো প্রকল্প বা চুক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কমিটিতে গ্রিসের সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে—এমন ব্যক্তিরা দায়িত্ব পেতে পারেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ বলেন, নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলের জন্য অপেক্ষা করা উচিত। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বের অবস্থান বরাবরই নেতিবাচক। তবে ইউক্রেন ও পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে রাশিয়ার অবস্থান অন্য দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না।
অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। তিনি আশা করেন, ট্রাম্প শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন। ইউক্রেন নিয়ে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার নতুন একটি পর্বও শিগগির অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
জাপানের মুখ্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিনোরু কিহারা বলেছেন, নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, জাপানের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতির মূল ভিত্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোট। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে ওঠায় দুই দেশের শক্তিশালী সম্পর্ক আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেসক্যুর বলেছেন, নির্বাচনের ফলের পর ট্রাম্পকে নিজের অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে জ্বালানির দাম মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কিছুটা সংযত করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জার্মানির কট্টর ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানির সহনেতা অ্যালিস ভাইডেল বলেছেন, ট্রাম্প তার ভোটারদের সামরিক হস্তক্ষেপনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করায় রিপাবলিকানদের এখন মূল্য দিতে হচ্ছে।

চেক প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ বাবিশ বলেছেন, ফলাফল অনেকটা প্রত্যাশিত হলেও ডেমোক্র্যাটদের জয় বড় ঘটনা। এমনকি রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাসেও তারা সাফল্য পেয়েছেন। তার ধারণা, ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি সময় অভিশংসন ও ভেটো নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন বাড়তে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, মার্কিন জনগণ যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান জানিয়েছেন। ইরান এই বার্তাকে সমর্থন করে। তবে মার্কিন সরকার যদি জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে অন্য দেশের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে, তাহলে তার পরিণতি ভালো হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
নির্বাচনের ফল নিয়ে মন্তব্য করেছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কও। এক্সে ব্যঙ্গাত্মক এক পোস্টে তিনি লেখেন, নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের জন্য তার ‘মহাকাশের লেজার’ ব্যবহারের চেষ্টা এবার বোধ হয় কাজে আসেনি।
বেলজিয়ামের প্রতিরক্ষামন্ত্রী থিও ফ্রাঙ্কেন মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও মেরুকরণের কারণে আগামী বছরগুলোতে দেশটির সরকার পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ইউরোপের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি বাণিজ্যনীতি, ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন এবং ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কমিটির প্রধান বের্ন্ড লাঙ্গে এই ফলকে ট্রাম্প ও তার নীতির জন্য বড় ধাক্কা এবং মার্কিন গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ বিজয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, দুর্বল হয়ে পড়া ট্রাম্প আরও আক্রমণাত্মক ও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য এই ফল যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে, তেমনি সতর্ক হওয়ার বার্তাও দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ইউরোপকে আরও সক্ষম হতে হবে।
ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী বিরোধী দল ন্যাশনাল র্যালির নেতা জর্ডান বারদেলা বলেছেন, নির্বাচনের ফলকে সম্মান জানানো উচিত। তবে ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা শুধু মার্কিন অর্থনীতিতেই নয়, ইউরোপের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সঙ্গে এই পরিস্থিতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
জার্মানির বামপন্থী দলের সহনেতা ইনে শভের্ডনার এই ফলকে বিশ্বজুড়ে ডানপন্থী রাজনীতির বড় পরাজয় হিসেবে অভিহিত করেছেন।
অন্যদিকে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে মার্কিন জনগণ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তারা বিভাজনের বদলে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে—এমন রাজনীতি চান। একই সঙ্গে দৈনন্দিন সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে পারবেন, এমন নেতৃত্বের প্রত্যাশা তাদের। আগামী দুই বছর ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় থাকলেও পরিবর্তনের জন্য কাজ করা এবং ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোমানিয়ার বিরোধী কট্টর ডানপন্থী জোটের নেতা দান দুঙ্গাচিউ মনে করেন, নির্বাচনে হারের কারণে ট্রাম্প স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়বেন না। তবে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেসের পরিবর্তে এখন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে আরও বেশি টানাপোড়েন তৈরি হবে। তার মতে, পররাষ্ট্রনীতি ও ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে খুব বড় পার্থক্য হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
ইতালির ক্ষমতাসীন জোটের অংশ কট্টর ডানপন্থী লিগ পার্টির নেতা মাত্তেও সালভিনি বলেছেন, গণতন্ত্রে জনগণের ভোটকে সম্মান জানানো জরুরি। তার মতে, যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক উত্তেজনা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করেছে। তিনি আশা করেন, এই ফল সংঘাতের অবসান এবং বিশ্বে শান্তি ফেরানোর পথ ত্বরান্বিত করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলকে বিভিন্ন দেশের নেতারা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন। কেউ এটিকে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে জনমত হিসেবে দেখছেন, কেউ আবার যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্যে পরিবর্তনের আভাস পাচ্ছেন। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ইউক্রেন যুদ্ধ, নিরাপত্তা ও জ্বালানির বাজারে এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনে মার্কিন প্রশাসন ও কংগ্রেসের সম্পর্কের ওপর।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









