আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ বিভিন্ন রুটে ঘরমুখো মানুষের চাপ সামাল দিতে নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় চলছে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। দেশের বৃহত্তম ও ঐতিহ্যবাহী এই রেল কারখানায় বর্তমানে মেরামত করা হচ্ছে ১২৭টি যাত্রীবাহী কোচ। সীমিত জনবল, কাঁচামাল সংকট ও বাজেট ঘাটতির মধ্যেও দিন-রাত কাজ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোচগুলো প্রস্তুত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিক ও প্রকৌশলীরা।
মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল থেকে কারখানার বিভিন্ন শপ ঘুরে দেখা যায়, কোথাও কোচের ভারী মেরামত, কোথাও ওয়েল্ডিং, কোথাও আবার রঙের কাজ চলছে। পুরো কারখানাজুড়ে যেন ঈদযাত্রা কেন্দ্রিক এক কর্মচাঞ্চল্য বিরাজ করছে। শ্রমিকদের কারও হাতে গ্যাস কাটার, কেউ ব্যস্ত বগির যন্ত্রাংশ খুলতে, আবার কেউ শেষ মুহূর্তের রঙের তুলিতে নতুন রূপ দিচ্ছেন কোচগুলোকে।
কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ সামাল দিতে আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে বাড়তি কোচ সংযোজন করা হবে। একই সঙ্গে চালানো হবে বিশেষ ঈদ স্পেশাল ট্রেন। এসব ট্রেনের জন্য প্রয়োজনীয় কোচ প্রস্তুত করতেই বর্তমানে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কারখানার ক্যারেজ শপে গিয়ে দেখা যায়, ব্রডগেজ লাইনের কোচগুলো ভারী মেরামতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বগির কাঠামো, ছাদ, দরজা, জানালা, ব্রেকিং সিস্টেম, বৈদ্যুতিক সংযোগসহ বিভিন্ন অংশ নতুন করে সংস্কার করা হচ্ছে। পাশের বগি শপ থেকে আনা হচ্ছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও কাঠামো। এরপর সুপার স্ট্রাকচার তৈরি করে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ কোচে রূপ দেওয়া হচ্ছে।
ক্যারেজ শপের ইনচার্জ ও উর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসএসএই) মমিনুল ইসলাম জানান, জনবল সংকটের মধ্যেও তাদের নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে হচ্ছে। প্রতিদিন অন্তত তিন ইউনিট কোচ মেরামতের চাপ থাকে। ঈদ সামনে আসায় সেই চাপ এখন আরও বেড়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে ১২৭টি কোচ মেরামতের কাজ চলছে। এর মধ্যে গত সোমবার পর্যন্ত ১১১টি কোচের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কোচগুলো আগামী ২৪ মে’র মধ্যে ট্রাফিক বিভাগে হস্তান্তর করা হবে।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিক সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করতেও বেগ পেতে হয়। তারপরও যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
কারখানার শিডিউল শাখার ইনচার্জ রুহুল আমিন রুবেল জানান, ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে রেলওয়ে কারখানার প্রতিটি শপে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টায় কাজ চলছে। শ্রমিক-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। প্রয়োজনে রাত পর্যন্ত ওভারটাইম করানো হচ্ছে। তিনি বলেন, রেলের যাত্রীসেবা নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। জনবল ও মালামালের সংকট থাকলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোচ সরবরাহ দিতে সবাই আন্তরিকভাবে কাজ করছেন।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ১৮৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাটি দেশের সবচেয়ে বড় রেল মেরামত কারখানা হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১১০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই শিল্প স্থাপনাটিতে রয়েছে ২৯টি উপ-কারখানা বা শপ। একসময় এখানে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনবল কমতে কমতে এখন চরম সংকটে পৌঁছেছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে অনুমোদিত ২ হাজার ৮৫৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৬৬৪ জন শ্রমিক-কর্মচারী। অর্থাৎ মাত্র ২৩ শতাংশ জনবল দিয়ে বিশাল এই কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করা গেলে কারখানাটির সক্ষমতা আরও বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
এদিকে কারখানার পেইন্ট শপেও দেখা গেছে ব্যস্ততা। মেরামত শেষ হওয়া কোচগুলোতে শেষ মুহূর্তের রঙের প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে। নতুন রঙে সাজানো কোচগুলো ঈদের আগে বিভিন্ন রুটে যুক্ত করা হবে। এতে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সুফী নূর মোহাম্মদ বলেন, সীমাবদ্ধতা থাকলেও শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। ঈদ উপলক্ষে বিশাল একটি টার্গেট নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছিলাম। এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক। আশা করছি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব কোচ হস্তান্তরর করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, রেলপথ দেশের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যোগাযোগ মাধ্যম। ঈদে মানুষ যেন স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে পারে, সে লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করছি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









