আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কুষ্টিয়ায় জমে উঠতে শুরু করেছে চামড়া ব্যবসা। জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, আড়ত ও সংগ্রহকেন্দ্রে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ব্যবসায়ীরা লবণ মজুত, গুদাম সংস্কার, শ্রমিক নিয়োগ এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করে ঈদের দিন থেকেই পশুর চামড়া সংগ্রহে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিয়েছেন। তবে বাহ্যিক প্রস্তুতির আড়ালে চামড়া শিল্পের দীর্ঘদিনের সংকট, বাজার অস্থিরতা এবং লাম্পি স্কিন ডিজিজ নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থকরী খাত হিসেবে পরিচিত চামড়া শিল্প একসময় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া, ট্যানারি শিল্পে অব্যবস্থাপনা, কাঁচা চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং সময়মতো অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় এ খাতে স্থবিরতা নেমে এসেছে। কুষ্টিয়ার ব্যবসায়ীরাও এর বাইরে নন।
জেলার চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, কোরবানির ঈদকে ঘিরে বছরে সবচেয়ে বড় ব্যবসার সুযোগ তৈরি হলেও পর্যাপ্ত সরকারি তদারকি ও সমন্বয়ের অভাবে তারা নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। বিশেষ করে ট্যানারি মালিকদের বকেয়া অর্থ পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি করেছে।
চামড়া ব্যবসায়ী সাদিকুল হক বলেন, “সারা বিশ্বে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, চামড়ার ব্যবহার কমে যাওয়া এবং আমাদের আন্তরিকতার অভাবে শিল্পটি সংকটে পড়েছে। নতুন সরকারের সদিচ্ছা ও কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এই শিল্পের পুনরুজ্জীবন সম্ভব।”
তিনি আরও বলেন, “সময়মতো ট্যানারি মালিকদের অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত না হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ব্যবসা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।” একসময় চামড়া ব্যবসার জন্য পরিচিত কুষ্টিয়ার বাবর আলী গেইট এলাকায় এখন আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য নেই বলেও জানান তিনি।
এদিকে এবার চামড়া ব্যবসায় সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে গবাদিপশুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ। এই রোগে আক্রান্ত পশুর চামড়ায় ক্ষত ও দাগ সৃষ্টি হওয়ায় বাজারমূল্য মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে ব্যবসায়ীরাও চামড়া কিনে লোকসানের আশঙ্কায় পড়ছেন।
চামড়া ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম রাজু বলেন, “এক লাখ টাকার গরুর চামড়া লাম্পির কারণে ৫০ থেকে ১০০ টাকায় নেমে আসছে। এতে বিক্রেতাদের সঙ্গে প্রায়ই তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, “অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ চামড়ার প্রকৃত অবস্থা না বুঝে বেশি দাম দাবি করছেন। কিন্তু লাম্পিতে আক্রান্ত চামড়া ট্যানারিতে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলায় ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের লোকসান গুনতে হচ্ছে।”
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ রোকনুজ্জামান বলেন, “লাম্পি স্কিন ডিজিজ একটি ছোঁয়াচে রোগ হলেও সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক কাজ করছে। ইতোমধ্যে জেলার প্রায় ৫০ হাজার গবাদিপশুকে বিনামূল্যে টিকা দেওয়া হয়েছে এবং আক্রান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রাণিসম্পদ বিভাগ মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। খামারিদের সচেতন করা হচ্ছে এবং দ্রুত রোগ নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। আশা করছি ঈদের আগেই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে।”
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবার কুষ্টিয়ায় প্রায় দুই লাখ গবাদিপশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় খামারগুলো থেকেই অধিকাংশ পশুর জোগান আসছে। সরকার নির্ধারিত দামে মফস্বলে গরুর কাঁচা চামড়া প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা এবং লবণযুক্ত চামড়া ১৮ থেকে ২২ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে এবার পর্যাপ্ত লবণ মজুত রাখা হয়েছে। জেলার বিভিন্ন আড়তে ইতোমধ্যে অস্থায়ী সংরক্ষণাগার প্রস্তুত করা হয়েছে। পাশাপাশি ঈদের পরপরই যাতে চামড়া নষ্ট না হয় সে জন্য শ্রমিকদের বিশেষ প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে হলে শুধু ঈদ কেন্দ্রিক উদ্যোগ নয়, সারা বছরব্যাপী কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন। ট্যানারি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, দ্রুত অর্থ পরিশোধ, আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ এবং সরকারি কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করা গেলে দেশের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
ব্যবসায়ীদের আশা, এবার যদি বাজার স্থিতিশীল থাকে এবং সরকার কার্যকরভাবে নজরদারি করে, তাহলে দীর্ঘদিনের লোকসান কাটিয়ে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরবে কুষ্টিয়ার চামড়া ব্যবসায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









