দশমিনা উপজেলার হাজিরহাটে এখন প্রতিটি দিন কাটছে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর কান্নায়। ভয়াবহ নদীভাঙনে একের পর এক বিলীন হচ্ছে নদীপাড়ের মাটি। হুমকির মুখে পড়েছে বাজার, বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও ধর্মীয় স্থাপনা। নদীর ভয়াল থাবায় পুরো হাজিরহাট যেন ধীরে ধীরে অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে।
শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর পাড়ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মসজিদের নিচের অংশ ধসে পড়েছে। ভবনের ভিত্তির নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ায় পুরো মসজিদ এখন চরম ঝুঁকির মুখে। নদীর উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে দেয়ালের গায়ে। মুসল্লিদের চোখেমুখে আতঙ্ক,যেকোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে আল্লাহর ঘরটিও।শুধু মসজিদই নয়, মসজিদটির দক্ষিণ পাশে রয়েছে একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমিউনিটি ক্লিনিক, যেখানে প্রতিদিন শত শত মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। নদীভাঙনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় এখন সেই ক্লিনিকটিও হুমকির মুখে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটিও নদীর স্রোতের কাছে হার মানতে পারে।
এছাড়াও নদীভাঙন কবলিত মসজিদ থেকে প্রায় সাড়ে ৪০০ ফুট দূরত্বে রয়েছে একটি হাই স্কুল ও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী সেখানে পাঠ গ্রহণ করে। কিন্তু ভয়াবহ নদীভাঙন ধীরে ধীরে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দিকেও এগিয়ে আসছে। ফলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দুটিও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
মসজিদ ও আশপাশের এলাকা রক্ষায় স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে নদীর পাড়ে বালুর বস্তা ফেলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু ভয়াল নদীর স্রোতের কাছে সেই চেষ্টাও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। নদীর পানিতে তলিয়ে গেছে প্রায় ৩০ লাখ টাকার বালুর বস্তা ও অস্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এলাকাবাসীর ভাষায়, চোখের সামনে সবকিছু ভেঙে যেতে দেখেও আমরা অসহায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও কার্যকর নদীশাসনের দাবি জানানো হলেও বাস্তবসম্মত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতি বছরই নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এবার সেই ভাঙন এসে আঘাত হেনেছে হাজিরহাটের প্রাণকেন্দ্রে।
নদীভাঙনের ভয়াবহ চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। পরে চলতি মাসের শুক্রবার (৮ মে) ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শনে যান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক। এ সময় তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ক্ষয়ক্ষতির খোঁজখবর নেন এবং পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ উদ্বোধন করেন।
পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বলেন, হাজিরহাট এলাকার নদীভাঙনের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর আমাদের নজরে আসে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। তাদের নির্দেশনায় দ্রুত মাঠপর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আজ থেকেই এখানে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন,শুধু অস্থায়ী ব্যবস্থা নয়, ভবিষ্যতে স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে এই এলাকার মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ না হলে হাজিরহাট বাজার, মসজিদ, কমিউনিটি ক্লিনিক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ শত শত পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। নদীর প্রতিটি ঢেউ যেন এখন হাজিরহাটবাসীর বুকের ভেতর নতুন করে ভয়, কান্না আর অনিশ্চয়তার জন্ম দিচ্ছে।
এবিষয় পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) মোঃ রাকিব জানান, দশমিনার হাজিরহাট মসজিদ রক্ষায় ইতোমধ্যে জিওব্যাগে বালু ফেলে নদীভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলমান রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, এ কার্যক্রম সম্পন্ন হলে ওই এলাকার ভাঙন অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, নদীটি প্রশস্ত হওয়ায় কাজ বাস্তবায়নে কিছুটা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ টাকার বরাদ্দে কাজ চলছে। প্রয়োজনে পরবর্তীতে আরও বাজেট বরাদ্দের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









