দিনের বেলায় ব্যস্ত যানবাহনের চাপ, আর রাত নামলেই যেন আতঙ্কের আরেক নাম- ফকির মজনু শাহ সেতু। গাজীপুরের কাপাসিয়ার মানুষের গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগপথটি এখন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে ঝুঁকির সেতুতে।
এ নিয়ে স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন-যে সেতু পার হতে মানুষকে প্রতিদিন টাকা দিতে হয়, সেই সেতুর ন্যূনতম নিরাপত্তাও কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না?
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেতুর দুই পাশের অধিকাংশ সড়কবাতিই অচল। কোথাও বাতি নেই, কোথাও বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন, আবার কিছু খুঁটির তার বিপজ্জনকভাবে ঝুলে আছে। সন্ধ্যার পর পুরো সেতু ডুবে যায় আধো অন্ধকারে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন মোটরসাইকেল চালক, অটোরিকশাচালক ও পথচারীরা।
রাতের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে মোটরসাইকেল চালক রাকিব হোসেন বলেন, বেশিরভাগ বাতি নষ্ট থাকায় সামনে কী আছে বোঝা যায় না। বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
একই শঙ্কার কথা জানিয়ে অটোরিকশাচালক আব্দুল কাদের বলেন, রাতে যাত্রী নিয়ে পার হওয়ার সময় ওয়াকওয়ের পাশে কেউ দাঁড়িয়ে থাকলেও দূর থেকে দেখা যায় না। ফলে সবসময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তাড়া করে।
শুধু আলোকসজ্জা নয়, সেতুর ওয়াকওয়েও এখন বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ঢাকনা সরে গিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর গর্ত। স্থানীয়দের ভাষ্য, অন্তত এক ডজনের বেশি স্থানে এমন ঝুঁকি রয়েছে। অন্ধকারে এসব গর্ত চোখে না পড়ায় যে কেউ দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন।
পথচারী সোহেল রানা বলেন, “রাতে হাঁটার সময় খুব ভয় লাগে। আলো না থাকায় গর্ত বোঝা যায় না। শিশু বা বয়স্ক কেউ পড়ে গেলে বড় দুর্ঘটনা হতে পারে।”
সেতুর স্টিলের সংযোগস্থলগুলোতেও দেখা দিয়েছে ক্ষয় ও অসমতা। কোথাও উঁচু, কোথাও ভাঙাচোরা। ভারী যানবাহন চলাচলের সময় প্রবল ঝাঁকুনি অনুভূত হয়। এতে একদিকে যানবাহনের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে সেতুর স্থায়িত্ব নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাসচালক হানিফ মিয়া বলেন, “স্টিলের জয়েন্টগুলো অনেক জায়গায় নষ্ট হয়ে গেছে। গাড়ি উঠলেই ঝাঁকুনি লাগে। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে সেতুর জন্যও ঝুঁকি বাড়বে।”
এ বিষয়ে টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স প্রাপ্তি কনস্ট্রাকশনের প্রতিনিধিরা জানান, সেতুর আলোকসজ্জা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাদের আওতায় পড়ে না। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে বলে তারা দাবি করেন।
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে রাজনৈতিক মহলেও। স্থানীয় সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আইয়ূবি ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে এই সেতুর টোল আদায় বন্ধের দাবি তুলেছেন। তার মতে, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এভাবে টোল নেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়।
গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ বলেন, “সেতু থেকে আদায়কৃত টোল সরকারি কোষাগারে জমা হয়। টোল বন্ধ বা চালু রাখার সিদ্ধান্ত সরকারের। খুব দ্রুত সেতুটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়-এবার দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন। দ্রুত অচল বাতি সচল করা, ঝুঁকিপূর্ণ ওয়াকওয়ে সংস্কার, স্টিল জয়েন্ট মেরামত এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি টোলের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে সে বিষয়েও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, স্থানীয়দের ভাষায়- “যে সেতু মানুষের জীবন বহন করে, সেটিকে এভাবে অবহেলার অন্ধকারে ফেলে রাখা যায় না।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









