কুষ্টিয়া জেলায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা হামের প্রাদুর্ভাব অবশেষে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। সরকারি সমন্বিত প্রতিবেদন এবং জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে।
দীর্ঘদিনের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও আতঙ্ক কাটিয়ে স্বস্তিতে ফিরছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশেষ করে শিশুদের অভিভাবকেরা। গত ২৪ ঘণ্টায় পুরো জেলায় নতুন করে কোনো নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়নি, যা এই প্রাদুর্ভাবের সমাপ্তির স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) খুলনা বিভাগীয় কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে জেলায় মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১,৫৩৬ জনে। তবে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক তথ্য হলো, চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে ইতোমধ্যে ১,৪৬৯ জন রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার মাধ্যমে ‘নিশ্চিত হাম রোগী’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন মাত্র ৩ জন, যাদের প্রত্যেকেই বর্তমানে সুস্থ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্য মতে, গত ২৪ ঘণ্টায় কুষ্টিয়া জেলার কোনো উপজেলা বা বিশেষায়িত হাসপাতালে নতুন কোনো নিশ্চিত কেস পাওয়া যায়নি। জেলাজুড়ে বর্তমানে সামগ্রিক সুস্থতার হার ৯৫.৬ শতাংশের ওপরে।
সরকারি নথিতে প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ১২ জন সন্দেহভাজন রোগীর মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হলেও, ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, নিশ্চিত হামের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা প্রকৃতপক্ষে শূন্য। এটি স্থানীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার দ্রুত সাড়া প্রদানের এক বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বুধবার(২৭ মে) স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো থেকে সংগৃহীত মাঠ পর্যায়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বর্তমানে কুষ্টিয়া জেলার অধিকাংশ উপজেলাই এখন হাম মুক্ত। নতুন যে ১৩ জন সন্দেহভাজন রোগী গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে এসেছেন, তারা মূলত কুষ্টিয়া সদর ও আশেপাশের এলাকার। উন্নত চিকিৎসার স্বার্থে তাদের বড় হাসপাতালগুলোতে পাঠানো হয়েছে।
প্রাপ্ত উপাত্ত অনুযায়ী, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে সর্বমোট ৪০ জন এবং ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ১১ জন চিকিৎসাধীন বা পর্যবেক্ষণে আছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় এই দুই প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে যথাক্রমে ৬ জন ও ৫ জন রোগীকে সুস্থ ঘোষণা করে ছুটি দেওয়া হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খোকসা, কুমারখালী, মিরপুর, ভেড়ামারা এবং দৌলতপুর উপজেলার স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো এখন প্রায় সম্পূর্ণ রোগী শূন্য। খোকসা এবং দৌলতপুরে মাত্র ২ জন করে রোগী পর্যবেক্ষণে আছেন, যাদের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কামুক্ত বলে নিশ্চিত করেছেন কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা।
কুষ্টিয়া শহরের এক আবাসিক এলাকার বাসিন্দা এবং এক সন্তানের জননী মরিয়ম বেগম জানান, গত দুই সপ্তাহ ধরে বাচ্চাদের ঘরের বাইরে পাঠাতে ভয় পাচ্ছিলাম। চারদিকে হামের যে খবর শুনছিলাম, তাতে খুব উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটছিল। এখন হাসপাতালগুলোতে রোগী কমে যাওয়া এবং নতুন কেউ আক্রান্ত না হওয়ার খবর শুনে সত্যি বুক থেকে মস্ত বড় একটা পাথর নেমে গেল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে বায়ুবাহিত রোগ হলেও সঠিক সময়ে টিকাদান এবং আক্রান্তদের আইসোলেশন (পৃথকীকরণ) নিশ্চিত করার মাধ্যমে একে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কুষ্টিয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগের বিশেষ টিম গঠন, মাঠ পর্যায়ে টিকাদান ক্যাম্পেইন জোরদার এবং সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণের কারণে ভাইরাসের সংক্রমণের চেইনটি ভাঙা সম্ভব হয়েছে।
যদিও প্রাদুর্ভাবের গ্রাফ এখন নিম্নমুখী, তবুও আত্মতুষ্টিতে না ভুগে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ এবং এমআর টিকার নিয়মিত সেশনগুলো আরও নিখুঁতভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে যাতে কোনো শিশু বাদ না পড়ে।
]চিকিৎসকেরা অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, যদি কোনো শিশুর শরীরে তীব্র জ্বর, সর্দি-কাশি এবং লালচে দানা বা র্যাশ দেখা দেয়, তবে অবহেলা না করে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে। সঠিক পুষ্টি, পর্যাপ্ত তরল খাবার এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে হাম পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









