বরিশাল নগরীর পোর্ট রোড এলাকা। আর দশটা দিনের চেয়ে আজকের চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। চারদিকে থরে থরে সাজানো কোরবানির গরুর মাংস। তবে এই মাংসের যোগানদাতা কোনো খামারি বা বড় ব্যবসায়ী নন; এর পেছনে রয়েছে নগরীর শত শত সুবিধাবঞ্চিত ও ভিক্ষুক শ্রেণির মানুষের দিনভরের ক্লান্তিহীন মেহনত।
পবিত্র ঈদুল আজহার দিনে বরিশাল নগরীতে জমে উঠেছে সংগৃহীত কোরবানির মাংসের এক ব্যতিক্রমী বাজার। নগরীর বিভিন্ন বাসাবাড়ি ঘুরে দুস্থ ও ভিক্ষুকদের সংগ্রহ করা বাড়তি মাংসই এখন বিক্রি হচ্ছে এই বাজারে। সাধারণ বাজারের চেয়ে কিছুটা কম দামে, অর্থাৎ ৮৫০ টাকা কেজি দরে এই মাংস অনায়াসেই কিনে নিতে পারছেন নিম্নআয়ের মানুষ।
পোর্ট রোডের অস্থায়ী মাংস ব্যবসায়ী আলতাফ মাহমুদ বলেন, ‘‘সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ভিক্ষুক ও দুস্থরা যে মাংস সংগ্রহ করেছেন, তা তারা আমাদের কাছে বিক্রি করতে এসেছেন। আমরা মানভেদে তাদের কাছ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে মাংস কিনে নিচ্ছি। আর সামান্য লাভে সেই মাংস সাধারণ ক্রেতাদের কাছে ৮৫০ টাকা দরে বিক্রি করছি।’’
আরেক ব্যবসায়ী সুলতান মৃধা জানান, দুপুরের পর থেকে বিকেল পর্যন্ত তিনি প্রায় ২৫ কেজি মাংস কিনেছেন, যার মধ্যে ১৫ কেজিই বিক্রি হয়ে গেছে।
রসূলপুর এলাকার বাসিন্দা জাহানারা খাতুন পেশায় একজন ভিক্ষুক। দিনভর শহর ঘুরে প্রায় ৫ কেজি মাংস সংগ্রহ করেছেন তিনি। জাহানারা বলেন, ‘‘আমার বাসায় আমি আর আমার স্বামী ছাড়া খাওয়ার কেউ নেই। এত মাংস রাইখা কী করমু? তাই নিজেদের রান্ধনের (রান্নার) জন্য ২ কেজি রেখে বাকি মাংস ৭৫০ টাকা কেজি দরে বেঁচে দিছি। ঈদের দিনে নগদ কিছু টেকা হাতে আইলো, অন্য খরচ চলবো।’’
একইভাবে কেডিসি বস্তির বাসিন্দা কুলসুম আরা বেগম তার মেয়েকে নিয়ে সকাল থেকে ঘুরে ৮-১০ কেজি মাংস পেয়েছেন। নিজেদের জন্য কিছু রেখে বাকিটা ৭৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে মুখে হাসি নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন তিনি।
মৌসুমি ব্যবসায়ী রুবায়োত হোসেন জানান, এটি তাদের বহু বছরের চেনা ব্যবসা। তিনি বলেন, “শত শত অভাবী মানুষ তাদের প্রয়োজনের বাড়তি মাংসটুকু এখানে বিক্রি করতে আসেন। আমি নিজেই প্রায় ৪০ কেজির মতো মাংস কিনেছি। রাত যত বাড়বে, এই বাজারে লোকজনের ভিড় তত বাড়বে।”
পশু কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় পোর্ট রোডের এই বাজারে ভিড় জমিয়েছেন খলিল হোসেনের মতো বহু নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া মানুষ। পেশায় দিনমজুর খলিল হোসেন এক কেজি মাংস কিনে পরম তৃপ্তিতে বলছিলেন, ‘‘কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য তো নাই। পোলাপানরা ঈদের দিন একটু মাংস খাইতে চায়। বাজারে তো মাংসের দাম এক হাজার টাকার কাছাকাছি। এখান থেকে বেছে বেছে একটু কম দামে (৮৫০ টাকা) এক কেজি মাংস কিনলাম। এখন বাসায় গিয়ে স্ত্রীকে বলব রান্না করতে।’’
খলিল হোসেনের মতো শত শত সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ঈদের আনন্দ পূর্ণ হচ্ছে পোর্ট রোডের এই ব্যতিক্রমী বাজারের কল্যাণে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঈদের দিন রাতের এই বিশেষ বাজারে কেনাবেচার এই ধুমধাম চলে রাত ১০টা পর্যন্ত।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









