হরিলাল বাসফোর ধর্মে সনাতনী হরিজন। তবু কোরবানির ঈদের দিন পরিবার নিয়ে সকাল থেকেই বেরিয়েছিলেন কোরবানির মাংস সংগ্রহে। দিনভর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে সন্ধ্যা নাগাদ প্রায় সাড়ে পাঁচ কেজি গরুর মাংস সংগ্রহ করেন তিনি। পরে সেই মাংস বিক্রি করে পান প্রায় ৩ হাজার টাকা।
শুধু হরিলালই নন, সৈয়দপুরের হরিজন সম্প্রদায়ের আরও অনেক মানুষ কোরবানির মাংস সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে ঈদকে ঘিরে বাড়তি আয়ের চেষ্টা করেছেন। আবার কোরবানির ঈদে যাদের সামর্থ্য নেই পশু কোরবানি দেওয়ার, তাদের অনেকেই পরিবারের মুখে কোরবানির মাংস তুলে দিতে ভরসা করেন দানে পাওয়া এসব মাংসের ওপর।
আবার কেউ কেউ লোকলজ্জার কারণে কারও কাছে মাংস চাইতে পারেন না। এমন মানুষের জন্য নীলফামারীর সৈয়দপুরে প্রতি বছরই গড়ে ওঠে এক ব্যতিক্রমী অস্থায়ী মাংসের হাট।
সৈয়দপুর থানার সামনে থেকে ছোট রেলঘুন্টি হয়ে বড় রেলঘুন্টি পর্যন্ত রেললাইনের ধারে বসে এই ভ্রাম্যমাণ বাজার। এখানে একদিকে যেমন দানে পাওয়া অতিরিক্ত মাংস বিক্রি করতে আসেন নিম্নআয়ের মানুষ, অন্যদিকে বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে মাংস কিনতে ভিড় করেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা।
সরেজমিনে ঈদের দিন বিকেলে ছোট রেলঘুন্টি থেকে বড় রেলঘুন্টি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অনেকে ব্যা করে আনছেন মাংস আবার সেই মাংস কিনতে কেউ কেউ করছেন কাড়াকাড়ি। রেললাইনের দুই পাশে এভাবে ধাপে ধাপে বসেছে মাংস কেনাবেচার জমজমাট হাট। ঈদের তিন দিন পর্যন্ত এ বাজার চললেও সবচেয়ে বেশি ভিড় থাকে প্রথম দিনেই।
সৈয়দপুরের পাশের এলাকা বেলাইচন্ডি থেকে আসা সিরাজ উদ্দিন (৪৮) জানান, তার কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য নেই। আবার কারও কাছে হাত পেতে মাংস সংগ্রহ করতেও সংকোচ বোধ করেন। তাই পরিবারের জন্য মাংস কিনতে তিনি এসেছেন এই বাজারে। প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা দরে দুই কেজি মাংস কিনে বাড়ি ফিরেছেন তিনি। সিরাজের মতো আরও অনেকে এসেছেন মাংস কিনতে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সালমা বেগম, দিনমজুর খুরশিদ আলম, রিকশাচালক শরিফ উদ্দিন ও রেয়াজ উদ্দিনসহ আরও অনেকে।
আলাপকালে তারা বলেন, “কোরবানি দেওয়া হয়নি। পরিবার নিয়ে থাকি, বাচ্চারাও আছে। সবাই কোরবানির মাংস খেতে চায়। তাই এখানে মাংস কিনতে এসেছি।”
তারা জানান, বাজারটিতে ৫২০ থেকে ৫৮০ টাকা কেজি দরে মাংস পাওয়া যাচ্ছে। কয়েক কেজি মাংস কিনে পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালোভাবে ঈদ উদযাপনের চেষ্টা করছেন তারা।
অন্যদিকে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কোরবানির মাংস সংগ্রহ করে সেই মাংস বিক্রি করেও কিছু অর্থ উপার্জন করছেন অনেক নিম্নআয়ের মানুষ। মাংস বিক্রি করতে আসা হাসিবুন বেওয়া (৬৫) ও হকার কাল্লু (৪৫) বলেন, “ঈদের দিন বিভিন্ন বাড়ি থেকে কোরবানির মাংস সংগ্রহ করেছি। প্রায় সাড়ে তিন কেজি মাংস হয়েছিল। এক কেজি নিজেরা খাওয়ার জন্য রেখে বাকি মাংস বিক্রি করেছি। এতে কিছু টাকা হয়েছে, যা অন্য কাজে লাগবে।’’
এভাবে সংগৃহীত অতিরিক্ত মাংস বিক্রি করতে এসেছেন আরও অনেকে। কোরবানি দেওয়া ব্যক্তিরা গরিব মানুষের মধ্যে যে মাংস বিতরণ করেন, সেই মাংসের একটি অংশ এসে বিক্রি হয় এই অস্থায়ী বাজারে। দানের মাংস হলেও কোরবানির মাংস হওয়ায় ক্রেতার সংখ্যাও কম নয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেখানে কয়েক মণ মাংস বিক্রি হয়ে যায়।
বিক্রেতারা সাধারণত বাজারের ব্যাগে করে সংগ্রহ করা মাংস নিয়ে আসেন। মাংসের মানভেদে ৫২০ থেকে ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয় এসব মাংস। আবার অনেককে হাতে মেপে দর কষাকষির মাধ্যমে বিক্রি করতে দেখো গেছে। তবে শুধু সাধারণ ক্রেতাই নন, কম দামে মাংস কিনতে আসেন কিছু হোটেল মালিকও। তাদের উদ্দেশ্য হোটেলে রান্না করে সেই মাংস বিক্রি করা।
টার্মিনাল এলাকার এক হোটেল মালিক আব্দুল করিম (৫৫) বলেন, ‘‘প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা দরে আট কেজি মাংস কিনেছি। এগুলো পরে হোটেলে রান্না করে বিক্রি করব।’’
এদিকে বাজারে মাংস ওজন করে দেওয়ার জন্য বসেছেন কয়েকজন ডিজিটাল ওজনযন্ত্রের মালিকও। তারা প্রতিজনের মাংস মেপে দেওয়ার জন্য ১০ টাকা করে নিচ্ছেন। এতে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েরই সুবিধা হচ্ছে।
কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সৈয়দপুরের এই ব্যতিক্রমী অস্থায়ী মাংসের হাট একদিকে যেমন নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে স্বল্পমূল্যে কোরবানির মাংস কিনে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার সুযোগ করে দিচ্ছে অসংখ্য পরিবারের জন্য।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









