পারিবারিক কলহ ও মানসিক টানাপোড়েনের জেরে কুষ্টিয়ায় গড়াই নদীর হরিপুর সেতু থেকে চার মাস বয়সী সন্তানকে নদীতে ছুঁড়ে ফেলে নিজে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন এক গৃহবধূ। স্থানীয় নৌকার মাঝিদের তৎপরতায় মা জীবিত উদ্ধার হলেও বেঁচে থাকার আশা ক্ষীণ চার মাসের শিশু সাইফ ওসমান হাদির। ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও তীব্র স্রোতের কারণে নিখোঁজ শিশুটির কোনো সন্ধান মেলেনি।
শুক্রবার (২৯ মে) বিকেলে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার গড়াই নদীর হরিপুর সেতুতে এই ঘটনাটি ঘটে। আত্মহত্যার চেষ্টাকারী ওই মায়ের নাম যমুনা খাতুন (২২)। তিনি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর গ্রামের আব্দুল আলীমের স্ত্রী।
ঘটনার পর রাতেই পুলিশ ওই মাকে আটক করে থানা হেফাজতে নিয়েছে। এদিকে আজ শনিবার (৩০ মে) সকাল ৯টা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় উদ্ধার অভিযান চালিয়েও নিখোঁজ শিশুটির কোনো হদিস পায়নি ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরি দল।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার বিকেলে গড়াই নদীর হরিপুর সেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন যমুনা খাতুন। কোলে ছিল তার চার মাসের শিশু। প্রত্যক্ষদর্শীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি হঠাৎ কোলের শিশুকে সজোরে নিচে নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দেন। এর পরের মুহূর্তেই তিনি নিজেও সেতু থেকে নদীতে ঝাঁপ দেন।
সে সময় নদীতে অবস্থানরত কয়েকজন নৌকার মাঝি ঘটনাটি সচক্ষে দেখেন। তারা দ্রুত নৌকা নিয়ে এগিয়ে যান এবং নদী থেকে ওই নারীকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। তবে তার আগেই চোখের পলকে তীব্র স্রোতে তলিয়ে যায় শিশুটি।
খবর পেয়ে কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়ে নদীতে তল্লাশি শুরু করেন।
কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আরশেদ আলী জানান, খবর পাওয়ার পরপরই আমাদের টিম উদ্ধার কাজে নেমে পড়ে। তবে নদীর গভীরতা ও স্রোত বেশি থাকায় উদ্ধার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর খুলনা থেকে ফায়ার সার্ভিসের একটি বিশেষ ডুবুরি দল রওনা হয়। শুক্রবারের পর আজ শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ডুবুরি ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা যৌথভাবে অভিযান চালিয়েও শিশুটির সন্ধান পায়নি। আমাদের উদ্ধার অভিযান এখনও চলমান রয়েছে।
কী কারণে একজন মা নিজের সন্তানকে নদীতে ফেলে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে গেলেন, তার একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে শিশুর বাবা আব্দুল আলীমের বক্তব্যে।
তিনি জানান, তার স্ত্রী যমুনা খাতুন বেশ কিছুদিন ধরে সন্তানকে নিয়ে কুমারখালী উপজেলার সুলতানপুর বেলতলা গ্রামে মায়ের (আব্দুল আলীমের শাশুড়ি) বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। গত কয়েকদিন ধরে শিশুটি কিছুটা অসুস্থ ছিল।
আব্দুল আলীম বলেন, ‘‘আমি চাচ্ছিলাম বাচ্চাটাকে আমাদের নিজেদের বাড়িতে নিয়ে এসে চিকিৎসা করাতে। কিন্তু আমার স্ত্রী এবং শাশুড়ি চাচ্ছিল কুমারখালীতে মায়ের বাড়িতে রেখেই বাচ্চার চিকিৎসা করাতে। এই বাচ্চার চিকিৎসা ও নিজেদের বাড়িতে আনা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে স্ত্রী ও শাশুড়ির সঙ্গে আমার চরম মনোমালিন্য ও পারিবারিক কলহ চলছিল। এই বিরোধের জের ধরেই শুক্রবার বিকেলে যমুনা কাউকে কিছু না জানিয়ে কুমারখালী থেকে এসে গড়াই নদীর হরিপুর সেতুর ওপর থেকে প্রথমে বাচ্চাকে নদীতে ফেলে দেয়, এরপর নিজেও লাফ দেয়।’’
ঘটনার পর গড়াই নদীর তীর থেকে অভিযুক্ত মা যমুনা খাতুনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। তবে থানা হেফাজতে নেওয়ার পর থেকেই চরম মানসিক অবসাদে ভুগছেন তিনি।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন মাতুব্বর ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নদী থেকে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় ওই নারীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে তাকে থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে। তবে আটকের পর থেকেই ওই নারী কেবল অনবরত কান্নাকাটি করছেন। মানসিকভাবে তীব্র ভেঙে পড়ার কারণে তার কাছ থেকে এখন পর্যন্ত ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য বা জবানবন্দি নেওয়া সম্ভব হয়নি। পুলিশ পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে এবং এই ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা প্ররোচনা রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
এই ঘটনায় হরিপুর সেতু এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। চার মাসের অবুজ শিশুটির পরিণতি কী হলো, তা জানতে নদীর তীরে ভিড় করছেন শত শত উৎসুক জনতা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









