বরগুনার উপকূলীয় উপজেলা পাথরঘাটা নদী আর জলাভূমিতে ঘেরা হলেও সেখানে দেখা দিয়েছে তীব্র সুপেয় পানির সংকট। স্থানীয়দের অভিযোগ, চারপাশে পানি থাকলেও নিরাপদ পানির অভাবে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষদের।
প্রায় দুই লাখ মানুষের বসবাস এই জনপদে। অথচ বিশুদ্ধ পানির সংকট দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। দীর্ঘদিনের এই সমস্যা এখন শুধু মৌসুমি কষ্ট নয় বরং উপকূলবাসীর নিত্যদিনের সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন ভোর হতেই খাবার পানির সন্ধানে বের হতে হয় অনেক পরিবারকে। কোথাও আধা কিলোমিটার, আবার কোথাও কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে পানি। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা।
বিষখালী ও বলেশ্বর নদঘেরা পাথরঘাটায় একসময় পুকুর, দিঘি ও খাল-বিলই ছিল সুপেয় পানির ভরসা। বর্ষার পানি সংরক্ষণ করেই বছরের বেশিরভাগ সময় পার করতেন স্থানীয়রা। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদ-নদীতে লবণাক্ততার বিস্তার এবং অপরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনার কারণে এখন অধিকাংশ জলাধারের পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে নিরাপদ পানির সংকট দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
উপজেলার অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি এলাকায় তীব্র এবং আরও ২৫ থেকে ৩০টি এলাকায় মাঝারি পর্যায়ে পানি সংকট রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পানিতে লবণের মাত্রা ৬০০ পিপিএম পর্যন্ত সহনীয় হলেও পাথরঘাটার অনেক স্থানে তা ৩ হাজার পিপিএম ছাড়িয়ে গেছে। ভূগর্ভস্থে পাথর থাকায় গভীর নলকূপও স্থাপন করা যাচ্ছে না। দুই একটি গভীর নলকূপ স্থাপন করলেও কোথাও কাদাযুক্ত পানি উঠছে, কোথাও আবার লবণাক্ততার কারণে নলকূপ অচল হয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুকনো মৌসুমে পুকুর ও টিউবওয়েলের পানিতে লবণের মাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে তা খাওয়া তো দূরের কথা, রান্নার কাজেও ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকে বাধ্য হয়ে দূষিত কিংবা আধা-লবণাক্ত পানি ব্যবহার করছেন। এর ফলে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও পানিবাহিত নানা রোগ বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দুই শতাধিক টিউবওয়েল, শতাধিক সোলার পিএসএফ এবং কয়েক হাজার পানির ট্যাংক বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পুকুর খননসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও চাহিদার তুলনায় তা অনেক কম। অনেক এলাকায় একটি মাত্র ফিল্টারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে কয়েক হাজার মানুষকে। ফলে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অনেকে কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে অন্য এলাকা থেকে পানি এনে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাচ্ছেন।
গহরপুর এলাকার বাসিন্দা জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘‘আমাদের এলাকায় নলকূপ বসানো যায় না। বসালেও লবণ পানি ওঠে। একটি ফিল্টারের ওপর নির্ভর করে হাজারো মানুষ। শুকনো মৌসুমে সেটাও বন্ধ হয়ে যায়।’’
পদ্মা গ্রামের মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করি, কিন্তু বেশিদিন রাখা যায় না। নলকূপের পানি লবণাক্ত হওয়ায় শিশুরা বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে।’’
রূহিতা গ্রামের আব্দুল হামিদ খান বলেন, ‘‘গভীর নলকূপ বসাতে গেলে পাথরে আটকে যায়। এনজিওর দেওয়া ফিল্টার কিছুদিন চলার পর নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে, পরে আর কেউ মেরামত করে না।’’
এদিকে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কিছু এলাকায় পুকুর সংস্কার, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং ও পানি শোধনাগার স্থাপন করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অনেক প্রকল্পই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচল হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পানি সংকটের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে স্থানীয় সমাজসেবক ও উপজেলা পানি কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন এসমে বলেন, ‘‘পাথরঘাটার মানুষের পানি সংকট দীর্ঘদিনের। দিন দিন তা আরও প্রকট হচ্ছে। প্রকল্পভিত্তিক সাময়িক সমাধান দিয়ে এই সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়। আমাদের টেকসই পরিকল্পনা দরকার।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘নদী, খাল-বিল ও পুকুরগুলোকে রক্ষা করে সেগুলোর পানি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিশোধন করা গেলে সুপেয় পানির বড় উৎস তৈরি করা সম্ভব। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রতিটি পরিবারে ছড়িয়ে দিতে হবে। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়।’’
পাথরঘাটা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মেহেদী জানান, পাথরঘাটার ভৌগোলিক অবস্থার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কার্যকর সমাধান নয়। তাই ভূ-উপরিস্থ পানি পরিশোধন করে সরবরাহ নিশ্চিত করতে বড় আকারের সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন এখন সময়ের দাবি।
চারদিকে নদী আর সাগরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরঘাটার মানুষের আজ একটাই প্রত্যাশা-নিরাপদ ও সুপেয় পানির নিশ্চয়তা। এই মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা না গেলে উপকূলীয় এই জনপদের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। পাথরঘাটার সেই বাস্তবতা যেন উপকূলীয় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংকটেরই এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









