দক্ষিণাঞ্চলের নদীবেষ্টিত জনপদ বরিশাল। যেখানে সাধারণত ধান, পাট, সবজি কিংবা দেশীয় ফলের চাষের কথাই বেশি শোনা যায়। সেই বরিশালেই একটি গ্রামের বাড়ির ছাদে থোকায় থোকায় ঝুলছে বিদেশি ও উন্নত জাতের আঙুর। সবুজ, কালো, গোলাপি ও সোনালি রঙের অসংখ্য আঙুরে ছাওয়া সেই ছাদ এখন দর্শনার্থীদের কাছে যেন এক বিস্ময়ের নাম।
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা ও কাপড় ব্যবসায়ী মো. আরিফ নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য এবং দীর্ঘ চার বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় গড়ে তুলেছেন ব্যতিক্রমী এক ছাদ বাগান। যেখানে বর্তমানে ২২টি জাতের আঙুর গাছের মধ্যে ২১টি জাতেই এসেছে সফল ফলন। তার এই অর্জন শুধু স্থানীয়দেরই নয়, কৃষি সংশ্লিষ্ট অনেকেরও নজর কেড়েছে।
প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার বাড়িতে ভিড় করছেন উৎসুক মানুষ। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ আঙুরের জাত সম্পর্কে জানতে চাইছেন, আবার কেউ জানতে চাইছেন কীভাবে এমন চাষ সম্ভব হলো। অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করে বলছেন, “বরিশালে আঙুর! তাও আবার একসঙ্গে এতগুলো জাত!”
কিন্তু এই সাফল্যের পেছনের গল্পটি মোটেও সহজ ছিল না।
প্রায় চার বছর আগে নিছক শখ থেকেই আঙুর চাষের যাত্রা শুরু করেছিলেন আরিফ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব ও বিভিন্ন কৃষিবিষয়ক ওয়েবসাইট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তিনি আঙুর চাষ সম্পর্কে ধারণা নেন। এরপর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করতে থাকেন উন্নত জাতের আঙুরের চারা।
শুরুর সময় ছিল নানা চ্যালেঞ্জে ভরা। দক্ষিণাঞ্চলের আবহাওয়া, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, রোগবালাই এবং পরিচর্যার অভিজ্ঞতার অভাবে একের পর এক চারা নষ্ট হয়েছে। আর্থিক ক্ষতিও কম হয়নি। তবুও দমে যাননি তিনি।
আরিফ বলেন, প্রথম দিকে অনেক গাছ মারা গেছে। অনেক সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় হয়েছে। কয়েকবার ভেবেছি আর আঙুর চাষ করব না। কিন্তু গাছের প্রতি ভালোবাসা আর সফল হওয়ার ইচ্ছা আমাকে বারবার নতুন করে শুরু করার সাহস দিয়েছে।
প্রতিটি ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন তিনি। গাছের ছাঁটাই, রোগবালাই দমন, সঠিক সার ব্যবস্থাপনা এবং পরিচর্যার বিভিন্ন কৌশল আয়ত্ত করেছেন ধীরে ধীরে। বছরের পর বছর ধৈর্য ধরে গাছগুলোর পরিচর্যা করে অবশেষে পেয়েছেন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য।
বর্তমানে তার সংগ্রহে রয়েছে একাডেমিক, সুপার নোভা, ইন্টু-২, গোল্ডেন ফ্রেশ, পর্তুগিজ ড্রিম, ভ্যালেজ, দোভাস্কি পিংক, ট্রান্সফিগারেশন, নাড়ু সিডলেস, বাইকুনুর, একেলো, গ্রিন লং, লোরাস, ব্ল্যাক ম্যাজিক, রেবেকা সিডলেস, ডিক্সন, ভিট্রো ব্ল্যাক, ভিএসডি, হোয়াইট মাসকাট, ফিলিপ, জেসমিন ও জয় সিডলেসসহ মোট ২২টি জাতের আঙুর গাছ। এর মধ্যে ২১টি জাতেই এ বছর ফল ধরেছে।
বাগানে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে আঙুরের ভারে নুয়ে পড়া লতা। কোথাও সবুজ মুক্তোর মতো ঝুলছে আঙুরের থোকা, কোথাও আবার কালো ও গোলাপি আঙুরের সমারোহ। প্রতিটি গাছে ফলনের পরিমাণও বেশ সন্তোষজনক। স্বাদে মিষ্টি, রসে ভরপুর এবং দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এসব আঙুর।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে তারা শুধু বাজারে কিংবা টেলিভিশনে আঙুর দেখেছেন। কিন্তু নিজের এলাকায়, তাও একটি বাড়ির ছাদে এত বৈচিত্র্যময় আঙুরের বাগান দেখবেন, এমনটা কখনো কল্পনাও করেননি।
স্থানীয়দের মতে, আরিফের এই উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের জন্য একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। তার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই এখন বাড়ির ছাদ ও আঙিনায় ফলজ গাছ লাগানোর বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
আরিফ জানান, এখন পর্যন্ত তিনি কোনো সরকারি অনুদান বা বিশেষ প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজের প্রচেষ্টা ও অভিজ্ঞতার আলোকে এই সাফল্য অর্জন করেছেন। তবে স্থানীয় কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা তার বাগান পরিদর্শন করে প্রশংসা করেছেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন।
শুধু নিজের শখ পূরণেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান না তিনি। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলার আগ্রহী চাষিদের কাছে আঙুরের চারা সরবরাহ শুরু করেছেন। ভবিষ্যতে বৃহৎ পরিসরে বাণিজ্যিক আঙুর চাষের স্বপ্নও দেখছেন।
আরিফ বলেন, শখ থেকে শুরু হয়েছিল পথচলা। এখন মনে হচ্ছে এটি একটি সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হতে পারে। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও কারিগরি সহায়তা পেলে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ সম্প্রসারণ করতে চাই। আমি চাই মানুষ জানুক, দক্ষিণাঞ্চলের মাটিতেও উন্নত জাতের আঙুরের সফল চাষ সম্ভব।
কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাবুগঞ্জের এই তরুণ উদ্যোক্তার গল্প নিঃসন্দেহে এক অনুপ্রেরণার নাম। সীমিত সুযোগ, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং বারবার ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েও তিনি হাল ছাড়েননি। বরং নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।
আজ তার ছাদে ঝুলে থাকা প্রতিটি আঙুরের থোকা যেন সেই অধ্যবসায়েরই প্রতীক। আর কেদারপুর গ্রামের সেই ছাদ বাগান হয়ে উঠেছে একটি বার্তা, স্বপ্ন দেখার সাহস আর পরিশ্রমের শক্তি থাকলে, অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









