রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী আমের বাজারে গত কয়েক বছরে বড় পরিবর্তন এসেছে। এক সময় যেখানে আম বিক্রির প্রধান ভরসা ছিল স্থানীয় হাট-বাজার ও আড়ত, সেখানে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরাসরি ক্রেতার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে রাজশাহীর আম। চলতি মৌসুমে অনলাইনভিত্তিক এই বাণিজ্যের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা।
ফেসবুক পেজ, অনলাইন শপ, নিজস্ব ওয়েবসাইট এবং কুরিয়ার সেবার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে নতুন এই বিপণন ব্যবস্থা। রাজশাহীর শতাধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এখন সরাসরি বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে পাঠাচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মধ্যস্বত্বভোগী কমে যাওয়ায় চাষিরা তুলনামূলক ভালো দাম পাচ্ছেন, আর ক্রেতারাও পাচ্ছেন বাগান-তাজা ফরমালিনমুক্ত আম।
‘রাজশাহী ম্যাংগো লাভার’ ফেসবুক পেজের স্বত্বাধিকারী মুরাদ পারভেজ বলেন, “এই বছর অনলাইনে আম বিক্রয় জমে উঠেছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ১০ থেকে ১২ টন আম পাঠাচ্ছি। তবে সরকারের কাছে আবেদন, পরিবহন ব্যবস্থা যদি আরও উন্নত করা যায় তাহলে আমাদের জন্য সুবিধা হয়। অনেক সময় কুরিয়ারে বিলম্বের কারণে আম নষ্ট হয়ে যায়।”
অনলাইনে আমের ব্যবসার দিকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকেছেন উঠতি বয়সী তরুণ ও শিক্ষার্থীরা। পড়াশোনার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি এই উদ্যোগকে তারা আয়ের উৎস হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ‘রাজশাহীর আম’ ফেসবুক পেজের নাহিদুল ইসলাম ও আরেক উদ্যোক্তা সাগর ইসলাম অভি জানান, ফেসবুক পেজের মাধ্যমে অর্ডার নিয়ে তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আম পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে যেমন তাদের কর্মসংস্থান হচ্ছে, তেমনি ক্রেতারাও সুমিষ্ট আমের স্বাদ পাচ্ছেন।
পবা উপজেলার আমচাষি আব্দুল করিম বলেন, “আগে আড়তদারের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন ফেসবুকের মাধ্যমে ক্রেতারা সরাসরি যোগাযোগ করেন, দামও ভালো পাওয়া যায়।” অনলাইন উদ্যোক্তা সাইফুল ইসলাম জানান, গোপালভোগ, হিমসাগর (খিরসাপাত), ল্যাংড়া, আম্রপালি ও ফজলি জাতের আমের চাহিদা সবচেয়ে বেশি এবং অনেকেই আগাম বুকিং দিচ্ছেন।
তবে এই বাজারে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ভুয়া বিক্রেতার কারণে প্রতারণার অভিযোগ উঠছে। এছাড়া কুরিয়ারে বিলম্ব ও পরিবহনে আমের ক্ষতি হওয়া নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। তাই ক্রেতাদের বিশ্বস্ত উদ্যোক্তা বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, জেলায় এ বছর মোট ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে এবং ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (পিপি) ড. মো. আব্দুল মজিদ বলেন, “রাজশাহীতে এবার আমের ফলন ভালো হয়েছে। ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থার কারণে চাষি ও উদ্যোক্তারা নতুন বাজার পেয়েছেন। এই বছর শুধুমাত্র অনলাইনেই আমের লেনদেন কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









