কদিন আগে দেখলাম সংসদে সাংবাদিকতা প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সংসদ সদস্যরা প্রশ্ন করেছেন কয়েকটি। তথ্য প্রতিমন্ত্রী সেসব প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন। সিনিয়র পার্লামেন্টারিয়ান জয়নুল আবেদীন ফারুক সাংবাদিকদের যোগ্যতার বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। ইউনিয়ন পর্যায়েও সাংবাদিকের কার্ড পাওয়া যাচ্ছে, সেই প্রসঙ্গ টেনেছেন।
মেট্রিক পাশ নয়, এমন লোক সাংবাদিক। এটাও আলোচনা হয়েছে। তাই আমার মনে হল সাংবাদিকতা নিয়েই একটু লিখি। লিখবটা কি? অবশেষে ভেবে ঠিক করলাম, সাংবাদিকের নিরপেক্ষতার প্রসঙ্গটাই তুলে ধরি। আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে একটি প্রবণতা আছে, কোন সাংবাদিক তার গুণগান গাইলে, তার পক্ষে লিখলে, তখন আর যোগ্যতার বিষয় নিয়ে কোন প্রশ্ন ওঠেনা! আমি এই প্রসঙ্গটি নিয়ে ইতোপূর্বে কয়েকবার কথা উঠিয়েছি। কিন্তু আমার মত মানুষের কথায়, কার কি আসে যায়?
কোন দলীয় আদর্শ লালন করে কি সাংবাদিকতা নিরপেক্ষ হয়? সাংবাদিক কি কোন নির্দিষ্ট দলের আদর্শ লালন করতে পারেন? নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার জন্য, সাংবাদিকের কেমন হওয়া উচিত? আরো অনেক প্রশ্ন আছে সাংবাদিকতা নিয়ে। সেগুলো আর নাই বা দিলাম। এই কয়েকটা প্রশ্নেরই বিশ্লেষণ করে, লেখাটাকে এগিয়ে নিই। সাংবাদিকতা নিয়ে উপরোক্ত প্রশ্নগুলো সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাংবাদিকতা একটি পেশা নয়; এটা গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তবে বাস্তব জীবনে সাংবাদিকতা কতটা নিরপেক্ষ থাকে, নাকি কোনো না কোনো পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়ে? এই বিতর্ক বহু পুরোনো এবং বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই এটি দেখা যায়।
আদর্শভাবে সাংবাদিকের কোনো রাজনৈতিক দল থাকার কথা নয়, অন্তত তার পেশাগত ভূমিকায়। ব্যক্তিগত জীবনে একজন সাংবাদিক যে কোনো মতাদর্শে বিশ্বাস করতে পারেন, কিন্তু সংবাদ পরিবেশনের সময় তার প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত তথ্য যাচাই করে তা নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করা।
সাংবাদিকতার মূল ধারণা হলো; সংবাদ আলাদা, মন্তব্য আলাদা। অর্থাৎ সংবাদ পরিবেশনের সময় ব্যক্তিগত মত বা রাজনৈতিক অবস্থান ঢুকে গেলে সেটি তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে ফেলে। ষাট বছরের সাংবাদিকতার কর্মজীবন কাটানো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সাংবাদিক ও চিন্তক ওয়াল্টার লিপম্যানের বক্তব্যের একটি উদ্ধৃতি অনুবাদ করে বলা যায়, 'যখন সবাই একইভাবে চিন্তা করে, তখন আসলে কেউই চিন্তা করে না।'
এই কথাটি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, কারণ একপক্ষীয় চিন্তা সংবাদকে সংকুচিত করে দেয়। কিন্তু বাস্তবতা সবসময় আদর্শের সঙ্গে মেলে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সাংবাদিকরা কোনো রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েন, কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার কারণে পরোক্ষভাবে পক্ষপাত তৈরি হয়। কেউ কেউ আবার সরাসরি রাজনৈতিক দলের কর্মী বা প্রচারক হিসেবে কাজ করেন, যা সাংবাদিকতার মূল নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
কারণ তখন সংবাদ আর তথ্য থাকে না, তা প্রচারণার অংশ হয়ে যায়। একটি প্রচলিত বিখ্যাত উক্তি আছে। সেটি এরকম; 'যদি কেউ সত্য না লিখে, কেবল কারো ইচ্ছামতো লেখে, তবে তা আর সাংবাদিকতা থাকে না, তা হয়ে যায় কোন পক্ষের জনসংযোগ।' আমি এই উদ্ধৃতিটিকে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত মনে করছি। আমাদের অনেক সাংবাদিকই এমনটি করে থাকেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা বলতে পুরোপুরি কোনো পক্ষ না নেওয়া বোঝায় না, বরং বোঝায় তথ্যকে যাচাই করে, বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে এবং আবেগ বা রাজনৈতিক ভাষা পরিহার করে সত্যের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করা। একজন ভালো সাংবাদিকের কাজ হলো একটি ঘটনার একাধিক দিক দেখানো, যাতে পাঠক বা দর্শক নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো যেমন বিবিসি বা রয়টার্স এই নীতিকে গুরুত্ব দেয়; গতি নয়, সঠিক তথ্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সাংবাদিকতার দর্শনের অনুবাদ করলে বলা যায় 'ভুল দ্রুত ছাপানোর চেয়ে সঠিক তথ্য দেরিতে প্রকাশ করা উত্তম।' যেটা আমাদের দেশে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অনুসরণ করে। এই দুই পত্রিকা সম্পাদক কিংবা সম্পাদকীয় নীতিমালা নিয়ে অনেকের মধ্যে বিতর্ক আছে। কিন্তু আমি অন্তত মনে করি তারা সাংবাদিকতা সঠিক পথটি ধরেই হেঁটে চলেছেন।
বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত সমাজে সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। বিভিন্ন সরকারের সময় বিভিন্ন মিডিয়ার অবস্থান নিয়েও আলোচনা হয়। কখনো অভিযোগ থাকে যে কিছু সংবাদমাধ্যম সরকারপন্থী হয়ে পড়ে, আবার কখনো অভিযোগ ওঠে অতিরিক্ত বিরোধী অবস্থান নেওয়ার। তবে এখানে একটি বাস্তবতা আছে, মিডিয়ার মালিকানা, বিজ্ঞাপন নির্ভরতা এবং রাজনৈতিক চাপ অনেক সময় সাংবাদিকদের স্বাধীন সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। ফলে অনেক সাংবাদিক ইচ্ছা থাকলেও পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না।
সরকার পরিবর্তনের পর সংবাদপত্র বা টেলিভিশনে সাংবাদিকদের রদবদল হওয়ার বিষয়টিও নতুন নয়। এর পেছনে অনেক কারণ থাকে। মালিকানার পরিবর্তন, নতুন নীতিগত অবস্থান, রাজনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তন কিংবা কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা ইত্যাদি। তবে যখন এই পরিবর্তন পেশাগত যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে হয়, তখন তা সাংবাদিকতার মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কারণ সাংবাদিকতা তখন পেশা না থেকে প্রভাবের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়।
সাংবাদিকতা করে স্বার্থ আদায় করার বিষয়টি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো জনস্বার্থ, ব্যক্তিস্বার্থ নয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় অভিযোগ ওঠে যে কিছু ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধা গ্রহণ করেন; তা রাজনৈতিক হোক, অর্থনৈতিক হোক বা প্রভাবের মাধ্যমে হোক। এই ধরনের প্রবণতা পুরো পেশার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা যায়, সাংবাদিকতার ওপর আস্থার সংকট অনেক দেশে বাড়ছে।
এর পেছনে কারণ হিসেবে রয়েছে অতিরিক্ত রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক মাধ্যমে ভুল তথ্যের বিস্তার এবং কিছু ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশন। বাংলাদেশেও এই প্রবণতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে অনেক সাংবাদিক ঝুঁকি নিয়ে মাঠ পর্যায়ে সত্য তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের কাজ করে যাচ্ছেন, যা সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা পুরোপুরি অর্জন করা কঠিন হলেও, সেটিই লক্ষ্য হওয়া উচিত। কারণ প্রত্যেক সাংবাদিকই কোনো না কোনো সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেড়ে ওঠেন, তাই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকা বাস্তবসম্মত নয়। তবে চেষ্টা থাকতে হবে ভারসাম্য রক্ষার, তথ্য যাচাইয়ের এবং একাধিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার। সাংবাদিকতার এই ধারাবাহিক অনুশীলনই তাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
এই লেখার শেষে এসে কেবল এটুকুই বলি, সাংবাদিকতা যদি সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, তবে তা সমাজকে সঠিক তথ্য দিতে পারে এবং ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু যদি এটি পক্ষপাত, চাপ বা স্বার্থের মধ্যে আটকে যায়, তবে তার প্রতি মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে কমে যায়। সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়। এটি হওয়া উচিত জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ একটি পেশা।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









