কম-বেশি আমরা সবাই অবগত, বাংলাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের বিজ্ঞান শিক্ষার সবচেয়ে বড় প্রতারণাগুলোর একটি হলো তথাকথিত 'ব্যবহারিক শিক্ষা'। আমি নিজেও এসএসসি এবং এইচএসসি-তে সাইন্স নিয়ে পড়েছি। দুয়েক বার সরল দোলক, আলোর প্রতিফলন এসবের বেশকিছু পরীক্ষা করেছিলাম বা গ্রাফ পেপারে গণিত; কিন্তু এ পর্যন্তই। আমাদের ক্লাসে মনির হোসেন মোল্লা স্যারের মত দুর্দান্ত একজন শিক্ষক পেয়েছিলাম বলে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের মত প্রত্যন্ত এলাকায় সেগুলো তাও করানো হয়েছিল।
আমাদের এই স্যার জ্যামিতি কিংবা ফিজিক্সের কোন সমাধান তিনি করে না দিয়ে বরং আমাদের দিয়ে করিয়েছিলেন। তিনি বেসিকের জন্য যা করে দেওয়ার সেটুকু করেছেন, কিছু সমাধান করে দিলেও অনুশীলনের সমস্ত অংক জ্যামিতি এসব আমি নিজেই করেছি। দুর্ভাগ্য আমাদের; এমন শিক্ষক খুব একটা নেই, অন্তত আমি যতদূর জানি। খোঁজ নিলে জানা যাবে, বেশিরভাগ স্কুলে কাগজে-কলমে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের ব্যবহারিক ক্লাস আছে, ব্যবহারিক পরীক্ষা আছে, ল্যাবরেটরি আছে, নম্বর আছে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী তাদের পুরো স্কুলজীবন পার করে দেয় কোনো পরীক্ষাগারে হাতে-কলমে একটি পরীক্ষাও না করে।
তারা বিজ্ঞান শেখে না, বিজ্ঞান মুখস্থ করে। তারা পরীক্ষা করে না, পরীক্ষার ছবি আঁকে। তারা পর্যবেক্ষণ করে না, গাইড বই থেকে পর্যবেক্ষণ লিখে দেয়। তারপরও রাষ্ট্র তাকে বলে বিজ্ঞান শিক্ষার্থী। এটি শুধু একটি শিক্ষাগত দুর্বলতা নয়; এটি একটি জাতীয় প্রতারণা। সম্প্রতি বিভিন্ন অনুসন্ধান ও গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কার্যকর বিজ্ঞান ল্যাব নেই, আর যেসব প্রতিষ্ঠানে ল্যাব আছে সেখানেও নিয়মিত ব্যবহারিক ক্লাস হয় না। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ২৯ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কোনো বিজ্ঞানাগারই নেই। আরও ভয়াবহ হলো, যেসব বিদ্যালয়ে ল্যাব রয়েছে, তার অনেকগুলো বছরের পর বছর তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকে।
শিক্ষার্থীরা পরীক্ষাগারের যন্ত্রপাতি চোখেই দেখে না। বাংলাদেশের বিজ্ঞান শিক্ষার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এখানে 'ব্যবহারিক' বলতে বোঝানো হয় ব্যবহারিক খাতা লেখা। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষাগারে গিয়ে পরীক্ষা করবে, তথ্য সংগ্রহ করবে, ফলাফল বিশ্লেষণ করবে- এসবের পরিবর্তে তারা গাইড বই থেকে ছবি নকল করে খাতা পূরণ করে। খাতার পৃষ্ঠা যত সুন্দর, নম্বরও তত বেশি। অথচ বিজ্ঞান কোনো চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা নয়। বিজ্ঞান হলো অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা এবং প্রশ্ন করার শিল্প। একজন শিক্ষার্থী যদি নিউটনের সূত্র মুখস্থ করে কিন্তু বলের প্রভাব নিজে পরীক্ষা না করে, যদি রাসায়নিক বিক্রিয়া বইয়ে পড়ে কিন্তু টেস্ট টিউবে তা না দেখে, যদি মাইক্রোস্কোপে কোষ না দেখে শুধু বইয়ের ছবি দেখে পরীক্ষায় নম্বর পায়; তাহলে তাকে বিজ্ঞান শিক্ষার্থী বলা যায় না। সে কেবল পরীক্ষার্থী।
একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বহু শিক্ষার্থী জানিয়েছে, নবম ও দশম শ্রেণির পুরো দুই বছরে তারা একটি ব্যবহারিক ক্লাসও করেনি। পরীক্ষা আসার আগে কয়েকটি ক্লাসে খাতা লেখানো হয়েছে, তারপর ব্যবহারিক পরীক্ষার নামে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই অবস্থার জন্য দায়ী কে? অনেকেই শিক্ষককে দায়ী করবেন। কেউ বলবেন ল্যাব নেই। কেউ বলবেন অর্থের অভাব। কিন্তু মূল দায় শিক্ষা ব্যবস্থার। কারণ এই ব্যবস্থাই এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যেখানে ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ, শিক্ষা নয়; নম্বর গুরুত্বপূর্ণ, দক্ষতা নয়; সার্টিফিকেট গুরুত্বপূর্ণ, জ্ঞান নয়। বাংলাদেশের শিক্ষা কাঠামো এখনও এমন এক পরীক্ষাকেন্দ্রিক মানসিকতার বন্দী, যেখানে শিক্ষার্থীকে ভাবতে শেখানো হয় না, শুধু উত্তর লিখতে শেখানো হয়। বিজ্ঞান বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ে পরীক্ষার কথা লেখা আছে, কিন্তু অধিকাংশ স্কুলে সেই পরীক্ষা বাস্তবে হয় না। অথচ বোর্ড পরীক্ষায় ব্যবহারিক নম্বর দেওয়া হয় প্রায় সবার জন্য সমানভাবে। ফলে যারা সত্যিই কোনো পরীক্ষা করেনি, তারাও প্রায় পূর্ণ নম্বর পেয়ে যায়। এটি শুধু শিক্ষার মান নষ্ট করছে না, এটি সততা ও জবাবদিহিতাকেও ধ্বংস করছে।
বিজ্ঞান শিক্ষা কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ বিজ্ঞান মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়। যুক্তি খুঁজতে শেখায়। প্রমাণ ছাড়া কিছু বিশ্বাস না করতে শেখায়। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বিজ্ঞানকে পরিণত করেছে মুখস্থবিদ্যার আরেকটি বিষয়ে। ফলে বিজ্ঞান বিভাগের বহু শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেও একটি সাধারণ টাইট্রেশন করতে পারে না, একটি সার্কিট তৈরি করতে পারে না, একটি মাইক্রোস্কোপ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না।
গবেষণাগুলোও একই চিত্র তুলে ধরেছে। বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের রসায়ন শিক্ষার ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যবহারিক ক্লাস না হওয়ার পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ল্যাবের অভাব, যন্ত্রপাতির সংকট, শিক্ষকদের অদক্ষতা, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং ব্যবহারিক শিক্ষার প্রতি অনীহা। কিন্তু এসব কারণের পেছনেও রয়েছে নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা। যদি একটি বিদ্যালয়ে ল্যাব না থাকে, তাহলে বছরের পর বছর সেখানে বিজ্ঞান বিভাগ চালু থাকে কীভাবে? যদি ব্যবহারিক ক্লাস না হয়, তাহলে পরিদর্শনকারীরা কী করেন?
যদি শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কোনো পরীক্ষা না করেও পূর্ণ নম্বর পায়, তাহলে পরীক্ষাবোর্ড কীসের মূল্যায়ন করছে? সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, শিক্ষা প্রশাসন বহু বছর ধরেই সমস্যাটি জানে। সংবাদ প্রতিবেদন, গবেষণা, বিভিন্ন সংস্থার জরিপ- সব জায়গায় একই অভিযোগ উঠে এসেছে। তবুও কার্যকর পরিবর্তন হয়নি। এর ফলে কী হচ্ছে? প্রথমত, বিজ্ঞানভীতি বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানকে কঠিন ও বিরক্তিকর মনে করছে। কারণ তারা বিজ্ঞানের আনন্দ পাচ্ছে না। একটি বাল্ব জ্বালিয়ে বিদ্যুতের ধারণা বোঝার আনন্দ, একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া দেখে বিস্মিত হওয়ার আনন্দ, একটি পাতা মাইক্রোস্কোপে দেখে জীববিজ্ঞানের সৌন্দর্য আবিষ্কারের আনন্দ- এসব থেকে তারা বঞ্চিত। দ্বিতীয়ত, উচ্চশিক্ষায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন শিক্ষার্থী পাচ্ছে যারা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়েছে, কিন্তু মৌলিক ব্যবহারিক দক্ষতা নেই। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গিয়ে তাদের আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। বহু বিশেষজ্ঞ দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে ব্যবহারিক শিক্ষা ছাড়া বিজ্ঞান শিক্ষা কার্যত অসম্ভব। তৃতীয়ত, দেশের গবেষণা ও উদ্ভাবন সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিজ্ঞানী তৈরি হয় শৈশবের কৌতূহল থেকে। সেই কৌতূহল জন্ম নেয় হাতে-কলমে কাজের মাধ্যমে। কিন্তু যখন পুরো শিক্ষা জীবন কাটে শুধু খাতা লিখে, তখন সৃজনশীলতা নয়, মুখস্থ করার দক্ষতাই বিকশিত হয়। আজ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বিজ্ঞান শিক্ষা শুরু হয় অনুসন্ধানভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে। সেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেরা পরীক্ষা করে, ভুল করে, ফলাফল বিশ্লেষণ করে। শিক্ষক উত্তরদাতা নন; তিনি পথপ্রদর্শক। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও শিক্ষক ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে দেন, শিক্ষার্থী খাতায় লেখে, পরীক্ষায় পুনরায় লেখে। এই চক্রের নাম শিক্ষা নয়; এটি তথ্য স্থানান্তরের একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়া।আরও দুঃখজনক হলো, অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহারিক পরীক্ষাও বাস্তব পরীক্ষা থাকে না। বিভিন্ন শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা ও প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোথাও কোথাও ব্যবহারিক পরীক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে সম্পন্ন হয়।
খাতা দেখা হয় না, পরীক্ষা নেওয়া হয় না, সবাইকে প্রায় একই নম্বর দেওয়া হয়। এভাবে চলতে থাকলে আমরা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে বিজ্ঞানী নয়, সনদধারী মুখস্থবিদ তৈরি করব। এখন সময় এসেছে কঠিন প্রশ্ন করার। যে স্কুলে কার্যকর ল্যাব নেই, সেখানে বিজ্ঞান বিভাগ চালুর অনুমতি কেন থাকবে? যে শিক্ষক ব্যবহারিক ক্লাস নেন না, তার জবাবদিহিতা কোথায়? যে বোর্ড বাস্তব পরীক্ষা ছাড়া ব্যবহারিক নম্বর দেয়, সেই মূল্যায়নের বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায়? আর যে শিক্ষা ব্যবস্থা দশকের পর দশক ধরে এই ভণ্ডামিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, তাকে সফল বলা যায় কীভাবে? বাংলাদেশে বিজ্ঞান শিক্ষার সংস্কার শুরু করতে হলে প্রথমেই এই অভিনয় বন্ধ করতে হবে।
ব্যবহারিক ক্লাস বাধ্যতামূলক করতে হবে, ল্যাব ব্যবহারের ডিজিটাল রেকর্ড রাখতে হবে, হঠাৎ পরিদর্শন চালু করতে হবে এবং ব্যবহারিক পরীক্ষাকে সত্যিকার অর্থেই ব্যবহারিক করতে হবে। অন্যথায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে, লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করিয়ে, আমরা কেবল একটি মিথ্যা ধারণা তৈরি করছি যে দেশে বিজ্ঞান শিক্ষা হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিজ্ঞান শিক্ষা হচ্ছে না। খাতা আঁকা হচ্ছে, নম্বর দেওয়া হচ্ছে, সনদ বিতরণ করা হচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞান শেখানো হচ্ছে না। আর যে ব্যবস্থায় বিজ্ঞান শেখানো হয় না, তাকে বিজ্ঞান শিক্ষা বলা যায় না। সেটি কেবল শিক্ষার ছদ্মবেশে পরিচালিত একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রহসন।
লেখক : ন্যাশনাল এসোসিয়েট এন্ড কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ (বাংলাদেশ), আইএসএইচআর


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









