সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও লাইসেন্স অমান্য করে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অবৈধ করাত কল (স-মিল)। স্থানীয় প্রশাসনের যথাযথ নজরদারি ও নিয়মিত অভিযানের অভাবে বনাঞ্চল ঘেঁষা এই এলাকায় করাত কল মালিকরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এর ফলে একদিকে যেমন সংরক্ষিত ও সামাজিক বনাঞ্চল উজাড় হচ্ছে, অন্যদিকে তীব্র হুমকিতে পড়ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন বাজার, মোড় এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কাছাকাছি লোকালয়ে কোনো ধরনের বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই চলছে এসব করাত কল।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক এলাকার কোল ঘেঁষে চলছে এসব মিল। অবৈধ এসব মিলে দিন-রাত দেদারসে চেরাই করা হচ্ছে বনের সরকারি ও সামাজিক বনায়নের গাছ। চোরাই কাঠ সিন্ডিকেটের সদস্যরা রাতের আঁধারে বন থেকে গাছ কেটে সরাসরি নিয়ে আসছে এসব মিলে। করাত কলের মালিকরা কোনো বৈধ কাগজপত্র বা কাঠের রসিদ ছাড়াই চড়া দামে এসব কাঠ চেরাই করে দিচ্ছে। পাশাপাশি মিল থেকে উড়া কাঠের গুঁড়ো (ভুষি) বাতাসে মিশে সৃষ্টি করছে চরম বায়ুদূষণ। স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি ও ফুসফুসের নানা জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, অধিকাংশ করাত কল মালিকেরা রাস্তার জায়গা দখল করে বড় বড় কাঠের গুঁড়ি ফেলে রাখছেন। এতে রাস্তা সরু হয়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। লাইসেন্সবিহীন এসব মিলের মালিকেরা প্রভাবশালী হওয়ায় স্থানীয় সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করারও সাহস পাচ্ছেন না। লোকালয় ও বাজারের পাশে গড়ে ওঠা এসব মিলের কর্কশ শব্দে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটছে। এছাড়া, কোনো ধরনের অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ছাড়াই এগুলো চলায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। মাঝেমধ্যে বন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন ছোটখাটো অভিযান চালালেও, অদৃশ্য কারণে মূল হোতারা অধরাই থেকে যায়। ফলে অভিযানের কয়েকদিন পরই আবার চালু হয় মিলগুলো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক করাত কল শ্রমিক জানান, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে 'মাসোহারা' বা নিয়মিত বকশিশ দিয়েই তারা দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। ফলে লাইসেন্স বা পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকলেও করাত কল মালিকদের কোনো আইনি ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয় না।
পরিবেশবাদীরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঠিক নজরদারি না থাকায় দিন দিন এই অবৈধ ব্যবসা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। মাঝেমধ্যে লোকদেখানো অভিযান চালানো হলেও অদৃশ্য কারণে আবারও সচল হয়ে ওঠে এসব করাত কল। দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব অবৈধ মিল বন্ধ করে পরিবেশ রক্ষার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বন বিভাগ সারী রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহ আলম জানান, অবৈধ করাত কলের বিরুদ্ধে তাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দ্রুতই একটি তালিকা তৈরি করে লাইসেন্সবিহীন এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সব করাত কলের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সিলগালাসহ কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









