বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই রাজধানীতে এডিস মশার বিস্তার এবং ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির খবর গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় চার হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, যার মধ্যে সাম্প্রতিক কয়েক দিনে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।
এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে যে, সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। বছরের পর বছর ধরে ডেঙ্গু ও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি, কর্মসূচি এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। বরং প্রতি বর্ষায় একই সংকট আরও তীব্র রূপে ফিরে আসে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, গত এক দশকে মশা নিয়ন্ত্রণে এক হাজার কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ের পরও কেন রাজধানী এডিস মশার দখলমুক্ত হলো না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, সমস্যা অর্থের ঘাটতিতে নয়; ঘাটতি পরিকল্পনা, সমন্বয় ও জবাবদিহিতার। মশা নিধন কার্যক্রমকে দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা না করে অনেক ক্ষেত্রেই মৌসুমি বা প্রতিক্রিয়াশীল উদ্যোগ হিসেবে পরিচালনা করা হয়েছে। ফলে সমস্যার মূল কারণ দূর না করে কেবল উপসর্গ মোকাবিলার চেষ্টা হয়েছে।
ড্রোন দিয়ে মশার উৎস খোঁজা, জলাশয়ে ব্যাঙ ও মাছ ছাড়া, বাউল গান কিংবা জিঙ্গেলের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির মতো নানা উদ্যোগ আলোচনার জন্ম দিলেও কার্যকর ফল দিতে পারেনি। কারণ মশা নিয়ন্ত্রণ কোনো প্রদর্শনমূলক কার্যক্রম নয়; এটি একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। যখন একটি জরিপে দেখা যায় যে রাজধানীর অধিকাংশ ওয়ার্ডেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি, তখন স্পষ্ট হয় যে বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিবর্তে আমরা অনেক সময় বাহ্যিক উদ্যোগ নিয়েই সন্তুষ্ট থেকেছি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। কিন্তু রাজধানীর অপরিকল্পিত নগরায়ন, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্মাণাধীন ভবনের অব্যবস্থাপনা এবং খোলা জায়গায় জমে থাকা পানি এই মশার বিস্তারের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে। সিটি কর্পোরেশন যদি নিয়মিত নজরদারি, বৈজ্ঞানিক জরিপ এবং ঝুঁকিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ না করে, তাহলে শুধুমাত্র ফগিং করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। তবে দায়িত্ব শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দিলেও চলবে না।
নাগরিকদের অসচেতনতা অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বাসাবাড়ি, ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পানির ট্যাংক কিংবা পরিত্যক্ত পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করা না হলে এডিস মশার বিস্তার রোধ করা কঠিন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিক অংশগ্রহণ তাই অপরিহার্য। কিন্তু নাগরিকদের দায়িত্বের কথা বলার আগে সরকারি সংস্থাগুলোর নিজেদের দায়ও স্বীকার করতে হবে। প্রতিবছর একই সংকট, একই সতর্কবার্তা এবং একই ধরনের কর্মসূচি দেখায় যে বর্তমান কৌশল কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। প্রয়োজন নতুন করে ভাবার, তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং ব্যয়ের তুলনায় ফলাফলের কঠোর মূল্যায়ন করার।
ডেঙ্গু এখন আর কেবল একটি মৌসুমি রোগ নয়; এটি রাজধানীর জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘস্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে। তাই এই সমস্যাকে সাময়িক প্রশাসনিক কর্মসূচির গণ্ডি থেকে বের করে জাতীয় জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনার অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছর নতুন বাজেট আসবে, নতুন কর্মসূচি ঘোষণা হবে, কিন্তু ডেঙ্গুর আতঙ্ক থেকে মুক্তি মিলবে না।
রাজধানীবাসী আশ্বাস নয়, ফলাফল দেখতে চায়; সময় এসেছে সেই ফলাফল নিশ্চিত করার। রাজধানীবাসী আর নতুন নতুন পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নয়, বাস্তব ও টেকসই সমাধান দেখতে চায়। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার এটাই উপযুক্ত সময়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









