সিলেটের আধ্যাত্মিক আবহ ও ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর নাম। প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত ও পর্যটক ছুটে আসেন এই দুই ওলির মাজারে। ভক্তরা শ্রদ্ধা ও মানত থেকে নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, গবাদিপশুসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী দান করেন।
স্থানীয়দের মতে, প্রতিদিন এখানে লাখ লাখ টাকার দান জমা পড়ে। তবে কয়েক শতাব্দী ধরে এই বিপুল আয়ের হিসাব বরাবরই রয়ে গেছে আড়ালে। তবে এবার মাজার দুটির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনার উদ্যোগ নিয়েছে সিলেট জেলা প্রশাসন।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে সম্প্রতি এই মাজার দুটির প্রশাসনিক ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার তৎপরতা শুরু হয়েছে।
বিগত ২০০৩ সালে শাহজালাল (রহ.) মাজারের ঐতিহ্যবাহী গজার মাছের মৃত্যুর ঘটনার সময় দরগাহ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি প্রথম জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসে। সে সময় গণমাধ্যমে মাজারের বিপুল আয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে মাজার কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিল, দানের অর্থের একটি অংশ বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারীদের ব্যয়ে এবং অবশিষ্ট অংশ রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়।
তবে সেই ব্যয়ের কোনো সুসংগঠিত বা প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব কখনো জনসম্মুখে আসেনি। ফলে স্থানীয় মানুষ ও ভক্তদের মনে দীর্ঘদিনের কৌতূহল ও প্রশ্ন ছিল।
গত বুধবার সিলেট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিলেট সিটি কর্পোরেশন, ওয়াক্ফ এস্টেট, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, মাজার ও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় মাজার দুটির বর্তমান আয়-ব্যয়, দান-অনুদান এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সভায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাজার কর্তৃপক্ষের কাছে তাৎক্ষণিক পূর্ণাঙ্গ হিসাব চাওয়া হলে তারা কোনো নির্ভরযোগ্য ও সুসংগঠিত রেকর্ড বা আর্থিক খতিয়ান উপস্থাপন করতে পারেনি।
সভায় উপস্থিত বক্তারা বলেন, শাহজালাল ও শাহপরান (রহ.)-এর দরগাহ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি সমগ্র সিলেটবাসীর সম্পদ ও গৌরব। তাই এর আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ, ডিজিটাল পদ্ধতি প্রবর্তন এবং নিয়মিত অডিট করা এখন সময়ের দাবি।
প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন সিলেট মহানগর ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা হাবীব আহমদ শিহাব। তিনি বলেন, ‘‘মাজারের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের এই পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। এতে ভক্তদের আস্থা আরও বাড়বে এবং দানের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’’
জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার কঠোর সমালোচনা করে জানান, মাজারগুলোর আয়-ব্যয়ের মধ্যে কোনো স্বচ্ছতা নেই এবং তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই।
তিনি নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বলেন, ‘‘আগামী এক মাস জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ওয়াক্ফ এস্টেট এবং মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে মাজারের হিসাব সংরক্ষণ করবে। এই সময়ের মধ্যে আয়ের সঠিক চিত্র, দানের সুনির্দিষ্ট উৎস, ব্যয়ের খাত এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার যাবতীয় বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হবে।’’
এদিকে প্রশাসনের এমন আকস্মিক ও কঠোর পদক্ষেপে বিস্ময় প্রকাশ করেছে মাজার কর্তৃপক্ষ। মাজারের মোতোয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান অভিযোগ করেন, ‘‘প্রশাসন কেন হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে বিষয়ে তাদের স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়নি। এমনকি সভায় কথা বলারও পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়নি।’’
ফতেহ উল্লাহ বলেন, ‘‘জেলা প্রশাসক আমাদের কথা শুনতেই রাজি হননি। এই মাজারের দায়িত্ব আমরা কীভাবে পেলাম, তাও তিনি শুনতে চাননি। এ বিষয়ে আমাদের পক্ষে একটি আদালতের রায় রয়েছে এবং একটি মামলাও চলমান আছে। আমাদের কথা বলতে না দেওয়ায় আমরা অসহায় হয়ে বসে আছি।’’
তিনি আরও দাবি করেন, তাদের কাছে হিসাবপত্র রয়েছে, তবে তা গুছিয়ে উপস্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত সময় বা প্রস্তুতি তারা পাননি। ফলে কিছু অসঙ্গতি বা অসম্পূর্ণতা থাকতে পারে। তবে আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









