লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে তিন মেয়েসহ মাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় গণপিটুনিতে ঘাতক যুবকও মারা গেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ড গোডাউন রোড এলাকার এ ঘটনা ঘটে।
বিকেলে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আবু তারেক এবং রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বাহারুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নিহতরা হলেন- মা শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেজো মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) ও ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। নিহত সায়মা কলেজ শিক্ষার্থী, ইকরা রায়পুর কাজী ফারুকী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী ও শিফা আক্তার রায়পুর মার্চেন্ট প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থী এবং তাদের মা একজন গৃহিণী বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এছাড়া, গণপিটুনিতে অভিযুক্ত ঘাতক অন্তর মজুমদারও (২৮) মারা গেছেন। অন্তর নোয়াখালী সুবর্ণচর এলাকার কার্তিক মজুমদারের ছেলে। সে রায়পুরের ভ্রাম্যমাণ ফল ব্যবসায়ী ছিলেন।
এদিকে, ঘটনাস্থলে অভিযুক্তকে গণপিটুনি দেওয়ার সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টাকালে উত্তেজিত জনতার ইটপাটকেলে পুলিশের ৬-৭ জন সদস্য আহত হয়েছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শাহীনুরদের বাড়ি কুমিল্লায় জেলায়। প্রায় ১২-১৪ বছর ধরে তারা রায়পুরে ভাড়া বাসায় থাকেন। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে শাহীনুর তার সন্তানদের নিয়ে ঘটনাস্থলে আমির হোসেন মাষ্টারের বাসায় ভাড়া থাকেন। ২০১৯ সালে তার স্বামী মো. কামাল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এরপর থেকে ৩ মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে শাহীনুর ওই বাসায় বসবাস করে আসছেন। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে তিন মেয়েসহ শাহীনুরকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। এ ঘটনায় স্থানীয়রা ঘাতক যুবক অন্তরকে গণপিটুনি দেয়।
অন্যদিকে, আহত অবস্থায় সবাইকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিলে চিকিৎসকরা শাহীনুর, তার মেয়ে সায়মা ও শিফাকে মৃত ঘোষণ করেন। আশংকাজনক অবস্থায় ঢাকায় নেওয়ার পথে তার মেজো মেয়ে ইকরাও বিকেলে মারা যান।
ঘটনায় অভিযুক্ত অন্তরকে উত্তেজিত জনতা গণপিটুনি দিলে আশংকাজনক অবস্থায় সদর হাসপাতাল নিলে সেও মারা যায়। এদিকে, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার সময় উত্তেজিত জনতার সংঘর্ষ হয়। এতে ৭ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়।
শাহীনুরের একমাত্র ছেলে সিফাত হোসেন রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।
মুরাদ বলেন, ‘‘সিফাতের মা ও ৩ বোনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সকালে সে কাজে আসায় সেও কিছুই জানতো না। ঘটনাটি জানার পর থেকে সেও আতঙ্কগ্রস্ত। সে কারো সাথে কথা বলার অবস্থাতে নেই।’’
বাড়ির মালিক ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলার পর লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক জানান, ঘাতক অন্তর তার স্ত্রীসহ প্রায় দেড় বছর ঘটনাস্থলে বাসা ভাড়া থাকতেন। প্রায় ৭-৮ মাস আগে সে বাসা ছেড়ে চলে যায়। হয়তো পূর্ব পরিচিত হওয়ায় সকালে অন্তর এ বাসায় আসে। এরপর সে ঘটনাটি ঘটায়।
রাণী নামে এক প্রতিবেশী অন্তরকে ওই বাসায় দেখে এখানে আসার কারণ জানতে চায়, তখন অন্তর বলে সে পানির পাইপ ঠিক করতে এসেছে। রাণী এটা বিশ্বাস না করে কলাপসিবল গেট আটকে দিয়ে স্থানীয়দের খবর দেয়। তিনি পদক্ষেপটি না নিলে ঘটনাটি হয়তো উদঘাটন করাই সম্ভব হতো না। এরপরও ঘটনাটি তদন্ত চলছে। তবে কি কারণে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে তা বলতে পারেনি পুলিশ।
রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বাহারুল আলম বলেন, ‘‘হাসপাতালে ৫ জনকে আহত অবস্থায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে দুই মেয়ে ও তাদের মা আগেই মারা গেছেন। এছাড়া আশঙ্কাজনক অবস্থায় এক মেয়েকে ঢাকায় পাঠানো হলে পথেই সে মারা যায়। তাদের সবার শরীরের বিভিন্ন অংশে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। আহত এক যুবককে সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।’’
রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন মিয়া এদিন প্রতিবেদককে জানান, এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা। ঘটনাস্থলে মা ও দুই মেয়ে সহ তিনজন, পরবর্তীতে হাসপাতালে নেওয়ার পথে অপর মেয়ে এবং অভিযুক্ত যুবকে গণপিটুনি দিয়েছে জনতা। হাসপাতালে নিলে ডাক্তার তাকেও মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় মোট ৫ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মরদেহ সুরতহাল প্রতিবেদনের জন্য সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে পুলিশ। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সহকার পুলিশ সুপার (রায়পুর সার্কেল) মো. আব্দুর রাশেদ বলেন, ‘‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে উত্তেজিতরা ইটপাটকেল ছুড়লে আমাদের ৬-৭ জন সদস্য আহত হয়।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









