ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই যে শহরের সড়কগুলো লাখ লাখ শ্রমিকের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে, যেখানে শত শত কারখানার সাইরেন নতুন দিনের কাজের সূচনা ঘোষণা করে, সেই গাজীপুর আজ যেন এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি।
রাজধানী লাগোয়া গাজীপুর—দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রতিদিন ভোরে লাখ লাখ শ্রমিকের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে এ জেলার সড়ক। শত শত কারখানার চিমনি, ট্রাকের সারি আর শ্রমিকদের ব্যস্ত পদচারণাই যেন গাজীপুরের পরিচয়। কিন্তু সেই শিল্পনগরীর চিত্র এখন বদলে যাচ্ছে। একের পর এক কারখানার ফটকে ঝুলছে ‘বন্ধ’ নোটিশ। কোথাও উৎপাদনের চাকা থেমে গেছে আর্থিক সংকটে, কোথাও শ্রমিক অসন্তোষ, কোথাও গ্যাস সংকট, আবার কোথাও আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় মালিকপক্ষ উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
মাত্র এক সপ্তাহে গাজীপুরে অন্তত ১৩টি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাজার হাজার শ্রমিক এখন কর্মহীন। তাদের অনেকেই জানেন না, আগামী মাসে কীভাবে বাসাভাড়া দেবেন, সন্তানদের স্কুলের বেতন পরিশোধ করবেন কিংবা পরিবারের খাবার জোগাড় করবেন।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাসের তীব্র সংকট, বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ, ডলার সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, সময়মতো অর্থায়ন না পাওয়া এবং দীর্ঘদিনের শ্রমিক অসন্তোষ—সব মিলিয়ে গাজীপুরের শিল্প খাত এখন বড় ধরনের সংকটের মুখে। অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনে বছরের পর বছর টিকে থাকার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।
সবশেষে মহানগরের জরুণ এলাকায় অবস্থিত ইসলাম গার্মেন্টস লিমিটেড (ইউনিট-২)-এ এক নারী শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। রুবিনা বেগম নামে ওই শ্রমিক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান। এরপর শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও কারখানায় ভাঙচুরের আশঙ্কা দেখা দিলে কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩(১) ধারা অনুযায়ী গত ১ জুলাই থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানাটি বন্ধ ঘোষণা করে। এক সিদ্ধান্তেই প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন।
এর আগে গাজীপুর সদরের বাঘের বাজার এলাকায় লিথী গ্রুপের পাঁচটি শিল্প ইউনিট একযোগে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—অ্যাপারেল-২১ লিমিটেড, ফমকম ফ্যাশন লিমিটেড, ফমকম ডাইং লিমিটেড, ফমকম প্রিন্টিং লিমিটেড এবং ফমকম নিটিং লিমিটেড।
প্রতিষ্ঠানটির নোটিশে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন গ্যাস সংযোগ না থাকা, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, ভবিষ্যৎ অর্ডারের অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পণ্যের বিক্রিমূল্য কমে যাওয়া, সময়মতো ব্যাংক ঋণ না পাওয়া এবং দীর্ঘদিনের শ্রমিক অসন্তোষের কারণে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পাঁচটি কারখানাই বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
গাজীপুর মহানগরের বোর্ডবাজার এলাকার ইউনিক ডিজাইনার্স লিমিটেড ও ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক একসঙ্গে চাকরি হারিয়েছেন।
কারখানা বন্ধের পর শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ নিয়ে শিল্প পুলিশ, শ্রম অধিদপ্তর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে শ্রমিকদের সার্ভিস বেনিফিট, বকেয়া বেতনসহ অন্যান্য পাওনা পরিশোধে ১১ দফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে চাকরি হারানো শ্রমিকদের অনেকেই বলছেন, পাওনা পেলেও নতুন কর্মসংস্থান কোথায় হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চন্দ্রা এলাকায় একই দিনে চারটি কারখানায় তালা ঝোলে। এগুলো হলো—এপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলস লিমিটেড, এপেক্স টেক্সটাইল প্রিন্টিং মিলস লিমিটেড, এপেক্স লন্ড্রি মিলস লিমিটেড এবং এপেক্স ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেড।
কারখানার নোটিশে বলা হয়, শ্রমিকদের একটি অংশ আইনবহির্ভূত দাবি আদায়ের উদ্দেশ্যে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করায় বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩(১) ধারা অনুযায়ী পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কারখানাগুলো বন্ধ থাকবে।
গাজীপুর কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে আরও দুটি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এগুলো হলো মহানগরের কড্ডা-নাওজোড় এলাকার ফ্যাশন লিংকার্স লিমিটেড এবং কাশিমপুর এলাকার কোরটেক্স অ্যাপারেলস লিমিটেড।
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি-ব্যাংকঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে ডলারের উচ্চমূল্যে কাঁচামাল আমদানির খরচ বেড়েছে।আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে।অনেক বিদেশি ক্রেতা কম দামে পণ্য কিনতে চাপ দিচ্ছেন। শ্রমিক অসন্তোষ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন ক্রয়াদেশ হারাচ্ছে।
একটি কারখানা বন্ধ মানেই শুধু কয়েকশ বা কয়েক হাজার শ্রমিকের চাকরি হারানো নয়। এর প্রভাব পড়ে স্থানীয় দোকান, বাসা ভাড়া, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, কাঁচাবাজার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন সেবাখাতে। ফলে একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ায় পুরো গাজীপুরের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। শ্রমিকদের আইন অনুযায়ী পাওনা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
গাজীপুর কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক প্রকৌশলী এম. এম. মামুন-অর-রশিদ বলেন, আমরা আশা করছি, সংকট কাটিয়ে বন্ধ কারখানাগুলো আবার উৎপাদনে ফিরবে।
শিল্পনগরী গাজীপুরে কারখানার চিমনি এখনও জ্বলছে, কিন্তু অনেক কারখানার গেটে ঝুলছে তালা। প্রতিটি বন্ধ কারখানার সঙ্গে নিভে যাচ্ছে হাজারো পরিবারের জীবিকার প্রদীপ। চাকরি হারানো শ্রমিকদের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন—আবার কবে খুলবে কারখানা, কবে ফিরবে স্বাভাবিক জীবনে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









