গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের আনসার টেপিরবাড়ি এলাকায় অবস্থিত কালার অ্যান্ড কোং লিমিটেড পোশাক কারখানায় টানা দুই দিনে শতাধিক শ্রমিক রহস্যজনকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) প্রায় শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার পর বুধবার (৮ জুলাই) সকাল পর্যন্ত আরও অন্তত ৩৫ জন একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নেন। ধারাবাহিক এ ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, পাশাপাশি কারখানার কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
মঙ্গলবার সকাল থেকে উৎপাদন কার্যক্রম চলাকালে একের পর এক শ্রমিক বুকে ব্যথা, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট, পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং দুর্বলতাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হন। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে গেলে অসুস্থ শ্রমিকদের তাৎক্ষণিকভাবে মাওনা চৌরাস্তার আল-হেরা হাসপাতালসহ আশপাশের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নেওয়া হয়। বুধবার সকালেও একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩৫ জন শ্রমিক চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন।
আল-হেরা হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. হুমায়ুন কবির জানান, তাদের হাসপাতালেই উল্লেখযোগ্য শ্রমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। বেশিরভাগ রোগীর উপসর্গ প্রাথমিকভাবে একই ধরনের হলেও পরীক্ষার পরই অসুস্থতার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে তিনি জানান।
এদিকে ঘটনার পর কারখানা এলাকায় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকদের পরিবার-পরিজন কারখানার সামনে ভিড় করেন এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একের পর এক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ায় সহকর্মীদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ঘটনার পর কারখানা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারখানার জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) সঞ্জীব বলেন, ‘‘শ্রমিকদের ওপর ‘জ্বিনের আছর’ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণে কারখানায় ইমাম এনে দোয়া ও মিলাদের আয়োজন করা হয়েছে।’’
তবে কারখানা কর্তৃপক্ষের এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ শ্রমিকরা। তাদের দাবি, এটি কোনো অলৌকিক বা কুসংস্কারের বিষয় নয়; বরং কারখানার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, রাসায়নিক পদার্থ, বায়ুর মান বা অন্য কোনো কারণে এমন ঘটনা ঘটতে পারে।
শ্রমিক আশিক নুর বলেন, ‘‘আমরা কুসংস্কারের ব্যাখ্যা চাই না। কেন বারবার শ্রমিক অসুস্থ হচ্ছেন, তার প্রকৃত কারণ জানতে চাই। কর্মস্থলে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে তদন্ত করতে হবে।’’
এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, একই কারখানায় অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। শুধু ধর্মীয় আয়োজনের মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাখ্যা না করে স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও কর্মস্থলের নিরাপত্তার বিষয়গুলো বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীনুর আলম বলেন, ‘‘ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। শ্রমিকদের অসুস্থ হওয়ার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সহযোগিতা নিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’’
গত দুই দিনে একই কারখানায় ধারাবাহিকভাবে শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় শ্রমিক, স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









