টানা বর্ষণ ও জোয়ারের পানির দ্বিমুখী তোড়ে ঝালকাঠির নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি আরও আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে চলা অবিরাম বৃষ্টি এবং নিম্নচাপ ও মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সুগন্ধা ও বিষখালী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে জেলার একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে, যার ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন জেলার হাজারো কৃষক, পানিতে তলিয়ে গেছে আমন ধানের বীজতলা। একই সঙ্গে নদীভাঙনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সুগন্ধা ও বিষখালী তীরের বাসিন্দাদের চোখ থেকে ঘুম কেড়ে নিয়েছে সর্বনাশা ভাঙন আতঙ্ক।
গত রবিবার থেকে শুরু হওয়া এই দুর্যোগ আজও কাটেনি। আকাশ এখনো মেঘাচ্ছন্ন এবং থেমে থেমে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। সরেজমীনে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, সুগন্ধা ও বিষখালী নদীর পানি উপচে বেড়িবাঁধের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। নদী তীরবর্তী গ্রামীণ সড়ক ও ফসলি জমি এখন সম্পূর্ণ পানির নিচে। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ।
চলতি আমন মৌসুমকে কেন্দ্র করে ধার-দেনা করে বীজতলা তৈরি করেছিলেন ঝালকাঠির কৃষকরা। কিন্তু টানা কয়েকদিনের জলাবদ্ধতায় সেই স্বপ্ন এখন ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম। নলছিটি শংকরপাশা এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আনোয়ার শিকদার জানান, অনেক কষ্ট আর টাকা খরচ করে বীজতলা তৈরি করেছিলেন তিনি। এখন সব চোখের সামনে পানির নিচে তলিয়ে গেছে। আর দু-একটা দিন এই অবস্থা থাকলে সব বীজ পচে নষ্ট হয়ে যাবে। তখন মাঠে কী রোপণ করবেন, তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছেন।
মাঠ-ঘাট পানিতে সয়লাব হয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর ও প্রান্তিক পেশাজীবীরা। কাজ বন্ধ থাকায় অনেকের ঘরেই খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। স্থানীয় দিনমজুর আকাশ বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষগুলোর কাজকর্ম এক্কেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ঘরে খাবার জোগাড় করাই এখন তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে শিক্ষা ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গ্রামীণ সড়কগুলো ডুবে যাওয়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। ঝালকাঠি সদরের তারুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সালাউদ্দিন সোহাগ জানান, রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছে। বন্যার এই পরিস্থিতির কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে।
পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষখালী নদীতীরবর্তী চর ভাটারকান্দা এলাকায় নদীভাঙন ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন রোধে কিছু অংশে জিও ব্যাগ ও ব্লক ফেলা হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। নদীর তীব্র স্রোতের কারণে নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। ঘরবাড়ি ও ভিটামাটি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটানো নদীতীরের বাসিন্দারা অবিলম্বে টেকসই ও কার্যকর স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন জানান, বৈরী আবহাওয়া ও জোয়ারের পানিতে জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় আমন বীজতলার ক্ষতি হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বরাতে তিনি বলেন, কৃষি বিভাগের টিম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি উদ্যোগে পুনরায় নতুন করে বীজতলা তৈরিতে সব ধরনের সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়া হবে।
তবে ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এ. কে. এম. নিলয় পাশা বলেন, "টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের প্রভাবে জেলার নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছি। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।"


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









