সুন্দরবনের কুখ্যাত বনদস্যু 'ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী'র প্রধান জাহাঙ্গীর শেখসহ তার বাহিনীর আরো ২৬ বনদস্যু কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এ সময় তাদের কাছে থাকা ২৭ টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৩৪০ রাউন্ড তাজা গুলি ও ৫৫ রাউন্ড ফাঁকা গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
সুন্দরবনের দস্যু দমনে পরিচালিত কোস্ট গার্ডের বিশেষ দু’টি অভিযান ও কঠোর নজরদারির মুখে অবরুদ্ধ হয়ে তারা কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকালে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের সদর দপ্তরে এক বিশেষ প্রেস ব্রিফিং এ জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ব্রিফিং কালে তিনি জানান, “সুন্দরবন অঞ্চলে কোস্ট গার্ডের কঠোর নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং ধারাবাহিক অভিযানের কারণে দস্যু বাহিনীগুলো বর্তমানে পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। টিকতে না পেরে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষায় সোমবার (১৩ জুলাই) বিকালে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের চরপুটিয়া এলাকায় কোস্ট গার্ডের কাছে ওই বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখসহ তার সহযোগী আরো ২৬ দস্যু আত্মসমর্পণ করে। এ সময় তাদের কাছে থাকা তিনটি বিদেশি বন্দুক, একটি এইট শুটার, একটি ফোর শুটার, পাঁচটি দেশীয় একনলা বন্দুক, ১৫ টি দেশীয় পাইপ গান, দুইটি চায়না পাইপ গান, ৩৪০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ ও ৫৫ রাউন্ড ফাঁকা গুলি জব্দ করা হয়েছে।”
ব্রিফিং কালে তিনি সুন্দরবনের সক্রিয় সকল দস্যুদের আত্মসমর্পণ এর মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আত্মসমর্পণ না করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আত্মসমর্পণকারী দস্যুরা হলেন বাহিনী প্রধান জাহাঙ্গীর শেখ (৪৫),মুজাহিদ গাজী (২৭), বেল্লাল শেখ (৩৫), জাহিদ হাসান (২৮), সুমন ঢালী (৩০), এরশাদ শিকারী (৪২), ওয়াহিদুজ্জামান (৩০), আইয়ুব শেখ (৪২), রাফসান ঢালী (৩০), পারভেজ শেখ (২৭), কামরুল শেখ (২৫), জহুরুল গাজী (৩৮), সিরাজুল তরফদার (৩৮), আমিনুল ইসলাম (৪২), আসাদুল ইসলাম (৪২), বাবুল শেখ (৪৫), শাজাহান শেখ ( ৪২), (হেলাল ৩৮), আকরাম শেখ (৪৫) নুরুল ইজারাদার (৫০), হাসান শেখ (২৭), কামরুল শেখ (২৮), জিয়া শেখ (৩৮),কবির সুলতান (৫৫),কাইয়ুম জমাদ্দার (৪০),শফিকুল ইসলাম বয়াতি(২১) ও জয়নাল আবেদীন (৩৮) এদের সবার বাড়ি খুলনা বাগেরহাট ও পিরোজপুর জেলায়।
কোস্ট গার্ডের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই ডাকাতরা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে এবং নদী-খালে সাধারণ জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের জিম্মি করে আসছিল। অস্ত্রের মুখে তাদের অপহরণ ও মারধর করে পরিবারগুলোর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করাই ছিল এই চক্রের মূল কাজ।
সুন্দরবন দস্যুমুক্ত করতে সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বর্তমানে কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে দুটি বিশেষ ও সমন্বিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া উইং জানিয়েছে, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারী থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ অভিযানে এ পর্যন্ত ব্যাপক সাফল্য এসেছে। গত কয়েক মাসে সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ৭৬ টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ৩৫০ রাউন্ড তাজা গোলা, ৩১৬ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ১৬৩ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ এবং ১৯৪ রাউন্ড এয়ারগানের গোলা জব্দ করা হয়েছে।
একই সাথে এখন পর্যন্ত ৬৯ জন বনদস্যুকে আটক করা হয়েছে এবং দস্যুদের কবল থেকে ৪১ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করে স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ৯ জুলাই কুখ্যাত বনদস্যু ‘বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী’র তিন সক্রিয় সদস্য আলামিন হোসেন (৪০), সাতক্ষীরার তালা উপজেলার তৈবুর রহমান (২৪) এবং খুলনার কয়রা উপজেলার মনিরুজ্জামান মামুন (২০) কোস্টগার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। আত্মসমর্পণকালে তারা কোস্ট গার্ডের কাছে ২টি দেশীয় একনলা বন্দুক, ১টি দেশীয় পাইপগান, ৪০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ ও ১টি ওয়াকিটকি জমা দেয়। একই সাথে তাদের হেফাজতে থাকা জিম্মি জেলেকেও কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করে।
একই ভাবে গত ২১ মে সুন্দরবনের কুখ্যাত ‘ছোট সুমন বাহিনী’র প্রধানসহ মোট ৭ জন সদস্য বিপুল পরিমাণ অস্ত্রসহ কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল।
কোর্ট গার্ড পশ্চিম জোন মংলার মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করে সাধারণ জেলে ও বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্ট গার্ডের এই অভিযান ও জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত থাকবে। আত্মসমর্পণকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









