টানা বর্ষণ ও বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে কুষ্টিয়ার কাঁচাবাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গত সপ্তাহে বেশিরভাগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিম্নমুখী থাকলেও চলতি সপ্তাহে হঠাৎ করেই ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে সবজিসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের বাজার। মাঠ থেকে সবজি সংগ্রহ ব্যাহত হওয়া, সরবরাহ কমে যাওয়া এবং আমদানিতে বিঘ্ন ঘটার অজুহাতে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়েছেন বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) সকালে কুষ্টিয়া পৌর বাজার ঘুরে দেখা যায়, কাঁচাবাজারে ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও অধিকাংশই প্রয়োজনের তুলনায় কম পরিমাণে পণ্য কিনছেন। অনেকেই বাজার ঘুরে দাম শুনেই হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, আলুর দাম প্রতি কেজি ৩০ টাকায় স্থিতিশীল থাকলেও অধিকাংশ সবজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পটল ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৪০ টাকা, বেগুন ৬০ টাকা থেকে ১২০ টাকা, উস্তে ৪০ টাকা থেকে ৬০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৮০ টাকা থেকে ১০০ টাকা এবং পেঁয়াজ ৩৫ টাকা থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া আদা ১৬০ টাকা, টমেটো ১৬০ টাকা, শসা ১৩০ টাকা, বরবটি ৬০ টাকা, কাকরোল ৬০ টাকা, ঝিঙে ৫০ টাকা, কচু ৬০ টাকা এবং পেঁপে ৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে রসুনের দাম কিছুটা কমে ১২০ টাকা থেকে ১০০ টাকায় নেমেছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, টানা বৃষ্টির কারণে কৃষকরা মাঠে গিয়ে সবজি তুলতে পারছেন না। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে।
কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী জিয়ারুল বলেন, “সবজির দাম উৎপাদন ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। বৃষ্টির কারণে বাজারে সবজি কম আসছে। তাই কিছু সবজির দাম বেড়েছে।”
বাজার করতে আসা ক্রেতা লিয়াকত আলী বলেন, “দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে আমাদের নাভিশ্বাস উঠেছে। অনেক পণ্য এখন ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। বাজার দ্রুত স্বাভাবিক হওয়া দরকার।”
আরেক ক্রেতা শামসুল বলেন, “ব্যবসায়ীরা বৃষ্টির দোহাই দিয়ে দাম বাড়িয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে কাঁচাবাজারের দাম আকাশচুম্বী হয়ে গেছে। আমরা নিম্ন আয়ের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছি। এখন কম কিনে সংসার চালাতে হচ্ছে।”
সবজির বাজারে অস্থিরতা থাকলেও চাল, ডাল ও তেলের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। বর্তমানে মিনিকেট চাল প্রতি কেজি ৭৫ টাকা, বাসমতি চাল ৮৫ টাকা, কাজললতা ৬৫ টাকা, মোটা আটাশ চাল ৫০ টাকা এবং পোলাও চাল ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চিনি ১০৫ টাকা, আটা ৬৫ টাকা, মসুর ও মুগ ডাল ১৫০ টাকা কেজি, সয়াবিন তেল ২০০ টাকা এবং সরিষার তেল ২৩৫ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
চাল ব্যবসায়ী মেসার্স মা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী এ. এম. হক রিপন বলেন, “কয়েক সপ্তাহ আগে চালের দাম কমেছিল। এরপর থেকে বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। ধানের উৎপাদনের ওপরই চালের দাম নির্ভর করে।”
অপরদিকে গরুর মাংস প্রতি কেজি ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দুই ধরনের মাংসের দামই গত সপ্তাহের মতো অপরিবর্তিত রয়েছে। এ ছাড়া ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৮০ টাকায় স্থিতিশীল থাকলেও সোনালি মুরগি ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩১০ টাকা এবং লেয়ার মুরগি ৩৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৩৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি মুরগির দাম ৪৫০ টাকা কেজি।
ক্রেতা রেজাউল করিম বলেন, “গরুর মাংসের দাম না বাড়লেও কমেনি। আমরা মধ্যবিত্ত মানুষ, বেশি দামে নিয়মিত মাংস কেনা সম্ভব হয় না। প্রশাসনের উচিত বাজার আরও কঠোরভাবে তদারকি করা।”
অণ্যদিকে মাছের বাজারেও বৈরী আবহাওয়ার প্রভাব স্পষ্ট। রুই মাছ ৩৬০ টাকা, কাতলা ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা এবং ছোট মাছ ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে ইলিশ মাছের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ৩ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
মাছ বিক্রেতা আব্বাস মণ্ডল বলেন, “নদীতে বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলেরা মাছ ধরতে পারেনি। সরবরাহ কম থাকায় ইলিশের দাম বেড়েছে। বৃষ্টি কমে গেলে বাজার স্বাভাবিক হবে।”
অন্যদিকে মাছ বিক্রেতা আশরাফ আলী বলেন, “বৃষ্টি ও নিম্নচাপের কারণে নদীর মাছ কম এসেছে। তাই কিছু মাছের দাম বেড়েছে।”
ডিমের বাজারেও দাম বেড়েছে। প্রতি ৩০টা ডিম বর্তমানে প্রায় ৩১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহে ছিল প্রায় ৩০০ টাকা। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের ব্যয় আরও বেড়েছে।
বাজারে আসা ক্রেতা বিজয় রহমান বলেন, “গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে, কিছু স্থিতিশীল আছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা প্রায়ই আমদানির দোহাই দিয়ে দাম বাড়ান। সাধারণ মানুষের কিছু বলার সুযোগ নেই।”
অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দামও কমে আসবে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্ষা মৌসুমে কৃষিপণ্য পরিবহন ও মাঠ থেকে সংগ্রহে বিঘ্ন ঘটায় প্রায় প্রতি বছরই কাঁচাবাজারে এমন অস্থিরতা দেখা যায়। তবে কার্যকর বাজার তদারকি, কৃষিপণ্য দ্রুত পরিবহনের ব্যবস্থা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এই পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রেতাদের অভিযোগ, আয় বাড়ছে না কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়মিত বাড়ছে। ফলে সংসার চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। তারা বাজারে নিয়মিত অভিযান, মূল্যতালিকা বাস্তবায়ন এবং অসাধু মুনাফাখোরদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সার্বিকভাবে, কুষ্টিয়ার বাজারে চাল, তেল ও গরুর মাংসের দাম স্থিতিশীল থাকলেও টানা বৃষ্টির কারণে কাঁচা সবজি, ডিম, সোনালি মুরগি ও ইলিশের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মৌসুমি এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে কার্যকর সরকারি নজরদারি ও সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদারের বিকল্প নেই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









