কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙন নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে নদীতীরবর্তী জনপদে। উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবাহ বৃদ্ধির সাথে সাথে উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের মাজদিয়াড় ও কোলদিয়াড় এলাকায় নদীভাঙন তীব্র রূপ নিয়েছে। গত দুই সপ্তাহে এই দুই গ্রামের প্রায় ৩০০ বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। চলতি মৌসুমের প্রধান ফসল পাট ও গবাদিপশুর ঘাসসহ খেতের ফসল হারিয়ে অর্ধশতাধিক কৃষক এখন চরম অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় এক মাস ধরে এই ভাঙন অব্যাহত থাকলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিদিনই নদীর পেটে চলে যাচ্ছে নতুন নতুন ফসলি জমি। এতে শুধু কৃষকরাই নন, পুরো এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকাও বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মরিচা ইউনিয়নের মাজদিয়াড় ও কোলদিয়াড় এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটারজুড়ে পদ্মার তীব্র স্রোতে নদীভাঙন চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক নেন্টু মিয়া জানান, মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে তার প্রায় ৮ বিঘা পাটখেত নদীতে চলে গেছে। প্রতিবছরই এভাবে সর্বস্ব হারিয়ে তারা নিঃস্ব হচ্ছেন। আরেক কৃষক ইউসুফ আলী জানান, তার ৫ বিঘা জমি ও ঘাসের খেত নদীতে তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, “আমরা শুধু সাময়িক ক্ষতিপূরণ চাই না, স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধের ব্যবস্থা চাই।”
স্থানীয় কৃষকদের তথ্যমতে, নদীভাঙনে ইয়াসিন প্রামাণিকের ৬ বিঘা, আমিরুল ইসলামের ৮ বিঘা, নজরুল ইসলামের ৩ বিঘা, বাবুল প্রামাণিকের আড়াই বিঘা এবং সাধু ফরাজির ১২ বিঘাসহ এলাকার ৫০ থেকে ৬০ জন কৃষকের আবাদি জমি ইতিমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
মরিচা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত ১৫-২০ দিনে ৩০০ বিঘা জমি নদীগর্ভে চলে গেলেও এখন পর্যন্ত প্রশাসন কিংবা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো কর্মকর্তাকে ভাঙন কবলিত এলাকায় মাঠে দেখা যায়নি।”
এদিকে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমার অনেক নিচে অবস্থান করছে। এই পয়েন্টে পদ্মার বিপদসীমা ১৩ দশমিক ৮০ সেন্টিমিটার হলেও বর্তমানে পানির উচ্চতা রয়েছে ৯ দশমিক ৩৭ সেন্টিমিটার, যা বিপদসীমার ৪ দশমিক ৪৩ সেন্টিমিটার নিচে। ফলে বন্যার আশঙ্কা না থাকলেও নদীর তীব্র স্রোতের কারণেই এই ভাঙন চলছে।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুর রহমান বলেন, “নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য জিও ব্যাগ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত ভাঙনকবলিত এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে পদ্মাপাড়ের মানুষের দাবি, প্রতিবছর ভাঙন শুরু হলে জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িক জোড়াতালির চেষ্টা করা হলেও স্থায়ী নদীশাসনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। ফলে প্রতিবছরই হাজার হাজার একর ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে মানুষ গৃহহীন হচ্ছে। দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও টেকসই নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে তাদের জীবন ও জীবিকা রক্ষার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









