সিলেট বিভাগে হাম ও এর উপসর্গে শিশু মৃত্যুর ঘটনা যেন থামছেই না। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের ছোবলে একের পর শিশু মারা যাচ্ছে। দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর তালিকা। সর্বশেষ রবিবার (১৯ জুলাই) এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরও এক শিশুর নাম। নিহত আবু সাঈদ (৯ মাস) সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সাহাব উদ্দিনের ছেলে। সিলেট শহিদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি মারা যায়। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. মিজানুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এ নিয়ে হাম ও এর উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা শতকের ঘরে। আর আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ৫০০ ছুঁইছুঁই। এদিকে হাসপাতালেও রোগীর চাপ অব্যাহত রয়েছে। দিন দিন পরিস্থিতি জটিল হতে থাকায় চরম শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন অভিভাবকেরা। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং হামের টিকার উপর বেশি জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল রবিবার সকাল পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ৫৪৪ শিশু হাম রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে চার শিশুর, বাকিরা উপসর্গে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ১ থেকে ২ বছর বয়সী শিশুরা। মৃত শিশুদের বেশিরভাগের গড় বয়স এই সীমার মধ্যেই বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
শীর্ষে সুনামগঞ্জ ও সিলেট
বিভাগের চার জেলার মধ্যে আক্রান্ত মৃত্যুর দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে সুনামগঞ্জ। এ জেলায় আক্রান্ত ২৮৭ জন শিশু, মৃত্যু হয়েছে ৪৪ জনের। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সিলেট জেলায় আক্রান্ত ১৮০ জন, মৃত্যু হয়েছে ৩৩ জনের। এ ছাড়া হবিগঞ্জ আক্রান্ত ৫৫ জন, মৃত্যু হয়েছে ৮ জনের, মৌলভীবাজার জেলায় ২২ জন শিশু আক্রান্ত এবং ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট আক্রান্তের অর্ধেকেরও বেশি রোগী সুনামগঞ্জ জেলার। দুর্গম হাওর অঞ্চল ও অসচেতনতার কারণে ওই এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকারি হিসাব অনুসারে, আজ রবিবার সকাল পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৫৪৪ জন। মোট মৃত্যু হয়েছে ১০০ জনের, এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ৪ জন; উপসর্গে ৯৬ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। যাদের গড় বয়স ১ থেকে ২ বছর।
হাসপাতালে বাড়ছে ভিড়, ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি ৮৫
শেষ চব্বিশ ঘন্টায় নতুন করে হাম শনাক্ত না হলেও, উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসার মিছিল থামছে না। শেষ ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে উপসর্গ নিয়ে আরও ৮৫ শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট শহিদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ২৮ জন, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৫ শিশু ভর্তি হয়েছে। বাকি ১২ জন বিভিন্ন হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছে।
সিলেট শহিদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. মিজানুর রহমান আজ সকালে এদিনকে জানান, রবিবার (১৯ জুলাই) তাঁর হাসপাতালে নুতন আরও ২৮ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। যাদের অনেকেরই নানা শারিরীক জটিলতা রয়েছে। গতকাল সকাল পর্যন্ত তাঁর হাসপাতালে ১০০ শয্যার বিপরীতে ৯৬ জন রোগী ভর্তি রয়েছে।
হাম নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সহযোগী অধ্যাপক শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. নাজনীন আক্তার। তিনি এদিনকে বলেন, জ্বর এবং শরীরে লালচে র্যাশ বা গুটি নিয়ে প্রতিদিন শিশুরা হাসপাতালে আসছে। আমরা সাধ্যমতো চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে শিশুদের বয়স কম হওয়ায় জটিলতা বেশি দেখা দিচ্ছে। শিশুদের শরীরে জ্বর ও র্যাশ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত চিকিৎসকের দারস্থ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই চিকিৎসক।
ঝুঁকিতে ১-২ বছরের শিশুরা
চিকিৎসকদের মতে, হামের প্রকোপে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর শিকার হচ্ছে ১ থেকে ২ বছর বয়সী শিশুরা। এই বয়সীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা এবং অনেকের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়া এর অন্যতম কারণ হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা তীব্র অপুষ্টির কারণে শিশুর মৃত্যু হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম এদিনকে জানান, মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। যেসব এলাকায় টিকাদানের হার কম, সেখানে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিশুদের হাম-রুবেলার টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আক্রান্ত শিশুদের পুষ্টিকর খাবার ও ভিটামিন 'এ' ক্যাপসুল সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









