শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বিলাসপুর ইউনিয়ন যেন দিন দিন বিস্ফোরক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হচ্ছে। একের পর এক ককটেল উদ্ধার, বিস্ফোরণ ও সংঘর্ষের ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সর্বশেষ মালয়েশিয়া প্রবাসী এক ব্যক্তির বাড়ির ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়।
সোমবার (২৭ জুলাই) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলার বিলাসপুর ইউনিয়নের চেরাগ আলী বেপারী কান্দি গ্রামের মালয়েশিয়া প্রবাসী মো. আলী উজ্জামাল হাওলাদারের বাড়ির পেছনের সেপটি ট্যাংকে এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ট্যাংকের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সৌভাগ্যক্রমে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পর সেপটি ট্যাংকের একটি অংশ ফেটে যায়। পরে দুর্বৃত্তরা ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি নারিকেল পাতা দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে কালো রঙের কসটেপের টুকরা উদ্ধার করেছে পুলিশ।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের ধারণা, সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে আগে থেকেই রাখা একটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়েছে। তবে কে বা কারা, কী উদ্দেশ্যে সেখানে বিস্ফোরকটি রেখেছিল, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত কয়েক মাসে বিলাসপুর ইউনিয়নে একাধিকবার ককটেল উদ্ধার ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় তাজা ককটেল উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আধিপত্য বিস্তার ও দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে কয়েক দফা ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনার পর অভিযান চালিয়ে বিস্ফোরক ও ককটেল তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হলেও এখনো বন্ধ হয়নি এসব তৎপরতা। ফলে বিলাসপুর ইউনিয়ন কার্যত আতঙ্কের জনপদে রূপ নিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবারই ককটেল উদ্ধার বা বিস্ফোরণের পর তদন্ত শুরু হলেও নেপথ্যের মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে একই এলাকায় বারবার এমন ঘটনা ঘটছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিলাসপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে দীর্ঘদিন ধরেই গোপনে ককটেল তৈরির অভিযোগ রয়েছে। চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি ককটেল তৈরির সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণে তিনজন নিহত হন। ওই ঘটনার পর পুলিশ ও যৌথ বাহিনী একাধিক অভিযান চালিয়ে ককটেল তৈরির কারখানার সন্ধান পায় এবং বিপুল পরিমাণ ককটেল ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, গত দুই মাসে বিলাসপুর ও আশপাশের এলাকায় অন্তত আটটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় পাঁচজন আহত হয়েছেন। পদ্মা নদীতীরবর্তী এই ইউনিয়নে প্রায় চার দশক ধরে বিভিন্ন পক্ষের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ চলে আসছে। সেই বিরোধে সংঘর্ষের সময় ককটেল ব্যবহারের অভিযোগ পুরোনো। পাশাপাশি একটি সংঘবদ্ধ চক্র এলাকায় ককটেল তৈরি করে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, বরং ককটেল তৈরির সঙ্গে জড়িত চক্রকে সম্পূর্ণভাবে শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা না গেলে বিলাসপুরে বিস্ফোরক-সন্ত্রাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে। তাদের দাবি, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থায়ী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালেহ আহম্মদ বলেন, “খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। কীভাবে বিস্ফোরকটি সেখানে এলো এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।”
তিনি আরো জানান, এ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক ককটেল উদ্ধার ও বিস্ফোরণের ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









