শিক্ষিত তরুণদের চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার আহ্বান এখন সর্বত্র। কিন্তু বাস্তবে একজন নতুন উদ্যোক্তার পথ মোটেই সহজ নয়। পুঁজি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বাজারের অনিশ্চয়তার সব বাধা অতিক্রম করে টিকে থাকাই কঠিন সংগ্রামের। তেমনই এক সংগ্রামী তরুণ উদ্যোক্তা সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার সাদিকুজ্জামান। সাফল্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছেও একের পর এক প্রতিকূলতায় পিছিয়ে পড়েছেন তিনি। তবুও ভেঙে না পড়ে নতুন স্বপ্ন বুকে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন নিজের প্রতিষ্ঠিত হাঁসের খামারকে ঘিরে।
জানা গেছে, উপজেলার স্থানীয় এক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত সাদিকুজ্জামান চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা বিনিয়োগ করে উপজেলার মোবারকপুর গ্রামের নিজ বাড়ির পাশে "আমিরা ওসমান গ্রীন প্যারাডাইস" নামে একটি বাণিজ্যিক হাঁসের খামার গড়ে তোলেন। শুরুতেই তিনি ৫ হাজার ৬শ হাঁস নিয়ে খামারের কার্যক্রম শুরু করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং আধুনিক পদ্ধতিতে হাঁস পালন করে অন্য তরুণদেরও উদ্বুদ্ধ করা।
খামার পরিচালনার শুরুটা ছিল বেশ আশাব্যঞ্জক। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, নিয়মিত পরিচর্যা এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অল্প সময়েই খামারটি সম্ভাবনার আলো দেখাতে শুরু করে। এর আগে ছোট পরিসরে হাঁস পালন করে ভালো অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছিলেন তিনি। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় বাণিজ্যিকভাবে বড় আকারে খামার গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বাস্তবতা তাঁর সেই স্বপ্নকে কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করায়।
গত জুন মাসে প্রাকৃতিক পরিবেশে হাঁস পালনের উদ্দেশ্যে বানাইয়ার হাওরে অস্থায়ীভাবে হাঁসের শেড তৈরি করেন সাদিকুজ্জামান। কিন্তু হঠাৎ ভয়াবহ ঝড় ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে খামারের অস্থায়ী আশ্রয়স্থল ভেঙে পড়ে। প্রবল বাতাস, অতিরিক্ত পানি এবং প্রতিকূল পরিবেশে মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে প্রায় ২ হাজার ৬শ হাঁস মারা যায়। এই ভয়াবহ ক্ষতিতে সামাজিকভাবে ও মানসিকভাবে যেমন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন, তেমনি আর্থিকভাবেও মারাত্মক ভেঙে পড়েন এই তরুণ উদ্যোক্তা। পরে স্থান পরিবর্তন করে নবীগঞ্জ উপজেলার আউশকান্দি ইউনিয়নের মংলাপুরে হাঁস নিয়ে অবস্থান করছেন তিনি।
সরজমিনে সাদিকুজ্জামানের খামার পরিদর্শনে গেলে দেখা যায়, প্রাকৃতিক খাবারের আশায় অস্থায়ী শেডে হাঁস রাখছেন তিনি। চারজন শ্রমিক নিয়মিত হাঁস দেখাশোনা করছেন, ফলে তাদেরও সেখানে থাকতে হচ্ছে।
সাদিকুজ্জামান জানান, একটি বাণিজ্যিক হাঁসের খামার পরিচালনায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খাদ্য, ওষুধ এবং পরিচর্যার ব্যয় বহন করতে হয়। বর্তমানে হাঁসের খাদ্য ও ওষুধের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে খামার পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠছে। প্রতিদিন কেবল খাদ্যের পেছনেই প্রায় দেড় হাজার টাকার বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে, যা মাসে দাঁড়ায় প্রায় অর্ধলক্ষ টাকা। পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি, চিকিৎসা, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যুক্ত হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ।
তিনি বলেন, "প্রাকৃতিক দুর্যোগে একসঙ্গে এতগুলো হাঁস মারা যাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছি। তবে খামারে ১ হাজার ৫শ হাঁস নিয়মিত ডিম দেওয়া শুরু করলে কিছুটা হলেও আশার আলো দেখব।"
স্থানীয় খামারিরা জানান, উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলে এবং বাজারে ডিমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হলে ধীরে ধীরে লোকসান কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। এজন্য প্রয়োজন সরকারি সহযোগিতা, কারিগরি পরামর্শ এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ। বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল, প্রাকৃতিক জলাশয় এবং অনুকূল পরিবেশ থাকায় সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ খাত আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। কিন্তু প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাবে অনেক উদ্যোক্তাই হতাশ হয়ে পড়ছেন।
এ বিষয়ে ওসমানীনগর উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সুমন আহমেদ বলেন, "সাদিকুজ্জামানকে নিয়মিত পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন প্রদান করা হচ্ছে। আশা করা যায় হাঁস ডিম দেওয়া শুরু করলে তিনি ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। আমরা নিয়মিত তাঁর খামারের খোঁজখবর রাখছি।"


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









